রবিবার- ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভাসছে ৮৫ মাদার ভেসেল

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভাসছে ৮৫ মাদার ভেসেল

# লাইটারেজ সংকটে হচ্ছে না পণ্য খালাস
# আটকা ৪০ লাখ মেট্টিকটন পণ্য
# অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করলেন আমদানিকারকরা

ট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভাসছে আমদানি পণ্যের ৮৫ মাদার ভেসেল বাব বড় জাহাজ। যেখানে আটকে পড়েছে প্রায় ৪০ লাখ মেট্টিক টন আমদানি পণ্য। যার মধ্যে রয়েছে খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল। এসব পণ্য খালাসে বিলম্ব হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের ড্যামারেজ বা জরিমানা গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।

আমদানিকারকরা জানান, লাইটারেজ জাহাজের সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল বোঝাই ৮৫টিরও বেশি বড় জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভাসছে। এর মধ্যে ৬১টি বড় জাহাজে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। জাহাজগুলোতে প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য রয়েছে।

এসব পণ্যের অনেকাংশ পঁেচ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পণ্য খালাসে বিলম্ব হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এসব পণ্য দ্রুত খালাসে ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন রমজান মাসে পণ্যমূল্যের ওপর বড় ধরণের প্রভাব পড়বে। এতে ভোগান্তিতে পড়বেন ভোক্তারা।

সূত্র জানায়, গত কয়েক মাস ধরে খাদ্যশস্য বহনকারী বেশ কিছু লাইটারেজ জাহাজ নির্ধারিত গন্তব্যে গিয়ে পণ্য খালাস না করে মাসের পর মাস সাগরে ভাসছে। আমদানিকারকরা এসব জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করায় লাইটার জাহাজগুলো মূল কার্যক্রমে ফিরতে পারছে না। লাইটারেজ জাহাজের প্রকৃত সংকটের চেয়েও অব্যবস্থাপনা ও জাহাজের অপব্যবহারই এই পরিস্থিতির জন্য বেশি দায়ী। এটি একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি সংকট।

আমদারিকারকরা জানান, বড় শিল্প গ্রুপগুলো নিজস্ব লাইটারেজ জাহাজ ব্যবহার করে পণ্য খালাস করলেও অন্যান্য আমদানিকারকরা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) থেকে জাহাজ বুকিং নেন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী লাইটার জাহাজ না পাওয়ায় অর্ধশতাধিক মাদার ভেসেলের পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটরদের তথ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে একটি মাদার ভেসেল প্রায় ৫০ হাজার টন পণ্য নিয়ে বন্দরে এলে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে খালাস শেষ করে চলে যায়। বর্তমানে লাইটারেজ সংকটের কারণে সেই সময়সীমা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। অনেক বড় জাহাজকে ২০ থেকে ৩০ দিন বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কোনো জাহাজ কয়েক দিন ধরে এক টন পণ্যও খালাস করতে পারছে না।

শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বহির্নোঙরে অবস্থানরত প্রতিটি মাদার ভেসেলকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ড্যামারেজ গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএইচবিওএ) সভাপতি সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, মাদার ভেসেল দ্রুত আসছে, কিন্তু পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। স্বাভাবিক পণ্য প্রবাহ বজায় রাখতে প্রতিদিন যেখানে ২০০ থেকে ৩০০টি লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন। সেখানে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি। ফলে খালাস কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে বিডব্লিউটিসিসি এই সংকটের জন্য ঘন কুয়াশা ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সারের কাজে নিয়োজিত ১৪০টি জাহাজ আটকে থাকাকে দায়ী করেছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কুয়াশার কারণে কিছুটা দেরি হলেও মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনাগত। তারা সংকট নিরসনে জাহাজ বরাদ্দে সিরিয়াল প্রথা বাতিল করে উন্মুক্ত ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।

ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগং (আইভোয়াক)-এর সহসভাপতি পারভেজ আহমেদ বলেন, বিডব্লিউটিসিসির অধীনে প্রায় ১ হাজার ২০০টি লাইটার জাহাজ ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি মোংলা বন্দরে চলে গেছে। এছাড়া ৬৮৭টি জাহাজ বহির্নোঙর থেকে পণ্য বোঝাই শেষে খালাস করে ফিরে না আসায় আমরা চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ সরবরাহ করতে পারছি না।

তিনি বলেন, সাধারণভাবে একটি লাইটার জাহাজের বহির্নোঙর থেকে ঘাটে পণ্য এনে খালাস করতে ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু বর্তমানে একেকটি লাইটার জাহাজ এক থেকে দেড় মাস ধরে পণ্য খালাস না করেই পড়ে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বড় আমদানিকারকদের মজুতদারি, নিয়ন্ত্রণহীন আমদানি এবং ধীর ও প্রায় ম্যানুয়াল-খালাস নির্ভর ব্যবস্থা এই তিনটি কারণ একসঙ্গে বন্দরের কার্যক্রম ও লাইটারিং সক্ষমতাকে ভেঙে পড়ার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী জানান, সাপ্লাই চেইনে শৃঙ্খলা ফেরাতে খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহনে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একাধিক টাস্কফোর্স গঠন করেছে। খুলনায় একটি এবং ঢাকা অঞ্চলে (নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ) দুটি টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ করছে এবং তাদের প্রতিদিন অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত এসব টাস্কফোর্সকে ইচ্ছাকৃতভাবে লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব করা, এবং রমজান সামনে রেখে পণ্য মজুত ও দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহারকারী আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঈশান/মখ/বেবি

আরও পড়ুন :  চট্টগ্রামে তারেক রহমান

আরও পড়ুন

জনপ্রিয়

You cannot copy content of this page