
ঈদের কেনাকাটায় নিম্নবিত্তের ভরসার হাট ফুটপাত। সেই ফুটপাতেও এবার পোশাক, জুতো, প্রসাধনীসহ সকল পণ্যের দাম বাড়তি। ফলে অনেকটা বেকায়দায় নিম্নবিত্তরা। উধাও হয়ে গেছে তাদের মুখের হাসি।
শুক্রবার (২৮ মার্চ) দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন ফুটপাতে বসা ঈদের পোশাক, জুতো ও প্রসাধনীর হাট ঘুরে দেখা গেছে এই চিত্র। আলাপেও এমনসব নানা তথ্য উঠে এসেছে নিম্নবিত্ত শ্রেণির ক্রেতাদের মুখে।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাট মোড়ের ফুটপাতে ভ্যানগাড়িতে বসা পোশাক, জুতো ও প্রসাধনীর হাটে আসা রুখসানা জাহান জানান, আমরা গরিব মানুষ। দুই মেয়ের জন্য দুটি ফ্রক কিনতে এসেছি। মনে করেছিলাম, গত বছর বা আগের মতো ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে পাব ফ্রক দুটি। এসে দেখি ৬০০-৭০০ টাকার নিচে কোন ফ্রক নেই। কিন্তু এত টাকা আমার নেই। তাই না কিনে চলে যাচ্ছি।
রুখসানা জাহান বলেন, মার্কেটে আসার আগেই শুনতেছি এ বছর পোশাকের দাম বেশি। বড় লোকের মার্কেটেও নাকি পোশাকের অনেক দাম। আমাদের ভরসা ছিল ফুটপাত। সেখানেও বাড়তি দাম হওয়ায় আমার মতো অনেকে পোশাক, জুতো কিনতে পারছে না। দরদাম করে রেখে চলে যাচ্ছেন।
বহদ্দারহাটের মতো সরগরম চট্টগ্রাম মহানগরের পোশাক শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা ইপিজেড থানার ফ্রিপোর্ট মোড়। সেখানেই শুক্রবার দুপুরে পোশাক শ্রমিক রাসেল মাতুব্বর ভ্যানগাড়িতে কাপড় উল্টেপাল্টে দেখছিলেন খুশি মনে। নিজের আড়াই বছরের মেয়ের জন্য দুটি ফ্রক পছন্দ করলেন পাজামাসহ। কিন্তু দাম শুনেই মুখের হাসি উধাও!
বিক্রেতাকে প্রশ্ন ছুঁড়লেন এইটুকু জামার এত দাম?’ শেষমেশ পছন্দের সেই জামা নেননি তিনি। বাজেটের মধ্যে কিনতে পাশের আরেকটি ভ্যানগাড়িতে ঢুঁ মারবেন, এর আগেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বললেন, আড়াই বছরের মেয়ের ‘ছোট এক জোড়া ফ্রকের দাম চাইলো ৯০০ টাকা। সাড়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বললেও বিক্রেতা দেননি। একদাম তার ৬৮০ টাকা লাগবে। আমাদের সবকিছুরই একটা বাজেট থাকে। বাজেটের বাইরে সাধ থাকলেও সাধ্যে আর মেলে না।
কথা প্রসঙ্গে রাসেল জানিয়েছেন, তাঁর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। বাড়িতে ছোট বোন ছাড়াও আছেন বৃদ্ধা মা এবং বাবা। শহরে স্ত্রী এবং এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন নগরের পতেঙ্গার বিজয়নগর এলাকায়। প্রায় তিন বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চট্টগ্রাম এসে পোশাক কারখানায় হেল্পার পদে কাজ শুরু করেন। দুই বছর আগে সেলাইয়ের কাজ শিখে অপারেটর পদে পদোন্নতি হয়েছে তাঁর।
সাধ থাকলেও সাধ্য নেই বাক্যটি যেন রাসেলের মতো লাখো পোশাক শ্রমিকদের আশাভঙ্গ আর হতাশার বহিঃপ্রকাশ। কারণ, স্বল্প আয়, টেনেটুনে চলা সংসার এবং বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে হয় তাঁদের। পেটের দায়ে নাড়ি ছেড়ে শহরে পাড়ি জমানোর পর বৃদ্ধ মা-বাবার সাথে স্ত্রী-সন্তানাদির গুরুদায়িত্বও তাদের ওপর। এই গুরুদায়িত্ব পুরুষ পোশাক শ্রমিকদের চেয়েও নারী পোশাক শ্রমিকরা পালন করেন বেশি।
বাজেট কেমন ছিল প্রশ্নের জবাবে রাসেল বলেন, ‘বেতন বোনাসসহ এবার ঈদে আগের চেয়েও অন্যান্যবারের তুলনায় টাকা বেশি পেয়েছি। তবে এবার খরচও অনেক বেশি। গ্রামের বাড়িতে বাবা, মা এবং বোনের জন্য টাকা পাঠিয়েছি। স্ত্রীর জন্য কেনাকাটা করেছি। সন্তান এবং আমার কেনাকাটা বাকি। গ্রামে যেতে টিকিট কেটেছি দ্বিগুণ দাম দিয়ে। বাড়িতে অনেক খরচ, তাই বাজেট স্বল্প।’
ঈদুল ফিতরের অন্যতম অনুসঙ্গ নতুন পোশাক কিনতে বিত্তবানরা ‘বিগ বাজেট’ নিয়ে নামিদামি সব মার্কেটের ব্র্যান্ডের দোকানে ভিড় করলেও নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্তদের ঈদের কেনাকাটায় ভরসার জায়গা ফুটপাতের দোকান কিংবা ছোট মার্কেট। আর পোশাক শ্রমিকদেরও এর ব্যতিক্রম নয়।
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) অবস্থান ফ্রিপোর্ট মোড়েই। সেখান থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড)। সিইপিজেডে পাঁচ শতাধিক এবং কেইপিজেডে প্রায় আড়াইশোর বেশি কারখানা রয়েছে। এই দুই ইপিজেডের এসব কারখানায় কর্মরত আছেন লাখ লাখ শ্রমিক। যাদের বেশিরভাগই বন্দর, পতেঙ্গা এবং সিইপিজেড এলাকার বাসিন্দা। পোশাক কারখানায় কর্মরত কর্মকর্তারা বাদে শ্রমিকদের ঈদ কেনাকাটা হয় এসব এলাকার মার্কেট কিংবা ফুটপাতের ভাসমান দোকান থেকেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দর-পতেঙ্গা ও ইপিজেড এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ১০টিরও বেশি মার্কেট। এর মধ্যে অন্যতম হল—পতেঙ্গা নূর শপিং সেন্টার, আলী প্লাজা, শাহ প্লাজা, বন্দরটিলা সিটি করপোরেশন মার্কেট, আল মদিনা মার্কেট, আলী শাহ সুপার মার্কেট, বে-শপিং সেন্টার, চৌধুরী মার্কেট ও সিইপিজেড হকার্স মার্কেট।
তবে নূর শপিং, আলী প্লাজা, আলী শাহ এবং বে-শপিং সেন্টারে মধ্যবিত্তদের আনাগোনাই বেশি। অন্যদিকে, বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের দোকানগুলো বেশিরভাগ পোশাক শ্রমিকদের শেষ ভরসা। কারণ মানের সাথে আপস করে সাধ্য অনুযায়ী পোশাক কিংবা জুতা এসব দোকানেই মেলে।
নগরীর কাটগড়, স্টিলমিল, বন্দরটিলা এবং ফ্রিপোর্ট এলাকার ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোয় বাচ্চাদের শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্ট, বাচ্চা এবং বড়দের পাঞ্জাবি, থ্রি পিস, কসমেটিকস সামগ্রী, শাড়ি, জুতাসহ নামা ধরনের পণ্যের সমাহার। বিকেল থেকে শুরু হওয়া এসব দোকানে সন্ধ্যার পরেই ভিড় লেগে যায়। এসব দোকানে অধিকাংশ পোশাক শ্রমিকরা ভিড় করেন। তাছাড়া দিনমজুররাও ফুটপাত থেকে ঈদের পোশাক কেনাকাটা করেন।
চৌধুরী মার্কেট সংলগ্ন সড়কে ভ্যানগাড়িতে করে পাঞ্জাবি বিক্রি করতে দেখা যায় মো. আকবর হোসেনকে। তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা একটু কম। আমার এখানে সর্বোচ্চ পাঞ্জাবির দাম ৮০০ টাকা। দিনে ১০-১২টির বেশি বিক্রি হয় না। অনেক ফ্যাক্টরি বোনাস দেয়নি, আবার অনেকে শেষ দিকের অপেক্ষায়, তাই হয়তো বিক্রি কম।’
আকবরের দোকানের পাশেই ভ্যানগাড়িতে করে জুতা বিক্রি করেন জুয়েল নামে এক কিশোর। তিনি জানালেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বেচাবিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। সন্ধ্যা থেকে পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় তিনি অন্তত ৭০ জোড়া জুতা বিক্রি করেছেন। আর ক্রেতাদের অধিকাংশ পোশাক শ্রমিক।
বন্দরটিলা মোড়ে সিটি করপোরেশন মার্কেট ঘেঁষে অস্থায়ী বেশ কিছু দোকান। সেখানে কথা হয় শিউলি বেগমের সঙ্গে। সাত ও তিন বছরের দুই ছেলেকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন তিনি। শিউলি বলেন, ‘প্রায় চার বছর আগে আমার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর থেকে আমিই সংসারের হাল ধরেছি। ইচ্ছে তো হয় ওদের নিয়ে বড় এসিওয়ালা মার্কেটে যাই। কিন্তু কিছুই করার নেই। এখনো বোনাস দেয়নি আমাদের কারখানায়।’
ফ্রিপোর্ট মোড়ে সিইপিজেড প্রবেশ পথ লাগোয়া বে-শপিং সেন্টারের ঐশি টেক্সটাইলের প্রোপাইটর আমজাদ হোসেন জানান, তাদের দোকানে মধ্যবিত্ত পোশাক শ্রমিকরা আসেন। এছাড়া স্থানীয়দের আধিক্যই বেশি। তবে নিম্নবিত্ত তেমন আসেন না। কারণ তাদের একদরের দোকান।
এদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আর মাত্র বাকি তিনদিন। কিন্তু এখনো বেতন-বোনাস পরিশোধ করেনি সিইপিজেড ও কেইপিজেডের অনেক পোশাক কারখানা। যদিও ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি)-র বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, বোনাসসহ সকল পাওনা ২০ রমজানের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু ২৭ রমজানের পরও বেতন-বোনাস পায়নি পোশাক শ্রমিকেরা। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম অসন্তোষ।