সোমবার- ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এনসিটি ইজারা ইস্যু

শাটডাউনে দ্বিতীয় দিনও স্থবির চট্টগ্রাম বন্দর

শাটডাউনে দ্বিতীয় দিনও স্থবির চট্টগ্রাম বন্দর

# সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের পরও কর্মসূচি পালনে শ্রমিকরা
# কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া ৪ কর্মচারীকে পানগাঁও আইসিটিতে বদলি

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ডাকা ধর্মঘটে রবিবার দ্বিতীয় দিনেও চট্টগ্রাম বন্দরে সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে বন্দরে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনকারী যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

শ্রমিক-কর্মচারীরা বন্দরের বিভিন্ন সেবা ডেস্কে কর্মবিরতির নোটিশ ঝুলিয়ে দেন। বন্দর এলাকায় পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল-সমাবেশও করেছে শ্রমিকরা। শ্রমিক দলের নেতারা অভিযোগ করেছেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ স্বতঃস্ফূর্ত শাটডাউন কর্মর্সূচি বানচালে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ধর্মঘটের সমর্থনে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছিল। পুলিশের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা সেই কর্মসূচি স্থগিত করেছে। কর্মসূচি পালনের কারণে বন্দরের ৪ কর্মচারীকে ঢাকার কেরানিগঞ্জের পানগাঁও আইসিটিতে বদলি করা হয়েছে।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে এ তথ্য জানান চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ স¤পাদক ইব্রাহিম খোকন। তিনি বলেন, শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও রবিবার সকাল থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মবিরতি পালন করেছেন। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মসূচি ঠেকাতে হয়রানি শুরু করে। পুলিশও মিছিল ও সভা-সমাবেশ নিষেধাজ্ঞার নামে দমন-পীড়নের আশ্রয় নিয়েছে। দিনভর অচলাবস্থার পর শনিবার দিনগত মধ্যরাতে তৃতীয় বারের মতো মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, পথসভা নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ-সিএমপি। হয়রানি বন্ধ না করলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাব।

সূত্র জানায়, শনিবার (৩১ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজের সই করা এ গণবিজ্ঞপ্তি জারী করা হয়। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং এটি ১ক শ্রেণির কেপিআইভুক্ত। দেশের মোট আমদানি ও রফতানির সিংহভাগ কার্যক্রম এই বন্দর দিয়ে স¤পন্ন হয়।

আরও পড়ুন :  নির্বাচন সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ করতে চট্টগ্রামে থাকবে তিন বাহিনীও

দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, শিল্প কারখানার কাঁচামালসহ আমদানি ও রফতানিযোগ্য পণ্য পরিবহনে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ভেহিকেল ও প্রাইম মুভার বন্দরে চলাচল করে। এই বিপুল সংখ্যাক যানবাহনের কারণে বন্দরের আশপাশে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু বন্দর এলাকায় যেকোনো ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, পথসভার কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। ফলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

তাই চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন ও স্বাভাবিক রাখাসহ জনশৃঙ্খলা, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন বারেক বিল্ডিং মোড়, নিমতলা মোড়, ৩ নম্বর জেটি গেইট, কাস্টমস মোড়, সল্টগোলা ক্রসিংসহ আশপাশের এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র, তলোয়ার, বর্শা, বন্দুক, ছোরা, লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য, ইট-পাথর বহন ও ব্যবহার এবং যে কোনো ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও পথসভা ১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট হতে ২ মার্চ পর্যন্ত ১ মাসের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা, মিছিল ও সমাবেশ এই নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন :  চাকরির নামে টাকা হাতিয়ে পলাতক রেল কর্মচারী তুলছেন বেতনও!

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮ এর ৩০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সিএমপি কমিশনার এ পর্যন্ত তিন দফা এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন বলে জানান চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ স¤পাদক ইব্রাহিম খোকন।

এছাড়া কর্মসূচি পালনে নেতৃত্ব দেওয়ায় বন্দরের ৪ কর্মচারীকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও আইসিটিতে বদলি করা হয়েছে। বদলি করা কর্মচারীরা হলেন, বন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খোকন, অর্থ ও হিসাব বিভাগের উচ্চ হিসাব সহকারী আনোয়ারুল আজীম এবং প্রকৌশল বিভাগের খালাসি ফরিদুর রহমান।

এর মধ্যে ইব্রাহীম খোকন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ স¤পাদক, হুমায়ুন কবীর একই সংগঠনের প্রচার স¤পাদক, আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য। তারা এনসিটি বিদেশিদের ইজারার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দলের সাধারণ স¤পাদক শেখ নুরুল্লাহ আহার কর্মচারীদের বদলির নিন্দা জানিয়ে বলেন, শনিবার বন্দরের চিফ পারসোনাল অফিসার স্বাক্ষরিত আদেশে তাদের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে বদলি করা হয়। রোববার তাদের কাজে যোগদান করতে আদেশ করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে বদলির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাই। বন্দরের কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্যই কর্তৃপক্ষের উচিত এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা।

তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিভাগে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের তালিকা করছে বলে সংবাদ আছে। এটা কারো জন্য শুভকর হবে না। এ ধরনের প্রক্রিয়া চলতে থাকলে রোববার কর্মবিরতি শেষে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

সূত্র জানায়, আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল। একই দাবিতে শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হয়। শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে শনিবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়। রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হয়। এতে প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও স্থবির হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম।

আরও পড়ুন :  নির্বাচন সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ করতে চট্টগ্রামে থাকবে তিন বাহিনীও

সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও শ্রমিকদল নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের কর্মবিরতি রবিবার দ্বিতীয় দিনের মতো চলছে। সকাল থেকে বিভিন্ন জেটি ভিজিট করেছি। কোথাও কোনও কাজ করছে না শ্রমিকরা। ফলে বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে জাহাজ থেকে খোলা পণ্য ও কনটেইনার ওঠানো-নামানো সকাল থেকে কার্যত বন্ধই রয়েছে। এ ছাড়া বন্দরে পণ্য ডেলিভারির জন্য বিভিন্ন ধরনের কাভার্ডভ্যান, লরি, ট্রেলার প্রবেশ বন্ধ আছে; বন্দর পরিচালনা কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) টার্মিনালের বার্থ অপারেটররা জানান, শ্রমিক ও কর্মচারীরা কর্মবিরতিতে যাওয়ায় জিসিবি জেটিতে থাকা একটি কনটেইনারবাহী জাহাজসহ চারটি জাহাজের পণ্য খালাস কার্যক্রম স¤পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এনসিটি ইজারা ইস্যুতে শ্রমিক দলের ডাকা শাটডাউন কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কর্মবিরতিতে রাজস্ব ক্ষতি নিরূপণ করতে ছয় সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। শনিবার কর্মবিরতির পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চার জনকে বদলি করা হলেও তা ছিল নিয়মিত রুটিন ওয়ার্ক। আন্দোলন কর্মসূচির সাথে বদলির কোন সম্পর্ক নেই।

ঈশান/খম/বেবি

আরও পড়ুন

জনপ্রিয়

You cannot copy content of this page