# সহজ হবে যানবাহনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ
# কমবে দূর্ঘটনা, রোধ হবে চুরি-ডাকাতি
# বাড়বে সার্বিক নিরাপত্তা
যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আওতায় আসছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এতে মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে গতিসীমা লঙ্ঘন করলেই হয়ে যাবে অটো মামলা। ফলে কমবে দুর্ঘটনা, বন্ধ হবে থ্রি-হুইলার যানবাহন ও ফিরবে শৃঙ্খলা।
এ লক্ষ্যে ২৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে ১ হাজার ৪২৭টি সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ওসব ক্যামেরায় ফুটেজ সংরক্ষণ থাকবে এক মাস পর্যন্ত। তাছাড়া বৃহত্তর একটি ডাটা সেন্টার, পাঁচটি কন্ট্রোল রুম ও ১৬টি চেকপোস্টের মাধ্যমে হাইওয়ে পুলিশের তত্ত্বাবধানে তা নিয়ন্ত্রিত হবে এই মহাসড়ক।
বুধবার (২৭ আগস্ট) এ তথ্য জানান হাইওয়ে পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা। তিনি জানান, বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবারে সংযুক্ত এআই প্রযুক্তির ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ২৪ ঘণ্টা হাইওয়ে পুলিশের নজরদারিতে থাকবে এবং যানবাহনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বিআরটিএর সংযোগ পেলেই চালু হবে ডিজিটাল অটোফাইন সিস্টেম। যা চলতি বছরের নভেম্বরের দিকে হয়ে যেতে পারে।
তিনি জানান, মহাসড়কে অটোমেটিক নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ, যানবাহনের গতিপথ নির্ধারণ, হাই¯িপড ডিটেকশন ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যান এআই প্রযুক্তিতে দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। শক্তিশালী ক্যামেরায় থাকবে অন্ধকার ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায়ও রাস্তায় চলাচলরত যানবাহনের নম্বর প্লেটের ¯পষ্ট ছবি ধারণ ও সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা।
আর মহাসড়কে যানজটসহ কোথাও কোনো ঝামেলা বা অপরাধের কারণে লোকসমাগম বেশি হলে আগাম সংকেত চলে যাবে মনিটরিং সেলে। তাছাড়া মহাসড়কে সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা বসানোর পর কোনো যানবাহন আইন অমান্য করার পর পুলিশ না ধরলেও সমস্যা নেই।
কারণ মামলার তথ্য যানবাহনের মালিকের ঠিকানা ও মোবাইল ফোনে চলে যাবে। ফলে মহাসড়কে কোনো যানবাহন অপরাধ করে পার পাবে না। এভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় উন্নত বিভিন্ন দেশে যানবাহনের অপরাধ।
পাঁচ জোনে নিয়ন্ত্রণ:
মহাসড়কে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়াতে ঢাকা, গাজীপুর, কুমিল্লা, দাউদকান্দি ও চট্টগ্রাম জোন করা হয়েছে। শেষ হয়েছে ২৫০ কিলোমিটারজুড়ে ১ হাজার ৪২৭টি সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজও। এর মধ্যে ১৬টি লং ভিশন ক্যামেরা, ৪৭১টি ৪এমপি পিটিজেড ডোম ক্যামেরা, ৯২৪টি বুলেট ক্যামেরা ও ১৬টি চেক পয়েন্ট ক্যামেরা রয়েছে।
বিদ্যুৎ চলে গেলেও ব্যাকআপ পাওয়ার সিস্টেমসহ ৪৯০টি স্থানে ভিডিও সাইটপোল থাকছে। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ঘাটে অবস্থিত ৫.৩০ টেটাবাইট স¤পন্ন একটি সেটন্টাল কমান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, ৫টি মনিটরিং সেন্টার, ৫ পেটাবাইটের ডেটা সেন্টার, ডেটা সেন্টারের মডিউলার সিস্টেম, নেটওয়ার্ক সিস্টেম, ভিডিও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ভিপিও অ্যানালিসিস সিস্টেম ও অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন সিস্টেম রয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, ডিজিটাল অটোফাইন সিস্টেম, যানবাহনের গতিপথ শনাক্ত, হাই¯িপড ডিটেকশন, ট্রাফিক ফ্রো বিশ্লেষণ করা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন শনাক্ত, সন্দেহজনক অনুপ্রবেশ শনাক্ত, গুরুত্বপূর্ণ বস্তু শনাক্ত করার লক্ষ্যে সারা দিনের ভিডিও সারাংশ তৈরি করে সংক্ষিপ্ত আকারে দেখা, ভিডিও অনুসন্ধান করা, অপরাধ বিশ্লেষণ ও অপরাধীকে শনাক্ত, হাইওয়ের রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও অপরাধী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা বস্তুর আচরণ বিশ্লেষণ এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট তথ্য মোতাবেক মহাসড়কে ট্রাফিক ও অপরাধ সংক্রান্তে ঘটমান যেকোনো তথ্য দ্রুততার সঙ্গে পাওয়া যাবে।
যে কোনো যানবাহন এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সার্চ করে বের করা যাবে। এই প্রযুক্তিতে নম্বর প্লেট, গাড়ির রং বা গাড়ির যেকোনো চিহ্ন দিয়েও যানবাহন শনাক্ত করা যাবে। অবৈধ পার্কিং, এলোমেলো লেন পরিবর্তন, তিনজন আরোহন বা হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেলও শনাক্ত এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া যাবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে ইতোমধ্যে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত ১১টি, হত্যাকান্ডে দুটি, চুরিতে সাতটি, দস্যুতায় দুটি, ছিনতাইয়ে তিনটি গাড়ি এবং সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িত ১৮টি গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় দ্রুত পৌঁছে যাবে অ্যাম্বুলেন্স
মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত পৌঁছে যাবে অ্যাম্বুলেন্স। বিনামূল্যে পৌঁছে দেবে নিকটবর্তী হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য থাকবে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ও ট্রমা সেন্টার। এ পদ্ধতিতে উন্নত দেশগুলোয় আগে থেকেই এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার প্রচলিত থাকলেও দেশে এবারই প্রথম এ পদ্ধতি অনুসরণ হতে যাচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মহাসড়কে চলাচল করা গাড়ি ও যাত্রীদের নিরাপত্তা ছাড়াও দুর্ঘটনা ও অপরাধ কমাতে এসব ক্যামেরা সহায়ক হবে বলে আশা সকলের। হাইওয়েতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বৃদ্ধি করে নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তাও প্রদান করা হবে। বহির্বিশ্বে রপ্তানিকৃত পণ্যবাহী যানবাহন থেকে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার মালামাল চুরি বা ছিনতাই রোধ করতে সহায়তা করবে।
ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী মুহাম্মদ আলী, সাজ্জাদ চৌধুরী, বাস চালক কামাল উদ্দিন ও সোহেল রানা বলেন, ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের প্রায়ই ছিনতাই ও নাশকতার মতো ঘটনা ঘটে। এসব ক্যামেরা লাগানোর কারণে অপরাধ কমবে। সিসি ক্যামেরা থাকলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান সহজ হবে। এছাড়া চালকরাও সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাবেন। এতে করে যাত্রী ও চালকদের জানমালের নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমন হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতাও বাড়বে। এটি খুবই ভালো উদ্যোগ।
কুমিল্লা হাইওয়ে রিজিয়নের পুলিশ সুপার খাইরুল আলম বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ, পালিয়ে বেড়ানো যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট গতিসীমা অতিক্রম করা যানবাহনের নামে বিশেষ এ ক্যামেরায় ভিডিও মামলা দেয়ার সুবিধা রয়েছে
রোধ হবে চুরি-ডাকাতি
রপ্তানির পোশাক চট্টগ্রাম বন্দরে নেওয়ার পথে কাভার্ড ভ্যান থেকে চুরির ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। গত এক বছরে পাঁচটি অভিযানে রপ্তানির পোশাক চুরির সঙ্গে জড়িত ২৮ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে র্যাব-৪। এর মধ্যে দুই দশক ধরে মহাসড়কে রপ্তানির পোশাক চুরির সঙ্গে জড়িত মো. সাহেদ ওরফে সিলেটি সাঈদও আছেন। এই সিলেটি সাঈদ রপ্তানির পোশাক চুরির অন্যতম হোতা।
সাঈদের পাশাপাশি অন্তত আরও ১০টি চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে, যারা মহাসড়কে রপ্তানির পোশাক চুরি করছে। রপ্তানির পোশাক চুরি ঠেকাতে মহাসড়ক সিসিটিভির আওতায় আনার দাবি করছিলেন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী কয়েকজন যাত্রীর ভাষ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায়ই ছিনতাই ও নাশকতার মতো ঘটনা ঘটে। এসব ক্যামেরা লাগানোর কারণে অপরাধ কমবে। সিসি ক্যামেরা থাকলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান সহজ হবে। এছাড়া চালকরাও সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাবেন বলে মনে হয়। এতে করে যাত্রী ও চালকদের জানমালের নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমন হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতাও বাড়বে।
এ প্রকল্পের পরিচালক হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক বরকত উল্লাহ খান বলেন, মহাসড়ক নিরাপদ করতেই সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। মহাসড়কে অপরাধ দমন বিশেষ করে রপ্তানির পোশাক চুরি, দুর্ঘটনা রোধ, দুর্ঘটনা হলে দায়ী যানবাহন শনাক্ত এবং পুরো এলাকা নজরদারি আওতায় আনতেই এ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান বলেন, চীনের হুয়াং প্রতিষ্ঠানের তৈরি এসব ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা থেকে সুফল পাওয়া শুরু হলে চলাচল করা গাড়ি ও যাত্রীদের নিরাপত্তা ছাড়াও দুর্ঘটনা ও অপরাধ দমন সম্ভব হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এ ক্যামেরার আওতায় আসলে ভালো পুলিশিংয়ের পাশাপাশি মহাসড়কও নিরাপদ হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এসব ক্যামেরা যেকোনো ধরনের অপরাধ শনাক্ত করতে এবং কন্ট্রোলরুমে তাৎক্ষণিক সতর্ক সংকেত পাঠাতে সক্ষম হবে। এআই প্রযুক্তির আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক।