শনিবার- ২১ মার্চ, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরে থমকে আছে বাঙ্কারিং কার্যক্রম

চট্টগ্রাম বন্দরে থমকে আছে বাঙ্কারিং কার্যক্রম
print news

# ফুয়েল সংকটে ফিরতে পারছে না ৭০ বিদেশি জাহাজ
# মুখোমুখি বিপিসি-ডিলার
# প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভোগ্যপণ্য ও বিদ্যুৎ খাতেও

ট্টগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকট কিছুটা কেটে উঠেছে। পক্ষান্তরে মেরিন ফুয়েল বা সামুদ্রিক জ্বালানি তেলের সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরে থমকে আছে বাঙ্কারিং কার্যক্রম। ফলে বন্দরের বহির্নোঙরে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসা ৭০টিরও বেশি বিদেশি মাদার ভেসেল গন্তব্যে ফিরতে পারছে না।

আটকে আছে কার্গোবাহী বহু লাইটারেজ জাহাজও। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিয়ন্ত্রিত পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্টান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। তার ওপর ডিলারদের একাংশ জ্বালানি তেল মজুদ করার শঙ্কা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের আহ্বায়ক শফিক আহমেদ এনার্জি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একের পর এক বিদেশি জাহাজ বসে আছে, জ্বালানি নেই। একই সাথে কার্গোবাহী অনেক লাইটার জাহাজও কর্ণফুলী নদীতে আটকা পড়ে আছে। জ্বালানির অভাবে তারা বহির্নোঙরে যেতে বা গন্তব্যে রওনা দিতে পারছে না।

সংস্থার তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের আউটার নোঙরে বর্তমানে ৭০টির বেশি মাদার ভেসেল আমদানি পণ্য খালাস করে সাগরে ভাসছে। আবার ১০০টি লাইটার জাহাজ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করে। যা পরিচালনা করতে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়।

লাইটার জাহাজ সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন নদি বন্দর ও ঘাটে পৌঁছে দেয় প্রায় ১১০০ লাইটার জাহাজ। প্রতিদিন ৯০-১০০টি জাহাজ পণ্য খালাসের শিডিউল পায়। এসব জাহাজের জন্য প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪০-৫০ হাজার লিটার।

তাদের হিসেব মতে, একটি লাইটার জাহাজের চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতে যেখানে চার হাজার লিটার তেল প্রয়োজন, সেখানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪০০-৫০০ লিটার। ফলে জাহাজগুলো যাত্রা শুরু করতে পারছে না, নোঙরেই পড়ে থাকছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে এই অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।

তম্মধ্যে স্থলভাগে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও সংকট তীব্রতর হয় মেরিন ফুয়েল বা সামুদ্রিক জ্বালানি তেল সরবরাহে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে থমকে গেছে বাঙ্কারিং কার্যক্রম। এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে চট্টগ্রাম বন্দরকে নো বাঙ্কারিং পোর্ট হিসেবে বিবেচনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বন্দরের মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি শুল্ক ও পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসির তথ্যমতে, কয়েকজন ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত মেরিন ফুয়েল থাকলেও তারা তা বাজারে ছাড়ছে না, বরং মজুদ করছে। অন্যদিকে কিছু তেল বিদেশি জাহাজে সরবরাহ করা হলেও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বিদেশি জাহাজে সরবরাহের জন্য গত কয়েক দিন ধরে ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পয়েন্ট ফাইভ সালফার মেরিন ফুয়েল পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ডিলারদের দাবি, পে-অর্ডার করার পরও বিপিসি থেকে তারা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। এক লাখ লিটারের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১০-১৫ হাজার লিটার। ফলে বিদেশি জাহাজগুলোতেও চাহিদামতো জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।

অনেক ডিলার তেল মজুত করছেন-এমন অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রামভিত্তিক মেরিন ফুয়েল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এআর কর্পোরেশনের স্বত্ত্বাধিকারী আবদুর রাজ্জাক বলেন, অভিযোগ সত্য নয়। যেখানে তেলই পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে মজুত করার প্রশ্নই আসে না। আসল কথা হচ্ছে, সারা বিশ্বেই তেলের সংকট চলছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন পরিচালনের তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী মাদার ভেসেলগুলো ০.৫ সালফারযুক্ত বিশেষায়িত মেরিন ফুয়েল ব্যবহার করে। ইরান যুদ্ধের কারণে চলতি মাসের শুরুতে সিঙ্গাপুরে এই তেলের দাম বাড়তে শুরু করে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।

সূত্র আরও জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের অনুমোদন রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্টান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল থেকে তেল সংগ্রহ করে মেরিন অয়েল ডিলাররা ট্যাংকারের মাধ্যমে বিদেশি জাহাজে সরবরাহ করেন।

মেরিন ফুয়েলের প্রধান ডিলারদের মধ্যে রয়েছে বিসমিল্লাহ অয়েল সাপ্লাইয়ার্স, এআর কর্পোরেশন, যমুনা শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং, এএম এন্টারপ্রাইজ, শাহ আমানত মেরিন সার্ভিস, সী গ্রীন এন্টারপ্রাইজ, জ্যোতি অয়েল কোং, আল নুর কর্পোরেশন, এএম এন্টারপ্রাইজ, কাজী এন্টারপ্রাইজ, এনার্জি নেভিগেশন, কর্ণফুলী বাঙ্কার সাপ্লায়ার্স, শাহ আমানত অটোমোবাইলস, জহুরা কর্পোরেশন, আবরার মেরিন সার্ভিস, ভিশন কর্পোরেশন, রয়েল ট্রেডার্স এবং এ পেইস মেরিন এন্ড ফুয়েল সার্ভিস।

ডিলাররা সাধারণত মাদার ভেসেল থেকে পয়েন্ট ফাইভ সালফার মেরিন ফুয়েল সংগ্রহ করে থাকেন। তবে আর্ন্তজাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন তারা স্থানীয় বাজারের ওপরই বেশি নির্ভর করছেন। জ্বালানির এই সংকটের প্রভাব ইতিামধ্যে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়ও পড়তে শুরু করেছে।

বিদ্যুৎ খাতেও এর প্রতিক্রিয়া ¯পষ্ট। এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লাবাহী বিদেশি জাহাজ বন্দরে এসে বসে আছে, কিন্তু তেলের অভাবে জাহাজ পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় সেই কয়লা খালাস করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান বিপিসিকে দেওয়া চিঠিতে সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি ঘাটতি অব্যাহত থাকলে রপ্তানি, আমদানি ও বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে গুরুতর ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

তবে সবকিছুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন বিপিসির জনসংযোগ দপ্তরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মনি লাল দাশ। তিনি বলেন, ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ীই তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং এখনও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। পাশাপাশি দেশেই মেরিন অয়েল উৎপাদনের প্রযুক্তি তাদের হাতে রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সিঙ্গাপুরে দাম বাড়ায় দেশীয় ডিলাররাও ইদানিংকালে অতিরিক্ত চাহিদাপত্র দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ বিপিসির।

ঈশান/খম/মম

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page