
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অফিস চলাকালীন সময়ে কোনোরকম মিছিল, মহড়া ও আন্দোলনে অংশ নিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরের পর গণমাধ্যমে পাঠানো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এননিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন কর্মসূচি শুরুর আগ মুহূর্তে এ ঘোষণা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এনসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার দু‘দিনের ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সাবেক সিবিএ।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্ত অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রেখে সর্বাত্নক ধর্মঘট পালন করা হবে। একইভাবে পরদিন রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। রোববার বিকেল ৫টায় আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়।
শ্রমিক-কর্মচারি ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ধর্মঘটের প্রতি সর্বাত্নক সমর্থন ও পূর্ণ সহযোগিতা ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সকল শ্রমিক-কর্মচারীদের এ কর্মসূচিতে একাত্ন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে স্কপ। এ ছাড়া স্কপের পক্ষ থেকে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দর ভবন অভিমুখে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা দিয়ে আরব-আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকার চুক্তি করতে যাচ্ছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে বৃহ¯পতিবার (২৯ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে বিএনপিপন্থী দুই সংগঠনের শ্রমিক-কর্মচারীরা বিক্ষোভ করেন।
প্রথমে তারা বন্দর ভবনের সামনে থেকে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি বন্দর ভবন চত্বরে ঘুরে একপর্যায়ে প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষের সামনে তারা বিক্ষোভ করেন। শ্রমিক নেতারা এ সময় এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানান।
একই ইস্যুতে বৃহ¯পতিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। সংগঠনটির নেতারা বলেন, পর্যাপ্ত দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লাভজনক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি কো¤পানির হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। অন্যথায় সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা।
ইজারা চুক্তির বিরোধিতার বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত বলেন, স্কপ ছয়টি মৌলিক কারণে চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটি ইজারা চুক্তির বিরোধিতা করছে। প্রথমত, এটি একটি কৌশলগত ও ভূ–রাজনৈতিক বিষয়। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্র।
দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশী কো¤পানির হাতে এই টার্মিনাল তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তৃতীয়ত, ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও অতীত রেকর্ড প্রশ্নবিদ্ধ। চতুর্থত, প্রস্তাবিত ৪০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেশের সামগ্রিক কার্গো ম্যানেজমেন্ট ও বন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
পঞ্চমত, চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নন-কমপ্লায়েন্সের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে এবং রাষ্ট্রের হাতে কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তা নেই। ষষ্ঠত, একটি অনির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদের আলোচনা ছাড়া ৪০ বছরের জন্য জাতীয় স¤পদ হস্তান্তরের কোনো নৈতিক বা সাংবিধানিক বৈধতা নেই।
আর এই বিষয়টি উল্লেখ করে বন্দর কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৃহ¯পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় অফিস চলাকালে এনসিটি সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বন্দরের কিছু কর্মচারী ভবন চত্বরে মিছিল করেন। এ সময় তারা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেন এবং দলবদ্ধভাবে মহড়া দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন।
সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সভা-মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা-১৯৭৯ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৯১সহ সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী সু¯পষ্ট পেশাগত অসদাচরণ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ ধরনের কর্মকান্ডে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত না থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেলের জট চলছে। লাইটারেজ জাহাজের সংকটের মুখে দেড় শতাধিক মাদার ভ্যাসেল কয়েক লাখ টন পণ্য নিয়ে সাগরে অনেকটা অলস সময় কাটাচ্ছে। বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের অতীতের ধকল সামলে একটি স্বাভাবিক গতিশীলতা বিরাজ করছিল। নতুন করে দুইদিনের কর্মবিরতিতে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্নকভাবে ব্যাহত হবে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা স্বাভাবিক রাখার জন্য বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল থাকা জরুরি। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হওয়া মানেই দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়া। বিষয়টি দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর উল্লেখ করে তারা বন্দর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠলে তার ধাক্কা জাতিকেই সামলাতে হবে বলে মন্তব্য করেন।











































