
চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলা মিলিয়ে ১৬টি সংসদীয় আসনে এবার মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৯৬৫টি। এর মধ্যে ৬৫৩টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভোটগ্রহণে প্রস্তুত করা হয়েছে ৪০ হাজার কর্মকর্তাকে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বেলা পৌণে ১২টায় এ তথ্য জানান চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন। তিনি বলেন, আমরা কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছি না। আমরা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ কিংবা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বলছি।
তবে এটা ঠিক যে, যেসব কেন্দ্র কিছুটা দুর্গম এলাকায়, যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না, পাহাড়ি এলাকা অথবা সন্দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এলাকা, সেগুলোতে ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে আমরা পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েছি। আবার অনেক ভোটকেন্দ্র উপজেলার মূল কেন্দ্র কিংবা শহরের কাছাকাছি হলেও সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কিংবা তাদের সমর্থকদের মনোভাব, পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করছি যেসব ভোটকেন্দ্রে বেশি নজরদারি প্রয়োজন, সেখানে আমাদের অতিরিক্ত ফোর্স থাকবে। স্ট্রাইকিং ফোর্সকে আমরা এমন এলাকায় মোতায়েন রাখব, যেন যেকোনো ঘটনার খবর পেলে ২-৪ মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া এসব ভোটকেন্দ্রের আশপাশে সার্বক্ষণিক টহল তো থাকবেই।
বাড়তি নিরাপত্তা যেভাবে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩-১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে অস্ত্রসহ পুলিশ, অস্ত্রসহ আনসার-ভিডিপি সদস্য, লাঠিসহ পুরুষ ও মহিলা আনসার-ভিডিপির সংখ্যা ১০জন, গ্রাম পুলিশ থাকবে এক থেকে দু‘জন।
সেইসঙ্গে থাকবে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড। এ ছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনীও মোতায়েন থাকবে। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সতর্ক থাকবে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রে মোট ১২ হাজার একটি কক্ষ বা বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ছিল ২ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ দুই বছর পর হতে যাওয়া এবারের নির্বাচনে ৫৮টি ভোটকেন্দ্র কমেছে।
ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৬০৭টি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপির) ১৬ থানার আওতাধীন। বাকি ১৩৫৮টি কেন্দ্র জেলা পুলিশের ১৭টি থানার আওতাধীন। পুলিশের পক্ষ থেকে এসব কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছে। চট্টগ্রামে মোট ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৫৩টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ-গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। নগরীতে ৬০৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩১০টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর জেলা পুলিশের অধীনে ৩৪৩টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জেলার কিছু বিশেষ ও দূরবর্তী কেন্দ্র যেমন উড়িরচর, ফটিকছড়ি ও বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকাগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব এলাকায় সেনাবাহিনীর ইউনিট স্থাপন করে কাজ করা হচ্ছে।
ভোটগ্রহণে প্রস্তুত যারা
চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটির অবস্থান পুরোপুরি মহানগরীতে। তিনটি আসন জেলা ও মহানগরীর কিছু অংশ মিলে। বাকি ১০টি আসনের অবস্থান উপজেলায়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরী ও নগরী সংলগ্ন উপজেলা মিলিয়ে মোট পাঁচটি আসনে বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন, মহানগরীর একটি আসনে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী এবং জেলার ১০টি আসনে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন।
এছাড়া ভোটগ্রহণের জন্য প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার মিলিয়ে ৪০ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) তাদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে।
পৌছে গেছে ভোটের সরঞ্জাম
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে প্রত্যেক সংসদীয় আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে ব্যালট পেপার পৌঁছানো হয়েছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ব্যালট পেপার পাঠানোর কাজ শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ব্যালট বাক্সসহ ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণ পাঠানো হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় সূত্র জানায়, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ব্যালট পেপার ও অন্যান্য উপকরণ বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) অর্থাৎ ভোটের আগের দিন সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হবে। ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি উপকরণ সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এরপর বৃহ¯পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
চট্টগ্রামে মোট ভোটার :
চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে এবার মোট ভোটার ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন এবং নারী ভোটার ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৭০ জন।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৭৪ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৯, নারী ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮১১ ও তৃতীয় লিঙ্গের চার জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১০৬টি।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৫ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৯ হাজার ১৯৭, নারী ২ লাখ ২৯ হাজার ২৬৭ ও তৃতীয় লিঙ্গের একজন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৪০টি।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৫ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭২০, নারী ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৬৩ ও তৃতীয় লিঙ্গের দু‘জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৮৩টি।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড ও নগরীর একাংশ) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮০ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫২, নারী ২ লাখ ১৩ হাজার ১৬ ও তৃতীয় লিঙ্গের ১২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১২৪টি।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও নগরীর একাংশ) আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১ হাজার ৯১৬ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৬০ হাজার ৯০৩, নারী ২ লাখ ৪১ হাজার ১২ ও তৃতীয় লিঙ্গের একজন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৪৩টি।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৮ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৭১, নারী ১ লাখ ৬১ হাজার ১৭। মোট ভোটকেন্দ্র ৯৫টি।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩১, নারী ১ লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ ও তৃতীয় লিঙ্গের একজন। মোট ভোটকেন্দ্র ৯২টি।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও নগরীর একাংশ) আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৯ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৬, নারী ২ লাখ ৭২ হাজার ১২২ ও তৃতীয় লিঙ্গের একজন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৮৪টি।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৩ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১৩ হাজার ৯০৬, নারী ২ লাখ ২ হাজার ৪৪৮ ও তৃতীয় লিঙ্গের নয়জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১২১টি।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, হালিশহর ও খুলশী) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৪৪ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪, নারী ২ লাখ ৪২ হাজার ৬৩১ ও তৃতীয় লিঙ্গের ২৯ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৩৯টি।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৮ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৩৩, নারী ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৪২ ও তৃতীয় লিঙ্গের তিন জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৪৩টি।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৯৫ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৫৪, নারী ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪০ ও তৃতীয় লিঙ্গের একজন। মোট ভোটকেন্দ্র ১০৮টি।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৫ হাজার ২৪৬ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭ হাজার ৭১৪, নারী ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৩২। মোট ভোটকেন্দ্র ১১৮টি।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার একাংশ) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৭, নারী ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৫ ও তৃতীয় লিঙ্গের একজন। মোট ভোটকেন্দ্র ১০০টি।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়ার একাংশ ও লোহাগাড়া) আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ৫৯ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭০ হাজার ৯১৫, নারী ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৪। মোট ভোটকেন্দ্র ১৫৭টি।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১১ হাজার ২৭৪ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮২, নারী ১ লাখ ৯১ হাজার ২৮৭ ও তৃতীয় লিঙ্গের পাঁচ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১১২টি।