কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জনসংযোগ ও সমন্বয়ক ডিপার্টমেন্টের (পিআরও) উপমহাব্যবস্থাপক বেলাল উদ্দিন একজন ঠিকাদারও। বিভিন্ন নামে ও বেনামে তার রয়েছে একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স। আবার শেয়ারও রয়েছে অনেক ঠিকাদারের লাইসেন্সে।
যেগুলো দিয়ে প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার ভাগিয়ে নিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের সাথে চুক্তিতে কাজ করান তিনি। সম্প্রতি শা.. এন্টারপ্রাইজ নামে একটি লাইসেন্স দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারীতে ১৮ লক্ষ টাকার একটি কাজ ভাগিয়ে নেন তিনি। যার কোন রকম দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।
এ সুযোগে ইস্টার্ন রিফাইনারী থেকে ওই কাজের ৮২ লাখ টাকার কার্য সমাপ্তি সনদ নিয়ে সরকারের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন সুচতুর ও প্রতাপশালী বেলাল উদ্দিন। এ কাজের সাথে কেজিডিসিএলের আরও এক কর্মকর্তা ও ইস্টার্ন রিফাইনারী লিমিটেড এর কর্মকর্তা জড়িত। যারা কাজের ৫ গুণ বেশি টাকা হাতিয়ে ভাগবাটোয়ারা করেছেন।
জানা গেছে, আর এফ কিউ মাধ্যমে নেয়া এ কাজের দরপত্র আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং এই পদ্ধতিতে ৬ লাখ টাকার বেশি কার্যাদেশের নিয়ম নেই। কিন্তু এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করেই কোনরকম দরপত্র আহ্বান ছাড়াই ১৮ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেখিয়ে ৮২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন পিআরও বেলাল উদ্দিন।
শুধু শা.. এন্টারপ্রাইজ নয়, বে.. ট্রেডার্স, বি.. এন্টারপ্রাইজ, ম.. এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন নামে তার একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে। যেগুলো দিয়ে তিনি কেজিডিসিএলের সব ধরণের কাজের টেন্ডার হাতিয়ে নেন। এসব লাইসেন্সের কপি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য কুখ্যাত সন্ত্রাসী মহিউদ্দিন বাচ্চুর ভাই হওয়ায় তার ভয়ে তটস্থ থাকেন কেজিডিএসএলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানের এমডি পর্যায়ের অনেকে তারই সাথে আঁতাত করে নানা অনিয়ম দূর্নীতি চালিয়ে সরকারি অর্থ লোপাট করে চলেছেন বেলাল উদ্দিন।
তার অনিয়ম দূর্নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে, নামে-বেনামে গ্যাস সংযোগ প্রদান। যদিও সরকারিভাবে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু বন্ধের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গ্যাস সংযোগ অব্যাহত রয়েছে। একেকটি গ্যাস সংযোগ থেকে ১০-১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া বিএনপি-জামায়াতসহ প্রতিপক্ষ দলের কোন নেতাকর্মীর বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ নানা অজুহাতে বিচ্ছিন্ন করে হয় গোপনে অর্থ আদায় করে ফের সংযোগ দিচ্ছে। নয়, ৫-৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ওই গ্যাসের মিটার নতুন কোন গ্রাহকের বাড়িতে সংযোগ দিয়ে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় এমন অসংখ্য ভুক্তভোগী রয়েছে।
আর গ্যাস সংযোগের কাজ পাওয়া ঠিকাদাররা টাকার ভাগ না দিলে কার্যাদেশ নিয়ে ঘুরাঘুরি করে। অথবা ওই কাজ পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এছাড়া অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্যও তার হাতের মুঠোয়। বেলাল উদ্দিন যা বলে প্রতিষ্ঠানের এমডি তাই করে। বেলালের কথার বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। দুদক বা নিরপেক্ষ কোন তদন্ত সংস্থার তদন্তে থলের বেড়াল বেরিয়ে পড়বে।
এভাবে নানা অনিয়ম ও দুর্নিিতর মাধ্যমে বেলাল উদ্দিন চট্টগ্রাম শহরে এখন অঢেল সম্পদের মালিক। অথচ গত ২০১০ সালে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে বেলাল উদ্দিনের নিয়োগ হয়েছিল কেজিডিসিএলে। তাও সন্ত্রাসী কায়দায়। তৎকালীন এমডি সানোয়ার হোসেন ও জি এম এডমিন আহসান হাবীবকে পিস্তলের মুখে বেলালসহ ৫৭ কর্মকর্তার নিয়োগ আদায় করেন মহিউদ্দিন বাচ্চু।
অথচ নিয়োগপ্রাপ্তরা কেউ এই নিয়োগ পরীক্ষায় পাশও করেনি। কেউ ভাইভাও দেয়নি। আবেদনে অনেকের ব্যাংক ড্রাফট পর্যন্ত ছিল না। এ কাজে মহিউদ্দিন বাচ্চু হাতিয়ে নেন প্রায় ১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেলাল উদ্দিনের সনদ জালিয়াতিও রয়েছে।
জাল সনদে নিয়োগ পাওয়া সেই বেলাল রাতারাতি হয়ে উঠে কেজিডিসিএলের অঘোষিত হর্তাকর্তা। তার কথার বাইরে এক চুল, এমনকি নিশ্বাসও ফেলতে পারত না প্রতিষ্ঠানের এমডির পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এ সুবাধে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্প কাজের টেন্ডার থেকে লুটেছেন ১০% কমিশন। অফিসের স্টেশনারী ক্রয় থেকে এমন কোন বিল বাদ যায়নি সে লুটপাট করেনি।
এছাড়া সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ ও শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের আজ্ঞাবহ হয়ে ছাত্রলীগের দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে কেজিডিসিএলে চাকরি দিয়েছেন বেলাল উদ্দিন। যাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে হাতিয়েছেন ২০-২৫ লাখ টাকা করে। এর মধ্যে ফারুক, কাউছার নুর লিটন অন্যতম। যারা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিভিন্ন পদে রয়েছেন।
এ অবস্থায় গত বছর জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার উপর গুলি চালানোর জন্য ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন বেলাল উদ্দিন ও মহিউদ্দিন বাচ্চু। ছাত্রলীগের হাতে তুলে দেন কাড়ি কাড়ি টাকা। বেলাল উদ্দিন ৩ আগষ্ট ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে সিএনজি যোগে অস্ত্র নিয়ে নিজ বাসভবনে বিলি করে। ৪ আগস্ট ২০২৪ তার বড় ভাই এমপি বাচ্চু চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এলাকায় অস্ত্র হাতে নিজে গুলি করে ছাত্রদের উপর।
তবে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মহিউদ্দিন বাচ্চু গা ঢাকা দেওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দখলবাজি, চাঁদাবাজি হাতবদল হলেও নিয়মিত চাকরি করে আগের মতোই কেজিডিসিএল লুটছে বেলাল উদ্দিন। এমনকি সরকারি চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে শুরু থেকে অদ্যাবধি বাড়ির পাশেই চাকরি করে যাচ্ছেন বেলাল উদ্দিন। এসব নিয়ে কেজিডিসিএলের কর্মকর্তাদের অনেকেই ক্ষিপ্ত।
এ নিয়ে গত ১১ আগস্ট দৈনিক ঈশানের প্রিন্ট ও অনলাইনে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে অভিযুক্ত বেলাল উদ্দিন ফোন করে আশ্রাব্য ভাষায় তথ্য দাতাদের গালাগাল করেন। সময় হলে তথ্য দাতাদের দেখে নিবেন জানিয়ে প্রতিবেদককে হুমকি প্রদান করেন।
সেই সাথে নামে-বেনামে ঠিকাদারি লাইসেন্স আছে কি না জানতে চাইলে বেলাল উদ্দিন বলেন, আমার ঠিকাদারি লাইসেন্স আছে আপনি প্রমাণ করতে পারবেন, পারবেন না। কেজিডিসিএলে এমন অনেকেরই আছে। কিন্তু প্রমাণ করতে পারবেন না। টাকার বিনিময়ে আপনাকে দিয়ে এসব লিখাচ্ছে। লিখেন, যা খুশি লিখে দেন। দেখি কে আমার (বা..) ছিড়ে। একপর্যায়ে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. সালাহ উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি মুঠোফোনের কল রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
(বি. দ্র.- কেজিডিসিএলে পিআরও বেলাল উদ্দিনের অনিয়ম ও দূর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদেনের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হলো। তৃতীয় পর্বে আসছে কেজিডিসিএল ঘিরে বেলাল উদ্দিনের চোরচক্র নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন। প্রিয় পাঠক চোখ রাখুন দৈনিক ঈশানে। সহযোগীতা করতে পারেন তথ্য পাঠিয়েও।)