
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের সরকারি প্রক্রিয়া ও এ সংক্রান্ত হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়কে কেন্দ্র করে বন্দরে উত্তাল হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর। চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহ¯পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের কারশেড ও আশপাশের এলাকায় বন্দর রক্ষা পরিষদসহ বিভিন্ন শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা এনসিটি টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
একইসাথে ইজারা প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে আগামী শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ও রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বন্দর এলাকায় শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে শ্রমিক-কর্মচারীরা। দাবি আদায় না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
আন্দোলনকারীরা জানান, কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। রোববার একই সময়ে বন্দরের সব প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে। এ সময় পণ্য ওঠানামা, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও জাহাজ থেকে পণ্য খালাসসহ সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
শ্রমিক নেতারা বলেন, হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে সরকারের অবস্থান আরও ¯পষ্ট হওয়ায় তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, আদালতের রায়ের আড়ালে বন্দরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সিবিএর সাবেক প্রচার স¤পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেশের একমাত্র প্রধান সমুদ্রবন্দর পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি শুধু চাকরির প্রশ্ন নয়, এটি জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও আমরা এই বন্দর রক্ষা করব।
শ্রমিকদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যানকে অপসারণ, বর্তমান বন্দর বোর্ডকে অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করা এবং জাতীয় স¤পদ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা বা হস্তান্তর না করা।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ স¤পাদক ইব্রাহিম খোকন বলেন, আমরা আদালতের বিরুদ্ধে নই। আমরা সরকারের সেই কূটকৌশলের বিরুদ্ধে, যার মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র।
তিনি বলেন, সারাদেশ নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে আছে। এর ফাঁকে সরকার চট্টগ্রাম বন্দর এবং দেশের সবচেয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এনসিটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আমরা এ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে গত দেড় বছর ধরে আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু সরকার বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে।
আমরা মনে করি এনসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়া চরম আত্নঘাতী একটি সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব চরমভাবে হুমকির সম্মুখীন হবে।
কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা এনসিটি বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করেছি। আগামী শনিবার ৮ ঘণ্টা বন্দরে অপারেশনাল কার্যক্রম এবং রোববার ৮ ঘণ্টা প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এরপরও সরকার এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিক্ষোভকে ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কারশেড, প্রশাসনিক ভবন ও বিভিন্ন প্রবেশপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এ দিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, অন্দোলন কর্মসূচির মধ্যে গত বছর এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন রিট করেন। সেই রিটের রায়েও এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কো¤পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বৃহ¯পতিবার দুপুরে বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন। এর ফলে চুক্তিপ্রক্রিয়ার চলমান কার্যক্রম চালাতে আইনি কোনো বাধা থাকল না।
এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে এই বিষয়ে করা রিট আবেদনের ওপর বিভক্ত রায় দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি-স¤পর্কিত প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করলেও, এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট আবেদন খারিজ করে রায় দেন।
পরে তখনকার প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিষয়টি নি®পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।
You cannot copy content of this page