
দেশি নাকি বিদেশি কোম্পানি-কোন পথে পরিচালিত হবে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি)। বিষয়টি চুড়ান্ত হবে আগামীকাল ১৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার। এদিন এ সংক্রান্ত রিটের চুড়ান্ত রায় মিলবে উচ্চ আদালতে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট সবার নজর এখন উচ্চ আদালতের দিকে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় এই টার্মিনালটি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয় বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম নামে একটি সংগঠন।
সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরোধিতা করে আদালতে রিট করেন। আদালত এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত রায় প্রদান করলে নতুন করে বেঞ্চ গঠন করা হয়। যেখানে আগামীকাল ১৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার ওই রিটের চুড়ান্ত রায়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) এ তথ্য জানান বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন। তিনি জানান, বিদেশি অপারেটর নিয়োগে সরকারের নানা উদ্যোগ এবং বিরোধীপক্ষের আন্দোলনের মাঝে আদালতে উপরোক্ত রিট করা হয়।
কন্টেনার টার্মিনালটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা উক্ত রিটের ব্যাপারে গত ৪ ডিসেম্বর উচ্চ আদালত দ্বিধাবিভক্ত রায় প্রদান করেন। ওই দিন হাইকোর্ট বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি স¤পর্কিত প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করেছেন।
এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট আবেদন (রুল ডিসচার্জ) খারিজ করে রায় দেন। এতে করে প্রধান বিচারপতি নতুন করে বেঞ্চ গঠন করে পুনরায় শুনানি এবং রায় প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় আজ মঙ্গলবার নতুন বেঞ্চ উক্ত রিটের রায় প্রদান করবেন।
এই রায়ের উপর ভিত্তি করেই সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেবে নাকি নৌবাহিনীর ড্রাইডকই টার্মিনালটি পরিচালনা করবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর বিষয়টির সাথে বন্দর সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ জড়িত। ফলে এনসিটি কোন পথে যাচ্ছে সেকারণে বন্দর সংশ্লিষ্টদের সবার নজর এখন উচ্চ আদালতের রায়ের দিকে।
বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের ভাষ্য, ২০০৭ সালে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নির্মাণ এবং ইক্যুইপমেন্ট স্থাপনসহ টার্মিনালটি চালু করতে বন্দর কর্তৃপক্ষের আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়।
২০০৭ সালে আংশিক কার্যক্রম শুরু হলেও টার্মিনালটি পুরোদমে কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। সে সময় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হিসেবে এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পায় সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড। সরকারের রাজস্ব ফাঁকিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে টার্মিনালটি পরিচালনা করায় অন্তঃবর্তীকালীন সরকার এই চুক্তি বাতিল করে।
এরপর চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড টার্মিনালটি অপারেট করছে। মাত্র কয়েক মাসে এই টার্মিনালে সরকারি রাজস্ব বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সূত্র মতে, অত্যাধুনিক ইক্যুইপমেন্টসহ নানা সুযোগ সুবিধার ফলে প্রতি মাসেই টার্মিনালটির আয় বাড়ছে। ফলে বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী অনেকেই। নানা ধরনের সমীকরণও সক্রিয় এখানে।
রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে মুনাফায় থাকা দেশের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটিকে বিদেশি অপারেটরের হাতে দেয়ার সাম্প্রতিক প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছেন অনেকেই। ইতোমধ্যে বন্দরের নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত স্থায়ী-অস্থায়ী অনেক কর্মচারীসহ দেশের বামপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায়।
করেছেন অবরোধ, মশাল মিছিল, লাল পতাকা মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন। কিন্তু সরকার সবকিছু উপেক্ষা করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এই টার্মিনাল পরিচালনার ভার দেয়ার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছেন।
সূত্র আরও জানায়, এর আগে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) টার্মিনালটি পরিচালনায় ২০২৩ সালের মার্চে অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি।
এরপর ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি)। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রাখে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ বার্থিং নিতে পারে। এই টার্মিনালের বার্ষিক কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১০ লাখ টিইইউএস। যদিও বর্তমানে এটি ১২ লাখ টিইইউএসের বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪০ শতাংশের বেশি এ টার্মিনালেই হ্যান্ডলিং করা হয়।
You cannot copy content of this page