অতিবৃষ্টি ও ভারত থেকে ছেড়ে দেওয়া পানির কারণে কুমিল্লা, সিলেট, ফেনীর মতো চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান উপজেলার অন্তত ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (২৩ আগস্ট) সকাল থেকে উপজেলাগুলোর নতুন নতুন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। এদিকে ফুঁসছে কাপ্তাই বাঁধও। বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে বাঁধের পানি। এর মধ্যে বন্যার পানিতে ডুবে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হয়ে জেলায় অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাদিউর রহমান জাদিদ এ তথ্য জানান। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রামের নাজিরহাট পুরোনো ব্রিজ এবং নতুন ব্রিজের মাঝামাঝি জায়গায় হালদা নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে প্রবল স্রোতে ফেনী নদির পানি ঢুকতে শুরু করে। এরপর থেকে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে হাটহাজারীর ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে ফেনী নদী ও মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার মিরসরাই, উপজেলার করেরহাট, হিক্সগুলী, বারইয়ারহাট পৌরসভা, মিরসরাই পৌরসভার নিম্নাঞ্চল, জোরারগঞ্জ, ইছাখালী, কাটাছরা, দুর্গাপুর, মিঠানালা, খৈয়াছড়া, ওসমানপুর, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নিচু এলাকাও প্লাবিত হয়েছে।
পাশাপাশি ফটিকছড়ির কাজিরহাট, নাজিরহাট, নারায়ারণহাট, সুন্দরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় গাউসিয়া কমিটির পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করছে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম শহর থেকে বিভিন্ন সংগঠন এবং অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ নিয়ে এসব এলাকায় যাচ্ছেন।
এছাড়া বন্যার পানিতে ডুবে ও বিদ্যুৎপৃষ্টে মারা গেছে চারজন। এর মধ্যে শুক্রবার (২৩ আগস্ট) সকালে হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের ইউসুফ চৌধুরীর বাড়িতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. জিয়াউর রহমান সাকিব (২২) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সাকিব পেশায় একজন মাইক্রোবাসচালক। তিনি ওই এলাকার মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে। ঘরে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করলে তড়িঘড়ি করে আইপিএসের সংযোগ খোলার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সাকিব।
অন্যদিকে ফটিকছড়ি উপজেলায় প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয় মো. সামি (৭) নামে এক শিশু। সামি কাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা। শুক্রবার (২৩ আগস্ট) ভোরে বাড়ির কাছেই তার মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা।
তা ছাড়া শুক্রবার সকালে মিরসরাই উপজেলার হাইতকান্দি এলাকায় পানিতে ভাসমান অবস্থায় এক অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের সঙ্গে বৈদ্যুতিক তার জড়িয়ে থাকায় বিদ্যুৎ¯পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের ফুলবাগিচা গ্রামের মো. রনি (১৭)। সে ওই এলাকার আবু বক্করের ছেলে।
স্থানীয়রা জানান, রনি ও বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে বাঁশের ভেলা বানিয়ে তিন বন্ধুকে নিয়ে স্থানীয় বিলে নামে। একপর্যায়ে তার বন্ধুরা কুলে উঠতে পারলেও রনি প্রবল স্রোতে তলিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই দফা উদ্ধার অভিযান চালায়। তবে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওই বিল থেকেই রনির মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, চট্টগ্রামের ফেনী নদীর পানি কয়েকটি পয়েন্টে বিপদসীমার ২ মিটার ও হালদা নদীর পানি ১ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীর পাড় উপচে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। এদিকে কাপ্তাই বাঁধেও পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়া হলে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। নতুন করে বন্যা কবলিত হবে বোয়ালখালী, পটিয়া, কর্ণফুলী, আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলা।