
চট্টগ্রাম মহানগরের পাহাড়তলী আমবাগান এলাকায় রেলওয়ের একটি পুকুর সংস্কার কাজে ‘সাগর চৃুরি’র মতো ঘটনা ফাঁস হয়েছে। এ নিয়ে পুরো চট্টগ্রামে আলোচনার ঝড় বইছে। এ ঘটনায় ক্ষেপেছেন স্থানীয়রা। যারা রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের (ডিআরএম) কাছে অভিযোগ দিতে এসেও পারেনি।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ঘটে এমন ঘটনা। শেষে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় দৈনিক ঈশান অফিসের ফোন নাম্বারে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন ক্ষুব্দ অভিযোগকারীরা। তারা জানান, পাহাড়তলী আমবাগান এলাকার পশ্চিম আমবাগান পুকুর সংস্কার কাজের অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থাপক বরাবরে অভিযোগ দিতে এসেও আমরা দিতে পারিনি। ওইদিন আমাদের অফিসে ঢুকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। অবশেষে অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরামর্শে বিয়য়টি আপনাকে জানালাম।
তারা অভিযোগ করেন, পশ্চিম আমবাগান পুকুর পাড়ের চারপাশে রেলওয়ের মতে আনুমানিক ৪০-৫০টি বসত ঘর রয়েছে। যাদের অনেকেই পুকুরটিতে গোসল করে। পুকুরটি কমপক্ষে ২০ ফুট গভীর। পুকুরের চারপাশে অর্ধশত বছরের পুরনো ৬০টি বিভিন্ন জাতের ফলদ গাছ রয়েছে। এরমধ্যে বেশিরভাগই আম, জাম, কাঠাল, নারিকেল গাছ। যেগুলোর ফল খেতো স্থানীয়রা। কিন্তু এসব ফল গাছ কেটে লুট করে নিয়ে গেছে সংস্কার কাজের ঠিকাদার পিন্টু ও তদারক কর্মকর্তা বিভাগীয় প্রকৌশল দপ্তর (ডিইএন)-২ এর উর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (আইডব্লিউ) মো. সোহেল।
তারা গত ৩০ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে ১ ফেব্রুয়ারি রবিবার পর্যন্ত তিনদিন গাছগুলো কেটে তিনটি ভ্যানগাড়িতে করে নিয়ে গেছে। এসব ফলদ গাছের প্রতিটির বাজার মূল্য কমপক্ষে ৪০ হাজার টাকা। সে হিসেবে অর্ধশত ফলদ গাছের মূল্য ২০ লাখ টাকা। পুকুরের চারপাশে গাইড ওয়াল নির্মাণ কাজের কথা বলে এসব গাছ কেটে লুট করে নিয়ে গেছে। গাছগুলো কাটার সময় ঠিকাদার পিন্টু ও ডিইএন-২‘র আইডব্লিউ মো. সোহেল উপস্থিত ছিলেন। তারা পুকুর পাড়ে থাকা আরও ১১টি গাছ কেটে লুট করে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছেন।
অন্যদিকে গাইডওয়াল তৈরীর জন্য এস্কেবেটর দিয়ে মাটি খুড়ে পুকুরের একতৃতীয়াংশ ভরাট করে ফেলেছে। যেখানে নতুন করে অবৈধ বসতি গড়ে তোলার পাঁয়তারা করছে। এতে প্রকৃতপক্ষে পুকুরটির অস্তিত্বই থাকবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা আরও বলেন, পুকুরটি যেখানে গভীর এবং চারপাশের পার ইট দিয়ে মোড়ানো সেখানে এটি সংস্কার নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুকুরটি সংস্কারের নামে সরকারি অর্থ লুটপাটের পাশাপাশি অর্ধশত বছরের অর্ধশত পূরনো ফলদ গাছগুলো কেটে লুটপাট শুরু করেছে। যার সত্যতা মিলেছে সরেজমিন পরিদর্শনেও। আর এই কারসাজিতে জড়িত ডিইএন-২‘র আইডব্লিউ মো. সোহেল ও ঠিকাদার পিন্টু। এ বিষয়ে অবগত বিভাগীয় প্রকৌশলী জিশান দত্তও।
বিভাগীয় প্রকৌশল দপ্তরের তথ্যমতে, ৩৫ লাখ টাকারও বেশি অর্থ ব্যয়ে পশ্চিম আমবাগান পুকুরটির সংস্কার কাজ শুরু করেছে রেলওয়ে। অথচ পুরো পুকুরটি এত টাকায় বিক্রয় হবে না। সংস্কার কাজের মধ্যে রয়েছে পুকুরটির চারপাশে শুধুমাত্র গাইড ওয়াল নির্মাণ। যা কারসাজির মাধ্যমে ঠিকাদার পিন্টু মোটা অঙ্কের কমিশন দিয়ে তৎকালীন বিভাগীয় প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলামের যোগসাজশে এই কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন। নানা অনিয়ম-দূর্নীতির মধ্যে রেলবিট চুরির অভিযোগে ডিইএন-২ দপ্তর থেকে রিয়াসাদ ইসলামকে সিআরবি সেতু দপ্তরের প্রকৌশলী পদে বদলি করা হয়। সেই পদ থেকে ডিইএন-২ দপ্তরে বদলি করে নিয়ে আসা হয় বর্তমান প্রকৌশলী জিশান দত্তকে। যা মিলেমিশে লুটপাট চালানোর মতো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিশান দত্ত বলেন, বিষয়টি আমি অবগত। এখানে কোন অনিয়ম হচ্ছে না। কাজের স্বার্থে গাছগুলো কাটা হয়েছে। গাছের সংখ্যা ৭-৮টির বেশি হবে না। গাছগুলো গুদামে রাখা হয়েছে। পুকুর সংস্কার কাজের অপ্রয়োজনীয়তা ও গাছ কাটার বিষয়টি সিডিউলে আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিডিউলে আছে। আবার বলেন, কাজটি আগের, সে কারণে গাছ কাটার বিষয়টি সিডিউলে আছে কি না আমি নিশ্চিত বলতে পারছি না। তাছাড়া কাজটি নকশা মোতাবেক হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ডিআরএম স্যার আমাকে ফোন দিয়েছেন। আমি স্যারকে বুঝিয়ে দিয়েছি।
কিছুটা ভিন্নমত মিলেছে আইডব্লিউ মো. সোহেলের কাছ থেকে। তিনি বলেন, সিডিউলে গাছ কাটার বিষয়টি থাকতে হয় না। কাজ করতে হলে গাছ কাটতেই হবে। সে হিসেবে কাটা হয়েছে। গাছ বিক্রির টাকা কি রেলের রাজস্ব হিসাবে জমা হবে? এমন প্রশ্ন করা হলে সোহেল বলেন, গাছগুলো তো বিক্রি করি নাই। তাহলে গাছগুলো ভ্যানগাড়িতে করে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তো জানি না। এ সময় তিনি ঠিকাদার পিন্টুকে ফোন করার ভান করে। পরে ফোন না করেই মুঠোফান টেবিলে রেখে প্রকাশ্যে সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দিতে থাকেন। এ সময় তার চোখেমুখে টেনশন পরিলক্ষিত হয়।
এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদার পিন্টুর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। হুয়্যাটস অ্যাপ মেসেজ অপশনে খুদে বার্তা লিখে পাঠালেও তিনি কোন রকম কথা বলার প্রয়োজন মনে করেননি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা বলেন, বিষয়টি আমি জানি না। আপনাদের কাছ থেকেই শুনলাম। খোঁজ নিয়ে দেখি, কোন অনিয়ম হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
You cannot copy content of this page