
চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে দায়ের করা মামলার বিরুদ্ধে লড়বে ব্রিটিশ ল ফার্ম। এই আইনি লড়াইয়ে প্রতি ঘণ্টায় সরকারের ব্যয় হবে ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় দেড় লাখ টাকা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ল ফার্ম নিয়োগ এবং অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক আইনি সেবা কেনার প্রস্তাব উপস্থাপন করে।
সূত্রমতে, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে এস আলম পরিবার ২০২৪ সালের বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। দায়ের করা আরবিট্রেশন মামলা নং আইসিএসআইডি (কেস নম্বর এআরবি/২৫/৫২)। মামলাটি পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি’কে নিয়োগের অনুমোদন দেয়। প্রতিষ্ঠানটির সেবা নিতে সরকারকে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ ডলার করে দিতে হবে।
বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এস আলম এই অর্থ পাচারের বিষয়ে লন্ডনে মামলা করেছে এবং বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে চ্যালেঞ্জ করেছে। সেখানে আইনি লড়াই চালাতে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কোনো দেশের সরকার বা কোম্পানি ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিলে বিশ্বব্যাংকের আইসিএসআইডি সালিসি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করে। বাংলাদেশকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর জবাব দিতে হবে এবং বিষয়টি বেশ জটিল।
এস আলম পরিবারের অভিযোগ, গত বছরের অক্টোবরে ওয়াশিংটনে অবস্থিত আইসিএসআইডিতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এস আলম ও তার পরিবারের আইনজীবীরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিসি মামলার আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার যে সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
এস আলম পরিবার দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের লক্ষ্য করে ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ‘ভিত্তিহীন’ তদন্ত এবং ‘প্ররোচনামূলক মিডিয়া অভিযান’ চালাচ্ছে। এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থী।
সাইফুল আলম মাসুদ ২০০৯ সালে সাইপ্রাস এবং ২০২০ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নেন। এরপর ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর তিনি, তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং তাদের তিন ছেলে আহসানুল আলম, আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহির বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। একই দিন বিদেশি নাগরিক হিসেবে পরিবারটি বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল বা পিআর পায়। বর্তমানে এস আলম পরিবার সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে বসবাস করছে।
এস আলম পরিবার বলছে, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আইনের অধীনেও তারা সুরক্ষা দাবি করছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত ও সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয় সরকার।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের মোট পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। পাচার করা অর্থ উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, এস আলম পরিবার একাই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এস আলম ও তার সহযোগীরা একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ঋণ ও আমদানি জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেয়।








































