
# ঘটনা ধামাচাপা দিতে দুই প্রকৌশলীর বদলি
# তদন্ত কমিটি গঠনেও মেলেনি সুরাহা
# প্রধান প্রকৌশলীর রহস্যজনক চাতুর্যপনা ও প্রহসন
চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৩০০ টন রেলবিটের স্ক্র্যাপ গায়েব হয়ে গেছে। যার বাজার মূল্য দেড় কোটি টাকারও বেশি। এই ঘটনায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) রিয়াসাদ ইসলামসহ আরও এক উর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিও এই রেলবিট স্ক্র্যাপ গায়েবের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। অভিযোগ উঠেছে, বিভাগীয় প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলাম রেলের রাজা খ্যাত এক ঠিকাদারের মাধ্যমে এই রেলবিট স্ক্র্যাপ পাচার করে গায়েব করেছেন। আর সেই প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলামকেই করা হয়েছে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক। যা প্রকৌশল বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী তানভিরুল ইসলামের রহস্যজনক চাতুর্যপনা ও প্রহসন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনের জন্য রেল লাইন স্থাপন করেন ব্রিটিশরা। যা কালক্রমে হারিয়ে যায় নতুন রেল লাইন স্থাপনের ফলে। সড়ক পথে পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি রেলপথেও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে মজুদ করা হয়। সেখান থেকে রেলপথে ঢাকাসহ সারাদেশে পণ্য পরিবহন করে সরবরাহ করা হয।
আধুনিক এই সরবরাহ লাইনের কারণে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত রেল লাইন প্রায় মাটির নিচে চাপা পড়ে। যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৮০‘র দশক থেকে স্ক্র্যাপ হিসেবে এসব রেলবিট সংগ্রহ করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল প্রকৌশল বিভাগ। সেই ধারাবাহিকতায় প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) ৩ রিয়াসাদ ইসলামের তত্ত্বাবধানে গত কয়েকমাস আগে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৩০০ টন পূরণো রেলবিট স্ক্র্যাপ সংগ্রহ করা হয়। যা প্রথমে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে মজুদ করা হয়। পরে সেখান থেকে রেলওয়ের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে জমা করা হয়। এই রেলবিট স্ক্র্যাপ মজুদের দায়িত্বে ছিলেন ডিইএন-৩ প্রকৌশলীর অধিনস্ত উর্ধ্বতন উপসহকারি প্রকৌশলী গোলাম সরওয়ার।
কিন্তু পরে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ থেকে রেলের রাজা খ্যাত এক ঠিকাদারের টেন্ডার পাওয়া স্ক্রাপের সাথে মূল্যবান এসব রেলবিট পাচার করে দিয়ে গায়েব করে ফেলা হয়। আর এঘটনা ধামাচাপা দিতে তাৎক্ষণিকভাবে উর্ধ্বতন উপসহকারি প্রকৌশলী গোলাম সরওয়ারকে লাকসাম বদলি করা হয়। কিন্তু রেলবিট স্ক্র্যাপ গায়েবের মূলহোতা প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলামকে বদলি করে প্রকৌশল বিভাগের সিআরবির ব্রিজ দপ্তরে বসানো হয়। যা প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলামের জন্য পুরস্কারে পরিণত হয়।
সূত্র মতে, প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলাম ডিইএন-২ ও ৩ দুই দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন তখন। রেলবিট গায়েবের ঘটনায় তাকে ডিইএন-২ দপ্তর থেকে বদলি করা হলেও ডিইএন-৩ দপ্তর ব্রিজ দপ্তরে এখনো ডুয়েল দায়িত্ব পালন করছেন। আর এ অবস্থায় প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে রেলবিট গায়েবের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যা সত্যিই প্রহসনমূলক। আর এই তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন প্রকৌশল বিভাগের প্রƒধান প্রকৌশলী তানভিরুল ইসলাম।
এই বিষয়ে জানতে গিয়ে প্রধান প্রকৌশলী তানভিরুল ইসলাম দৈনিক ঈশানের এই প্রতিবেদককে বারংবার সময় দিয়ে ঘুরান। গত বছর ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে তিনি প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে বলেন, ঘটনা তদন্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।
দ্বিতীয় দফায় ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে বলেন, তদন্ত কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। প্রতিবেদন জমা দিলে বিস্তারিত জানাব। এর অন্তত ২০ দিন পর বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা হলেও এখনো খোলা হয়নি। প্রতিবেদন খোলার পর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিং করে বিষয়টি সাংবাদিকদের জানানো হবে।
কিন্তু সর্বশেষ জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সাক্ষাতে তিনি বলেন, না প্রতিবেদন জমা হয়নি। মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনরকম সহযোগীতা করতে নারাজ। সে কারণে প্রতিবেদন তৈরী করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক।
এ বিষয়ে জানতে গত ২২ জানুয়ারি তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও ডিইএন-৩ প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলাম বলেন, রেলবিট গায়েব হওয়ার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। যা শুনেছেন ভুল শুনেছেন। তাহলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হল কেন এবং বদলিও হলেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওইতো তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক আমি। কিন্তু এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কেউ কোন সহযোগীতা করেনি। ফলে কোনরকম ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর বদলি তো স্বাভাবিক একটা বিষয়।
কী ব্যবস্থা নিবেন? আপনার হাতেই রেলবিট স্ক্র্যাপ গায়েব হল আর সেই ঘটনা তদন্তে আপনাকেই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হলো! বিষয়টা ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না-এমন হলো না? এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াসাদ ইসলাম হকচকিয়ে উঠে বলেন, ভাই আমাকে কি আপনি একদিন চিনতেছেন। আমার পক্ষে কি এমন দূর্নীতি করা সম্ভব? আপনিই বলুন। এভাবে বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দরের চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কন্ট্রোলার অব স্টোরস কর্মকর্তা মো. আবদুল হান্নান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় স্থাপিত রেলবিট স্ক্র্যাপ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণাধীন। এ বিষয়ে আমাদের সহযোগীতার এখতিয়ার বন্দরের নেই। আর এ বিষয়ে রেলওয়ের কেউ বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগও করেনি।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা রাহিদ হোসেন বলেন, স্ক্র্যাপ সংগ্রহের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তার তালিকা করে আমাদের দপ্তরে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু রেলবিটের কোন তালিকা জমা হয়নি। ফলে এটি অমীমাংসিত। এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারছি না।
(শীঘ্রই তৃতীয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। প্রকৌশল দপ্তরের অনিয়ম ও দূর্নীতি বিষয়ক যে কোন তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করার জন্য দৈনিক ঈশানের প্রিয় পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে)











































