শুক্রবার- ৪ এপ্রিল, ২০২৫

মানুষের ভিড়ে জমজমাট চট্টগ্রামের বিনোদনকেন্দ্র

মানুষের ভিড়ে জমজমাট চট্টগ্রামের বিনোদনকেন্দ্র
print news

দের টানা ছুটিতে মানুষের ভিড়ে জমজমাট চট্টগ্রামের বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো। যেখানে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ছুটে আসছেন অনেকে।

ঈদের দিন থেকে আজ মঙ্গলবার (০১ এপ্রিল) শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বয়স্কদেরও পরিবার-পরিজন নিয়ে দল বেঁধে বিনোদন কেন্দ্রে ছুটছে। ফলে ভিড় বাড়ছে মানুষের।

বিনোদন কেন্দ্রে বেড়াতে আসা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগত লোকজনের বেশির ভাগই চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার। যাদের ঘুরে বেড়ানোর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হচ্ছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত।

পাশে কর্ণফুলী টানেল থাকায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত নিয়ে মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে। ভ্রমণপ্রিয় মানুষ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি নদীর তলদেশে দেশের প্রথম যোগাযোগপথও ঘুরে যাচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। এদের কেউ সমুদ্রের পানিতে গা ভাসিয়েছেন। কেউবা সমুদ্রের পাড়ে বসে গান গেয়ে আনন্দ মেতেছেন।

আবু রাসেল নামে এক চাকরিজীবী পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে এসেছেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে। তিনি বলেন, সাগর পাড়ে এলে মন ভালো হয়ে যায়। বিশুদ্ধ বাতাস মনে প্রশান্তি আনে। চট্টগ্রামে এখন প্রচন্ড গরম অনুভুত হচ্ছে। এ অবস্থায় সৈকতের বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

পতেঙ্গা সৈকতের পূর্বপাশে আনোয়ারা পারকি সৈকতেও মানুষের প্রচন্ড ভিড় জমেছে। সেখানেও সকাল থেকে তরুণ-তরুণি, শিশু ও বয়স্করা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সৈকত এলাকায় দায়িত্বরত ট্যুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তার এ তথ্য জানিয়েছেন।

পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে আরেক বিনোদনকেন্দ্র ফয়স লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডে। এখানে বেড়াতে আসা মানুষদের কেউ সি ওয়ার্ল্ডে আনন্দে মেতেছেন। ঈদের দিনে এখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার পর্যটক ঘুরতে এসেছেন। ছিল বেসক্যা¤েপ থাকার সুযোগ। আর ফয়স লেকে বোটে করে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেকেই।

ফয়স লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপক (বিপণন) বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, কয়েক বছরের তুলনায় এবার প্রচুর দর্শনার্থী ঘুরতে এসেছেন। তাঁরা দিনভর সি ওয়ার্ল্ড ও পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আবার নতুন চালু হওয়া বেসক্যা¤েপ ঘুরতে এসেছিলেন বিদেশিরাও।

কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডের পাশেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। একসময় চিড়িয়াখানায় তেমন কোনো বৈচিত্র না থাকলেও এখন আর সে পরিস্থিতি নেই। নানা ধরনের প্রাণী নিয়ে আসা হয়েছে। আছে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি। চিড়িয়াখানার বড় আকর্ষণ এখন সাদা বাঘ। এছাড়া সিংহ, বানর, হনুমান ও বিভিন্ন প্রজাতির হরিণসহ পশুপাখি দেখতে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে এসেছেন বয়স্করাও। পাশাপাশি পাহাড়ের মাঝখানে থাকা খেলনাগুলোতে চড়ে আনন্দ উপভোগ করছে শিশুরা।

চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট থেকে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকরিজীবী মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তিনি বলেন, বাঘ দেখার জন্য শিশুদের অনেক আগ্রহ। টিভি-পত্রিকায়ও চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার বাঘ নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। তা দেখে বাচ্চাদের মতো তাঁদেরও আগ্রহ জন্মেছে। ঈদের ছুটিতে তাই পরিবারের সবাই এখানে বেড়াতে এসেছেন। তাঁদের ভালোই লাগছে।

চিড়িয়াখানার তত্ত্ববধায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, স্বাভাবিক সময়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মানুষের ভিড় লেগে থাকে চিড়িয়াখানায়। এখন ঈদের ছুটিতে সে ভিড় আরও বেড়েছে। বিশেষ করে এখানে শিশু-কিশোরদের নিয়ে এসেছেন বড়রা।

সীতাকুন্ডের গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতজুড়ে কেউ যেন বিছিয়ে রেখেছে সবুজ ঘাসের গালিচা। ম্যানগ্রোভ বনে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে হরিণের উঁকি, কখনো ছুটে চলে লাল কাঁকড়া। ঈদে বেড়াতে সেখানেও যাচ্ছে মানুষ।

এই সৈকতে আছে দর্শনার্থীদের জন্য ওয়াশ ব্লক, রয়েছে দোকানপাটও। বেড়িবাঁধের পাশে রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। সৈকতের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের সহস্রধারা ও সুপ্তধারা নামে দুটি ঝরনা। পর্যটকেরা সেখানেও ভিড় জমাচ্ছেন।

উপচে পড়া ভিড় জমেছে ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার চা বাগানগুলোতেও। সেখানেও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রামের শহর ও প্রত্যন্ত এলাকার ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। চা বাগান কর্তৃপক্ষ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পর্যটকের ঢল নেমেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মহামায়া ইকোপার্কেও। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে পর্যটক আসা শুরু হলেও মঙ্গলবার সকাল থেকে ছিল উপচে পড়া ভিড় জমেছে। ছুটি পেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে এখানে ছুটে আসেন অনেকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঠাকুরদীঘি থেকে মহামায়ায় যাওয়ার সড়কে গাড়ির জন্য হাঁটা দায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ছিল চোখে পড়ে মত। এছাড়া বাস, মাইক্রো, প্রাইভেটকার, লোকাল সিএনজি চালিত অটোরিকশা যোগে লেকের পাড়ে যেতে দেখা গেছে। পার্ক ঘিরে গড়ে উঠা হোটেলসহ বিভিন্ন দোকানে মানুষ ভিড় ছিল। পার্কের মূল গেইটের বাইরে গাড়ি পার্কিংয়ে প্রায় শতাধিক গাড়ি দেখা গেছে।

দূর থেকে দেখা যায় প্রায় পাহাড়সম বাঁধ। উভয় পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাঁধের ধারে অপেক্ষমাণ সারি সারি ডিঙি নৌকা আর ইঞ্জিনচালিত বোট। বোটে ঘরে ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভ্রমণ পিপাসা লোকজন। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে লেকের স্বচ্ছ পানিতে তাকাতেই দেখা যায় নীলাকাশ। পূর্ব-দিগন্তের সারি পাহাড়ের বুক চিরে যেতে যেতে লেকে মজা করে কায়াকিং করছে অনেকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরছেন অনেকে। কিছু দূরেই দেখা গেছে পাহাড়ের কান্না। অঝোরে কাঁদছে। অথচ তার কান্না দেখে নিজের কাঁদতে ইচ্ছে হয়নি। উপরন্তু কান্নার জলে গা ভাসাচ্ছে অনেকে।

ইছাখালী ইউনিয়নের সাহেবদী নগর এলাকা থেকে বেড়াতে আসা মাঈনুল আবছার বলেন, ঢাকায় ব্যবসা করি। পরিবার নিয়ে সেখানে থাকতে হয়। ঈদ করতে গ্রামের বাড়িতে এসেছি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহামায়ায় বেড়াতে এলাম, দেখে খুব ভালো লাগছে। বাচ্চারাও অনেক মজা করেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর থেকে আসা ৫ বন্ধুর একজন জাবেদ কাউসার বলেন, প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে বন্ধুরা সবাই মিলে বিভিন্ন পর্যটন ¯পটে বেড়াতে যাই। এবার মহামায়ায় আসলাম। রাস্তায় তেমন গাড়ি না থাকায় শহর থেকে মাত্র এক ঘণ্টায় এখানে চলে এসেছি। সবাই মিলে অনেক আনন্দ করছি। তবে ৩০ টাকার টিকেট এখন ৫০ টাকা নিচ্ছে। ২০ টাকা বেশি হয়ে যায়। ঈদ উপলক্ষে ১০ টাকা বেশি নিতে পারে।

মহামায়া ইকোপার্ক ইজারা পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এআর এন্টারপ্রাইজের কর্মকর্তা মো. জাহেদ হোসেন বলেন, স্বাভাবিক সময়ে এখানে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ পর্যটক পার্কে আসেন। ঈদের দিন প্রায় তিন হাজার টিকেট বিক্রি হয়েছে। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহ আরও বেশি টিকেট বিক্রি হবে।

ট্যুরিস্ট পুলিশের চট্টগ্রাম রিজিয়নের এসপি উত্তম প্রসাদ পাঠক বলেন, সৈকতসহ বিনোদনকেন্দ্র গুলোতে ঈদের দিন দুপুর থেকে মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমেছে। দর্শনার্থীরা যাতে কোনও সমস্যায় না পড়েন সেজন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।

ঈশান/খম/মসু

আরও পড়ুন

No more posts to show