
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিটি পিয়নও নাকি কোটিপতি। এ জন্য বন্দরের চাকরিকে বলা হয় সোনার হরিণ। আর যদি হয় বন্দর পরিচালক পর্যায়ের কোন কর্মকর্তা তাহলে বুঝুন তিনি কত অর্থ-সম্পদের মালিক। এমন এক রোমহর্ষক কাহিনীর জন্ম হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বলা হচ্ছে-চট্টগ্রাম বন্দর যেন তাঁর আলাদিনের চেরাগ। যিনি চাইলেই চলে আসে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
তিনি হলেন-বন্দরের অত্যন্ত সুপরিচিত সাবেক সচিব ও বর্তমান পরিচালক প্রশাসক (সদ্য পদোন্নতি প্রাপ্ত) কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক। কর্মজীবনের শুরুতে যিনি নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম বন্দরে। পরবর্তীতে নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করে অফিসার পদে যোগদান করেন।
এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ওমর ফারুককে। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের অদৃশ্য ক্ষমতাবলে খুব দ্রুত একের পর এক পদোন্নতি পেতে থাকেন অত্যন্ত চতুর এই কর্মকর্তা। যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসে তখন সেই সরকারের মন্ত্রীদের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে জাহির করেন তিনি।
সর্বশেষ নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের সিন্ডিকেট এর প্রধান সহযোগী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে পদোন্নতি সকল নিয়ম নীতিকে উপেক্ষা করে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বন্দর সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। যদিও এটা মন্ত্রণালয়ের বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদ।
সেই থেকে টানা ১১ বছর বন্দর সচিব এর পদ আঁকড়ে ধরে ছিলো সাবেক সরকারের মন্ত্রীদের অবৈধ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে। নিজেও আয় করেছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। বন্দরের চেয়ারম্যান এবং মেম্বার কয়েক বছর পর পর পরিবর্তন হলেও ওমর ফারুক একই পদে রয়ে যায় বছরের পর বছর।
ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে একক আধিপত্য সিন্ডিকেট তৈরি হয় তান। যাদের মাধ্যমে প্রতিদিন তাঁর পকেটে ঢুকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। বন্দর গেইটে টোকেন সিন্ডিকেট, ইয়ার্ড সিন্ডিকেট, পরিবহণ সিন্ডিকেট, বন্দরের পণ্য চোরাই সিন্ডিকেট, কমিশন সিন্ডিকেট, বদলি বাণিজ্য সিস্ডিকেট, নিয়োগ বাণিজ্য সিন্ডিকেট, অবৈধপণ্য রপ্তানি ও আমদানি কাজের সিন্ডিকেটসহ বহু সিন্ডিকেট চলে তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ওমর ফারুক বন্দরে নিয়োগ, পদোন্নতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বিদেশে সন্তানদের পড়াশোনার নামে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার ভাগ্নের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালিত হয় বন্দরের বিভিন্ন বিভাগে।
বিগত বছরগুলোতে সচিব ওমর ফারুক এর বিরুদ্ধে ওয়াচম্যান কল্যাণ তহবিলের ১৭ কোটি টাকা আত্মসাতে সহযোগিতার মূল কারিগর ছিলেন। সাংবাদিকদের নামে মিথ্যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানে বিশাল অঙ্কের কমিশন খেয়ে ওমর ফারুক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায়ও সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সূত্র আরও জানায়, ওমর ফারুক চট্টগ্রাম শহরের খুলশি এলাকায় স্বজনদের নামে কিনেছেন একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায়ও করেছেন বিলাস বহুল বাড়ি। দুবাই ও কানাডায়ও কিনেছেন বিলাস বহুল একাধিক বাড়ি। গড়েছেন নানা সম্পদ। এ নিয়ে মতবিরোধ তৈরী হওয়ায় বন্দর সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা কর্মচারীকে নানা রকম হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আর তিনি হয়ে উঠেছেন পাহাড়সম সম্পদের মালিক। চরম দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক মামলা দুদকের তদন্তাধীন রয়েছে।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়ে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে কোনরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু পরিচালক প্রশাসক পদে দিয়েছেন পদোন্নতি। একাধিক সুত্র বলছে, বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান আসিক চৌধুরীকে ম্যানেজ করেই তিনি এই পদোন্নতি হাতিয়ে নিয়েছেন। আগামী মাসে সরকারি চাকরি শেষে তিনি ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে সদ্য পদোন্নতি পাওয়া বন্দর পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তা বিজি পাওয়া যায়। হুয়্যাটস অ্যাপের মেসেজ অপশনে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনরকম রেসপন্স করেননি।
You cannot copy content of this page