
য্ক্তুরাষ্ট্র ও ইসরায়েলেরসঙ্গে যুদ্ধের জেরে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে দেশে ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিকটন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড) সময়মতো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি করা এসব ক্রুড ভাড়া করা বৃহদাকার অয়েল ট্যাঙ্কারে করে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার সিডিউল রয়েছে। সিডিউল অনুযায়ী সৌদি বন্দর ত্যাগ করা ট্যাঙ্কার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার কথা আগামী ১৪ বা ১৫ মার্চ। তবে যুদ্ধের কারণে সিডিঊল এলোমেলো হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এটি পৌঁছতে দেরি হলে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) স্টোরেজ ট্যাঙ্কে ফুরিয়ে যাবে ক্রুড। আর ক্রুড না থাকলে ইআরএলে জ্বালানি তেল উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে।
গত শনিবার রাতে ইরানের আধাসরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো অয়েল ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এতে বলা হয়, ওই এলাকায় থাকা ট্যাঙ্কারগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) একটি বার্তা পাচ্ছে। বার্তায় কৌশলগত এই প্রণালি দিয়ে কোনো ট্যাঙ্কার চলাচল করতে পারবে না বলে সতর্ক করা হচ্ছে।
বিপিসি সূত্র জানায়, সৌদি আরবের রাস্তানুরা বন্দরে বিপিসির ক্রুড ভর্তি করা হবে অয়েল ট্যাঙ্কার ‘এমটি নরডিক পোলাক্সে’। বাংলাদেশ সময় আজ সোমবার ভোর ৫টায় ট্যাঙ্কারটি রাস্তানুরা বন্দরে ভেড়ার সিডিউল রয়েছে। ভেড়ার পর কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ক্রুড ভর্তি শুরু করা হবে। ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে ক্রুড ভর্তির কাজ শেষ হবে। কাল ৩ মার্চ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকালের দিকে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে রাস্তানুরা বন্দর করার কথা। পূর্ব নির্ধারিত সময়ে ট্যাঙ্কারে ক্রুড ভর্তি শুরু করতে আপাতত কোনো বাধা নেই।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেখা দিয়েছে বিপত্তি। বিপুল ক্রুড ভর্তি করার পর ট্যাঙ্কারটিকে বন্দরে অপেক্ষা করার সুযোগ দেওয়া নিয়ে সংশয় আছে। রাস্তানুরা বন্দর কর্তৃপক্ষ সে ক্ষেত্রে অপরাগতা প্রকাশ করতে পারে। এতে নির্ধারিত সময়ে সৌদি বন্দরে ট্যাঙ্কারটি ভিড়লেও বন্দর ত্যাগ করতে পারবে কি না তা নিশ্চিত নয় বিপিসি কিংবা অয়েল ট্যাঙ্কারটির বাংলাদেশি শিপিং এজেন্ট।
বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স অ্যান্ড প্ল্যানিং) মণি লাল দাশ বলেন, ২ মার্চ ক্রুড ভর্তি করার কথা মাদার ট্যাঙ্কারে। ৩ মার্চ এটি সৌদি আরবের বন্দর ত্যাগ করার সিডিউল রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সময়মতো ক্রুডগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছবে কি না তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকাল বন্ধের সুযোগ নেই। এই প্রণালি দিয়ে আরও বিভিন্ন দেশের তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করে। তাই হয়তো বাংলাদেশের আমদনির জন্য নির্ধারিত ক্রুড নিয়ে ট্যাঙ্কার দেশে পৌঁছতে দীর্ঘ সময়ের জন্য কোনো সমস্যা নাও হতে পারে।
জাহাজটির বাংলাদেশি শিপিং এজেন্ট প্রাইম ওশিয়ান ট্রেড লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বিপিসি বছরে ১৪ লাখ মেট্রিকটন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। পরিশোধিতজ্বালানিতেলগুলো মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি করা হয়। তাই পরিশোধিত এসব তেল আমদানি করতে সব ট্যাঙ্কারকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না।
কিন্তু ক্রুডের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। মাত্র দুটি দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড আমদানি করা হয়। দুই দেশের দুটি বন্দর থেকেই ক্রুড আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের রাস্তানুরা বন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবলদানা বন্দর। আবার সেই দুটি দেশের বন্দর থেকে ক্রুডবাহী অয়েল ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি ছাড়া বিকল্প কোনো সমুদ্রপথে বা ঘুরপথে আসতে পারে না। তাই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেজ্বালানিতেল আমদানির জন্য উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি :
বিশ্বের অন্তত ২০ থেকে ২১ শতাংশ পরিশোধিত ও অপরিশোধিতজ্বালানিতেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এটির দৈর্ঘ্য ৩৩ কিলোমিটার স্থানভেদে সর্বোচ্চ ৩৯ কিলোমিটার থেকে সর্বনিম্ন তিন কিলোমিটার। এই প্রণালির একপাশে ইরান আর আরেক পাশে ওমানের অবস্থান। জলপথটি একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরকে আরব সাগর ও ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি আবার ইরানকে আরব উপদ্বীপ থেকে পৃথক করেছে। প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দরে পৌঁছায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং তার সমপরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে সরবরাহ করা জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়।
সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাক বেশিরভাগ তেলবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি দিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বন্দরে যায়। যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালিকে সবসময় অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। এটি বন্ধ করে দেওয়ায় প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ বিঘ্ন ঘটবে। এতে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশিজ্বালানিনিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধের ঝুঁকি :
সৌদি আরব থেকে বিপিসি এবার আমদানি করছে আরব লাইট ক্রুড বা এএলসি নামে পরিচিত অপরিশোধিতজ্বালানিতেল। প্রতি মাসে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড আমদনি করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয় মার্বান ক্রুড। মানের দিক থেকে দুটি ক্রুডের মধ্যে পার্থক্য আছে। তবে দুই ধরনের ক্রুড পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইআরএলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কে ভর্তি করা হয়। এরপর উৎপাদন করা হয় কয়েক ধরনেরজ্বালানিতেল।
এর মধ্যে আছে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল। উপজাতজ্বালানিহিসাবে উৎপাদন করা হয় ন্যাফতা, বিটুমিন ও এলপিজি। চলতি সেচ মৌসুমে গড়ে প্রতিদিন ১৩-১৪ হাজার মেট্রিকটন ডিজেল বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে। এভাবে নির্ধারিত হারে কেরোসিন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলও বিক্রি হচ্ছে ডিপো থেকে। দেশে প্রতি মাসে পরিশোধিতজ্বালানিতেল আমদানি করা হয়। কিন্তু ডিপোতে মজুদ সংকট এবং চাহিদা সামাল দিতে ইআরএল থেকে উৎপাদিতজ্বালানিবড় ভূমিকা পালন করে আসছে। কোনো কারণে পরিশোধিতজ্বালানিতেলের সরবরাহ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছতে দেরি হলে ইআরএলের জ্বালানি তেলে আপদকালীন সংকট নিরসন হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানি করা ক্রুডের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা খুবই জরুরি বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। আগামী ১৪ বা ১৫ মার্চ ক্রুডবাহী ট্যাঙ্কার এমটি নরডিক পোলাক্স চট্টগ্রাম বন্দরে না পৌঁছলে সংকট দেখা দিতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরএলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, স্টোরেজ ট্যাঙ্কে এখনও ক্রুডের মজুদ আছে। সৌদি বন্দর থেকে চলতি মাসের মাঝামাঝি ক্রুডের সরবরাহ না পৌঁছলে সংকট দেখা দেবে। ক্রুড না থাকলে ইআরএল বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। অথচ এখন সারা দেশে সেচের ভরা মৌসুম। জমিতে সেচের জন্য সারা দেশের ডিপোতে প্রতিদিন বিপুল ডিজেলের চাহিদা আছে। আমরা আশা করছি সময়মতো না পৌঁছলেও ট্যাঙ্কারটি অন্তত চলতি মাসের শেষ দিকে পৌঁছবে। অন্যথায় ডিজেলের মজুদ সংকট দেখা দিতে পারে।
You cannot copy content of this page