শুক্রবার- ১৪ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

প্রচ্ছদ /

ট্রানজিট : আয়ের নতুন পথ

print news

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত সোমবার একটি স্থায়ী আদেশ জারি করেছে। এই স্থায়ী আদেশ জারির মাধ্যমে নিয়মিত ট্রানজিট কার্যক্রম শুরুর পথ খুলেছে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, এনবিআরের আদেশে ট্রানজিট অপারেটর নিয়োগ, বন্দরে জাহাজ ভেড়া, ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্টের ঘোষণা, শুল্কায়ন, পণ্যের কায়িক পরীক্ষা, ট্রানজিটকাল ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। পরীক্ষামূলক চালানে মাশুলের (ফি) যেসব খাত ছিল, নতুন আদেশে তা বহাল রাখা হয়েছে।

তবে নতুন আদেশে সড়কপথে ট্রানজিটের চালান আনা-নেওয়ার সময় ‘এসকর্ট ফি’ (পাহারার মাশুল) বাড়ানো হয়েছে। আদেশটিতে ট্রানজিট অপারেটর হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত করা এবং সড়কপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি যানবাহন ব্যবহারের কথা রয়েছে।

ভারতের মূল ভূখ- থেকে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে (আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ও মেঘালয়) পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ বেশি লাগে। এ জন্য দেশটি চট্টগ্রাম বন্দর ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের সড়ক দিয়ে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পণ্য পরিবহন করতে চায়। ভারতের ভূমি ব্যবহার করে বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য করার সুযোগও পেয়েছে।

এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, ভারতের পণ্য চালান চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে আটটি রুটে (পথ) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে স্থলবন্দর হয়ে ভারতে নেওয়া যাবে। আবার একইভাবে ওই আটটি রুটে ভারত থেকে বাংলাদেশের স্থলবন্দর হয়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য চালান আবার ভারতে নেওয়া যাবে।

এনবিআরের স্থায়ী আদেশে ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে মাশুল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী, প্রতি চালানের প্রক্রিয়াকরণ মাশুল বা প্রসেসিং ফি ৩০ টাকা, প্রতি টনের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট ফি ২০ টাকা, নিরাপত্তা ফি ১০০ টাকা, কনটেইনার স্ক্যানিং (যন্ত্রের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা) ফি ২৫৪ টাকা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ফি ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আদেশে প্রতি কনটেইনার বা গাড়ির জন্য কিলোমিটারপ্রতি এসকর্ট (পাহারা) ফি ৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে প্রতি চালানে এসকর্ট ফি ছিল ৫০ টাকা। ইলেকট্রিক লক ও সিল ফি নামের আরেকটি খাত রয়েছে, যেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, কনটেইনারে ইলেকট্রিক লক ও সিল ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার আগে এসকর্ট ফি আদায় করা হবে। ইলেকট্রিক সিল বাস্তবায়ন হলে তখন এসকর্ট ফি দিতে হবে না।

এর বাইরে সড়কপথে পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মাশুল দিতে হবে। ২০২১ সালের ১৬ জুন আটটি রুটে ওই মাশুল নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়। প্রতি টন পণ্যে প্রতি কিলোমিটারে মাশুল ১ টাকা ৮৫ পয়সা। আটটি রুটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব মোংলা বন্দর-গোপালগঞ্জ-মাওয়া-ঢাকা-নরসিংদী-আশুগঞ্জ-সিলেট-তামাবিল রুটের। এই রুটে ৪৩৫ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য টোলসহ মাঝারি পণ্য পরিবহনক্ষমতার ট্রাকের আদায়যোগ্য মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ১৯৫ টাকা। সবচেয়ে কম দূরত্ব চট্টগ্রাম বন্দর-ফেনী-কুমিল্লা-বিবিরবাজার রুটের, ১৪৩ কিলোমিটার। এই রুটে সড়কপথের মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৯৮৮ টাকা।

কনটেইনার ওঠানো-নামানো বাবদ মাশুল রয়েছে দুই বন্দরের। আবার ভারতীয় পণ্য আনা-নেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত শিপিং এজেন্ট, ট্রানজিট অপারেটর এবং কনটেইনার পরিবহন বাবদ দেশীয় পরিবহন খাতেরও আয় হবে।

এনবিআরের নতুন আদেশের ফলে ট্রানজিট চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি হলো। ট্রানজিট পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আয়ের পাশাপাশি লাভের বড় জায়গা হলো পরিবহন খাত। ভারত থেকে যাতে বাংলাদেশি জাহাজে পণ্য আনা যায়, সেই ব্যবসা ধরতে নজর দিতে হবে। বন্দরের সুযোগ-সুবিধা আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ভালো সেবা দিতে পারলে সেবামাশুলও বাড়ানো যাবে। মোটকথা, এতে উভয় পক্ষ লাভবান হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন ভারতের ভূমি ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশ ও তৃতীয় দেশের পণ্য আনা-নেওয়ার যে সুযোগ রয়েছে, তা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটা ভাবা উচিত।

আরও পড়ুন

কোকা-কোলার বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে!

সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কোকা-কোলার সেই বিজ্ঞাপন!

print news

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকেই মুসলিম বিশ্বে কোনঠাসা হয়ে পড়ে কোমল পানীয় ব্র্যান্ড কোকা-কোলা। বাংলাদেশ একই অবস্থা। বড় একটি অংশ বয়কট করেছে পানীয়টি।

সম্প্রতি এ পানীয়ের একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। বিজ্ঞাপনে বলা হয় কোকা-কোলার সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বিষয়টি ভালোভাবে নেননি নেটিজেনরা। তারা রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিবাদ।

অবস্থা বেগতিক দেখে বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কোকা-কোলার ইউটিউব চ্যানেল থেকে। মঙ্গলবার (১১ জুন) দুপুর থেকে কোকা-কোলার ইউটিউব চ্যানেলে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বিজ্ঞাপনটি। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও কোকা-কোলা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিয়েছে কোকা-কোলা কর্তৃপক্ষ। এদিকে কোকা-কোলা বিবৃতি না দিলেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বিজ্ঞাপনটির নির্মাতা শরাফ আহমেদ জীবন এবং অভিনয়শিল্পী শিমুল শর্মা।

জীবন লিখেছেন, ‘এখানে আমি কোথাও ইসরায়েলের পক্ষ নেইনি এবং আমি কখনওই ইসরায়েলের পক্ষে নই। আমার হৃদয় সবসময় ন্যায়ের পক্ষে এবং মানবতার পাশে আছে, থাকবে।’

অন্যদিকে শিমুল ক্ষমা চেয়েছেন। তার কথায়, ‘আমি ভবিষ্যতে কোনো কাজে অভিনয় করতে গেলে অবশ্যই আমাদের দেশের মূল্যবোধ, মানবাধিকার, মানুষের মনোভাবকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে বিবেচনা করে তারপর কাজ করব। আমি মাত্র আমার জীবনের পথচলা শুরু করেছি, আমার এই পথচলায় ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আমাকে ভবিষ্যতে একজন বিবেকবান শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য শুভ কামনায় রাখবেন।’

ঈশান/খম/সুপ

ল্যান্ডলর্ড পোর্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের আত্নপ্রকাশ

ল্যান্ডলর্ড পোর্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের আত্নপ্রকাশ

print news

তেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) বিদেশি কোন প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ল্যান্ডলর্ড পোট হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। সৌদি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) এই অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করে।

সোমবার (১০ জুন) দুপুর তিনটায় পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল মায়ের্কস দাবাও নামের একটি কন্টেনার ভ্যাসেলের অপারেশন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল।

অনুষ্ঠানে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা সার্বক্ষণিকভাবে বন্দরের সকল কার্যক্রম নজরদারি করি। আরএসজিটি প্রথমবারের মতো অপারেশাল কার্যক্রম পরিচালনা করলো। এজন্য মার্কসলাইনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করবে দায়িত্ব পাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠান। সব সরঞ্জাম সংগ্রহ করে পিসিটি পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে আরও এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে আমি আশা করছি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে চার্জ পাবে। আরএসজিটির প্রথম অপারেশনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ল্যান্ডলর্ড পোর্ট হিসেবে আত্নপ্রকাশ করবে।

আরএসজিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরউইন হেইজ বলেন, বন্দরে আজকে মায়ের্কস দাবাও নামের একটি জাহাজ লোড করার মাধ্যমে আমরা আত্নপ্রকাশ করেছি। আমরা পুরো কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পেয়েছি। আশা করবো, আগামীতে সকল অপারেশনে আমরা সকলের সহযোগিতা পাবো।

বন্দরের তথ্যমতে, সোমবার (১০ জুন) পিসিটি দিয়ে মায়েরস্ক দাভাও নামে একটি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং করল। ক্রেনযুক্ত ফিডার জাহাজটি মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্যালাং থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছে। এরপর পিসিটিতে প্রায় ৮০০ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক) কনটেইনার ওঠানামা করে পরবর্তী গন্তব্য ইন্দোনেশিয়ার বেলাওয়ান বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে।

বন্দর সূত্র জানায়, নতুন নির্মিত এ টার্মিনাল বছরে ৬ লাখ টিইইউএস (২০ ফুট সমমানের) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারবে। ১০ মিটার গভীরের জাহাজ ভিড়তে পারবে। তবে মায়ের্কস দাবাও নামের জাহাজটির ড্রাফট ৯ মিটার। প্রায় ছয় মাস আগে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের (আরএসজিটি) সঙ্গে মাস ছয়েক আগে চুক্তি হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রয়োজনীয় ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করে রেড সি গেটওয়ে বাংলাদেশ লিমিটেড শনিবার থেকে কাজ শুরু করেছে। প্রথমবারের মতো অপারেশনে আসা জাহাজটিতে খালি কন্টেইনার লোড করা হবে।

সূত্র আরও জানায়, আরএসজিটিআই বাংলাদেশে কনটেইনার টার্মিনাল খাতে প্রথম বিদেশি বিনিয়োগ। প্রতিষ্ঠানটি পিসিটিতে ১৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক। বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি পিসিটিতে চারটি উন্নত উচ্চ ক্ষমতা স¤পন্ন শিপ-টু-শোর (এসটিএস) ক্রেন, রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরটিজি) এবং অন্যান্য আধুনিক কার্গো-হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম যুক্ত করছে। এর ফলে টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ২ লাখ ৫০ হাজার টিইইউস থেকে ৬ লাখ টিইইউস পর্যন্ত বৃদ্ধি করবে। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরে আগত অধিক ধারণক্ষমতা স¤পন্ন জাহাজগুলো হ্যান্ডলিং করার করার ক্ষমতা থাকবে।

আরএসজিটি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সৌদি আরবের শীর্ষ স্থানীয় বন্দর উন্নয়নকারী এবং অপারেটর। যার ফ্ল্যাগশিপ টার্মিনাল জেদ্দা ইসলামিক পোর্টে অবস্থিত, যেটি সৌদি আরবের লোহিত সাগরের বৃহত্তম কনটেইনার টার্মিনাল। এটি বার্ষিক ৬ দশমিক ২ মিলিয়ন টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং অধিক ধারণক্ষমতা স¤পন্ন জাহাজগুলো পরিচালনা করে থাকে।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, সময়ের ব্যবধানে বন্দরে পণ্য কিংবা কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ বাড়ছে। বাড়তি এই চাপ সামলাতে পিসিটি নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের মূল জেটি থেকে ভাটির দিকে চট্টগ্রাম ড্রাই ডক ও চট্টগ্রাম বোট ক্লাবের মধ্যবর্তী প্রায় ২৬ একর জায়গায় নির্মাণ করা হয় এ প্রকল্প। ২০১৭ সালের ১৩ জুন এক হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৯ সালের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। তবে কয়েক দফা পিছিয়ে যায়। গত ১৪ নভেম্বর অনলাইনে সংযুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন। এরপর ডিসেম্বরের এটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় আরসিজিটিকে।

এই টার্মিনালে রয়েছে ব্যাকআপ ফ্যাসিলিটিজসহ ৫৮৩ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জেটি, ২২০ দীর্ঘ ডলফিন জেটি, ৮৯ হাজার বর্গমিটার আরসিসি ইয়ার্ড, দুই হাজার ১২৮ বর্গমিটার কনটেইনার শুল্ক স্টেশন, দুই হাজার ১৫০ মিটার লম্বা ছয় মিটার উচ্চ কাস্টম বন্ডেড হাউজ, দুই হাজার ৫০০ মিটার রেলওয়ে ট্রাক, ৪২০ মিটার ফ্লাইওভার, এক হাজার ২০০ বর্গমিটার মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ ও পাঁচ হাজার ৫৮০ বর্গমিটারের অফিস বিল্ডিং।

যেখানে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ৯ মিটার গভীরতা ও ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়তে পারে। সেখানে এই টার্মিনাল অপারেশনে গেলে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ১০ দশমিক পাঁচ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানো যাবে।

ঈশান/মখ/সুপ

আলোচিত ঋণখেলাপি জসিম বেনজীরের ব্যবসায়ীক পার্টনার!

আলোচিত ঋণখেলাপি জসিম উদ্দিন বেনজীরের ব্যবসায়ীক পার্টনার!

print news

‘‘ওনি বেনজীরের লোক, বেনজীর স্যারের সঙ্গে ওনার ব্যবসা। আপনি ওনার সঙ্গে পারবেন না। বড় অংকের টাকা ধরে বসে যান।’— বারবার আমাকে এমন প্রস্তাব দিয়েছেন খোদ চন্দনাইশ থানার ওসি।’’

ণখেলাপি ব্যবসায়ী’ জসিম উদ্দীন সাম্প্রতিক আলোচিত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদের ব্যবসায়ীক পার্টনার ও ঘনিষ্ট সহযোগী! এ সুবাধে আদালতের সাজা পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ‘পুলিশ প্রটোকলে’ চালিয়েছেন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। ঋণখেলাপিতে দণ্ডিত হওয়ার পরও প্রার্থিতা বাতিল করেননি রিটার্নিং অফিসার। পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনকে ‘বশীভূত’ করে ভোটের মাঠে ‘খাটিয়েছেন’ প্রভাব।

এছাড়া আচরণবিধি লঙ্ঘন, কর্মী-সমর্থকের ওপর হামলা, এজেন্টদের কাছ থেকে জোর করে সই নেওয়াসহ এমন নানা অভিযোগের ফিরিস্তি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দ্বারস্থ হয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও চন্দনাইশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমেদ জুনু।

তিনি এসব কারণে চন্দনাইশে উপজেলা নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল বাতিল করে গেজেট প্রকাশ স্থগিত করার দাবি জানিয়েছেন। গত ১ জুন (শনিবার) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর এ অভিযোগলিপি পাঠান আবু আহমেদ জুনু। সোমবার (৩ জুন) বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।

অভিযোগে তিনি বলেছেন, ‘মোটর সাইকেল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ব্যবসায়ী জসিম উদ্দীন একজন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। পুলিশের প্রাক্তন আইজি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অংশীদার। গত ৪ এপ্রিল তাকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঘোষণা দিয়ে জসিম উদ্দীনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেন অর্থঋণ আদালত। ৩০ এপ্রিল ৫ মাসের আটকাদেশও দেন। তাঁকে বাঁচাতে নিয়মবহির্ভূত আবেদন করায় পদ্মা ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টরকেও শোকজ করেন আদালত।

পরে ৩০ এপ্রিল অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল করে হলফনামা সংযুক্ত করেন জসিম। যেখানে খেলাপি ঋণের বিষয়টি গোপন করা হয়। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে খেলাপি ঋণ উদ্ধারের জন্য অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে পদ্মা ব্যাংক। ওই মামলায় তাঁর সাজাও হয়েছে। হলফানামার তথ্য গোপনের বিষয়টি উল্লেখ করে আপীল কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগও দেয় পদ্মা ব্যাংক। আপিল না মঞ্জুরের পর ভোটের দুদিন আগে ২৭ মে আবারো পুনরায় আবেদন করা হয়। এছাড়া ১৯ মে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর অভিযোগও দায়ের করে।’

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘ভোটের আগে প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদ রাস্তা বন্ধ করে সভা সমাবেশ করায়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে হত্যার হুমকি, প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারকার্য চালানো, নগদ অর্থ বিতরণ, ডিজিটাল ব্যানার ও ডাবল মাইক ব্যবহারসহ ৭টি অনিয়মের বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার বরাবর অভিযোগ জানানো হয়। এরপরও রিটার্নিং অফিসার কোনো ব্যবস্থা নেননি। সাজামূলে তাঁর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও পুলিশ প্রশাসন তাকে গ্রেপ্তার না করে পুলিশ প্রটেকশনে নির্বাচনী কার্য করার সুযোগ করে দিয়েছেন।

অথচ এখনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আদালত থেকে রিকল করা হয়নি। এছাড়া ভোটের দিন জসিম উদ্দীন আহমদ পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনকে বশীভূত করে ৯টি ভোটকেন্দ্রে এজেন্টদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রুমের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মীদের ব্যালট পেপারে সিল মারার দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করলে পুলিশ তাঁর মোবাইল কেড়ে নিয়ে ছবিগুলো ডিলিট করে ছেড়ে দেয়। পরে জসিম উদ্দীনের কর্মীরা তাঁর কর্মী সমর্থকদের মারধর করেন।’

এসব অভিযোগে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের পাঠানো বেসরকারি ফলাফল বাতিল করে গেজেট প্রকাশ কার্যক্রম স্থগিতের আর্জি জানান আবু আহমেদ জুনু।

এদিকে পদ্মা ব্যাংক হেড অফিসের একটি চিঠিতে জানা গেছে, ভোটের দুদিন আগে অর্থাৎ ২৭ মে যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবরে ‘ঋণখেলাপি’ জসিম উদ্দীনের প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন জানিয়েছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। পদ্মা ব্যাংকের এসইভিপি ফিরোজ আলম স্বাক্ষরিত ওই পত্রে জানানো হয়েছে, জসিম উদ্দীন চৌধুরী উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সিআইবি রিপোর্টে ঋণখেলাপি না দেখানোর যে ৩ মাসের স্থগিতাদেশ আনেন তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আপিলে ৮ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো সিআইবি বরাবর পত্র পাঠিয়ে অবহিত করা হয়। ওই পত্রে ঋণখেলাপি হওয়ায় জসিম উদ্দীনের প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন জানিয়েছিল পদ্মা ব্যাংক।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর অভিযোগ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আবু আহমেদ চৌধুরী জুনু। তিনি বলেন, ‘‘ওনি বেনজীরের লোক, বেনজীর স্যারের সঙ্গে ওনার ব্যবসা। আপনি ওনার সঙ্গে পারবেন না। বড় অংকের টাকা ধরে বসে যান।’— বারবার আমাকে এমন প্রস্তাব দিয়েছেন খোদ চন্দনাইশ থানার ওসি। আমি ছাত্রজীবন থেকে সংগঠন করে আসা লোক। তাই ওনার এ প্রস্তাবে আমি সায় দিইনি।’’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোটের দিন পর্যন্ত আমাকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা সবাই মিলে এমন বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন মনে হয়েছে আমি কেউই না! রাতের আঁধারে আমার সমর্থকদের ঘরে ঘরে গিয়ে ডিবির লোক পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বড় বড় কেন্দ্রগুলো দখলের পরও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চন্দনাইশ থানার ওসি ওবায়েদুল হক বলেন, ‘ওনি বললেই কি হলো? এ ধরনের কোনো কথা আমি ওনাকে বলিনি।’

এদিকে এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে কথা বলতে বেসরকারিভাবে বিজয়ী চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয় সোমবার বিকেলে। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।

গত ২৯ মে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন জসিম উদ্দিন আহমেদ।

ঈশান/খম/সুম

চট্টগ্রামে ইসলামী ব্যাংকের লকার থেকে সোনা গায়েব নিয়ে ধোঁয়াশা

ইসলামী ব্যাংকের লকার থেকে স্বর্ণালঙ্কার গায়েব নিয়ে ধোঁয়াশা

print news

# দু‘পক্ষের তীর একে অপরের দিকে
# চলছে গুঞ্জন, উঠছে নানা প্রশ্ন

ট্টগ্রামে ইসলামী ব্যাংক চকবাজার শাখার লকার থেকে এক গ্রাহকের প্রায় ১৫০ ভরি স্বর্ণালংকার গায়েবের ঘটনায় ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রাহক ও লকার ইনচার্জ একে অপরের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়ছে।

ঘটনা জানাজানির পাঁচ দিন পরও গ্রাহক বা ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভ্যন্তরীণ তদন্তের কথা বলে গ্রাহকের কাছ থেকে সাত দিন সময়ও নেওয়া হয়। এভাবে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে আশ্বস্ত করে ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

এ অবস্থায় স্বর্ণালংকার গায়েবের সু¯পষ্ট কোনো তথ্য এখনো না মিলায় এ ঘটনায় চট্টগ্রামজুড়ে চলছে নানা গুঞ্জন, তোলা হচ্ছে নানা প্রশ্ন। ব্যাংকের তথ্যমতে, লকার খোলার মূল চাবি থাকে একমাত্র গ্রাহকের কাছে। নকল চাবি থাকে লকার ইনচার্জের কাছে। তাহলে এই দু‘পক্ষের মধ্যে গ্রাহক যদি লকার না খুলে তাহলে লকারটি খোলার সঙ্গে কে বা কারা জড়িত। এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব মিলছে না।

অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ লকার থেকে স্বর্ণালংকার খোয়া যাওয়ার ঘটনায় গ্রাহকের বিরুদ্ধে স্ববিরোধী ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে। ফলে অলংকার চুরির অভিযোগ ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও নানা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বর্ণালংকার খোয়া যাওয়ার বিষয়ে গ্রাহক রোকেয়া আক্তার বারী ব্যাংকের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ নিয়ে ২৯ মে দুপুরে তিনি চকবাজার থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে মৌখিক অভিযোগ করার পর ওসি ব্যাংকে যান এবং লকার খোলা থাকার বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে তাকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।

রাতে রোকেয়া আক্তারের ছেলে লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় যান। তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে চাইলে ওসি এ ধরনের ঘটনায় মামলা করতে হবে বলে জানান। তিনি সময় চাইলে ওসি পরদিন দুপুর ১২টার দিকে লিখিত এজাহার নিয়ে থানায় যেতে বলেন। এরপর তারা আর থানায় যাননি।

এ ্িবষয়ে চকবাজার থানার ওসি মোহাম্মদ ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, গ্রাহকের অভিযোগ পেয়ে আমরা ব্যাংকে গিয়েছিলাম। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের লিখিত বা মৌখিকভাবেও কিছুই জানায়নি। এ বিষয়ে তারা আমাদের সঙ্গে কোনো কথাও বলেনি।

এ বিষয়ে রোকেয়া আক্তারের ছেলে ডা. রিয়াদ মোহাম্মদ মারজুক বলেন, ব্যাংকের সাথেই লাগোয়া চকবাজার থানা। বিষয়টি আমরা পুলিশকে জানিয়েছি। পুলিশ মামলা করতে বলেছেন। তবে আইনজীবীরা বলেছেন থানার চেয়ে আদালতে মামলা করলে ভালো হবে। তখন পিবিআই বা সিআইডিকে দিয়ে তদন্ত হবে। তাই আমরা আদালতে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

ব্যাংকের গ্রাহক রোকেয়া আক্তার বারী বলেন, আমাদের একজন আইনজীবী আছেন। উনার সঙ্গে পরামর্শ করেছি। উনি বলেছেন আদালতে মামলা করতে। মামলার প্রক্রিয়া চলছে। অবশ্যই মামলা হবে। আমি আমার গোল্ড ফেরত চাই। না হলে সমপরিমাণ টাকা আমাকে ফেরত দিতে হবে।

নগরীর চট্টেশ্বরী রোডের বাসিন্দা রোকেয়া আক্তার বারী বলেন, গত বুধবার (২৯ মে) দুপুরের দিকে আমি ব্যাংকে যাই। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে লকার ইনচার্জ লকার রুমে ঢোকেন। আমি ঢুকব এমন সময় উনি বের হয়ে বললেন, ম্যাডাম, আপনার লকারের নম্বর কত? আমি বললাম ৪৪। উনি বললেন, ম্যাডাম, আপনার লকার তো খোলা।

রোকেয়া বলেন, আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে লকারে হাত ঢুকিয়ে দেখলাম, সামনের দিকে যেগুলো রাখা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু নেই। পেছনের দিকে সাত-আটটা বক্স পেয়েছি। সেখানে দুইটা বক্সের মধ্যে ১০-১১ ভরি মতো গোল্ড পেয়েছি। পাঁচ-ছয়টা খালি। যেখানে ১৪৯ থেকে ১৫০ ভরির মতো স্বর্ণালংকার ছিল। আমার দুই ছেলের বউয়ের গোল্ডও সেখানে ছিল। সেগুলো এখন নেই।

রোকেয়া আক্তার বারীর ছেলে ডা. রিয়াদ মোহাম্মদ মারজুক বলেন, ২০০৭ সাল থেকে তার মা রোকেয়া আক্তার একমাত্র গ্রাহক হিসেবে লকারটি ব্যবহার করে আসছিলেন। সেখানে মা ও তার দুই পুত্রবধূর এবং মেয়ের প্রায় ১৬০ ভরি সোনার অলংকার রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০-১১ ভরি বাদে বাকি সব অলংকার উধাও হয়ে গেছে।

বিষয়টি জানতে ২ জুন রবিবার দুপুরে ব্যাংকে গিয়ে লকার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও শাখা প্রধানের অনুমতি মেলেনি। এমনকি লকার ইনচার্জের নামও জানাতে রাজি হননি তিনি।

চকবাজার শাখা প্রধান ও ইসলামী ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম শফিকুল মওলা চৌধুরী জানান, ২০০২ সাল থেকে রোকেয়া আক্তার বারী এককভাবে লকারটি ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করে আসছিলেন। উনি একাই সেটি পরিচালনা করতেন, মনোনীত কোনো প্রতিনিধি ছিল না।

এস এম শফিকুল মওলা চৌধুরী বলেন, রোকেয়া আক্তার গত ৮ এপ্রিল লকার ব্যবহারের জন্য ব্যাংকে এসেছিলেন। ব্যাংক কর্মকর্তা গ্রাহকের উপস্থিতিতে মাস্টার কী (চাবি) দিয়ে লকার আনলক করেন। পরে গ্রাহক যথারীতি তার কাছে রক্ষিত চাবি ব্যবহার করে পরিপূর্ণভাবে লকার খুলে তার কাজ শেষে লকার বন্ধ করে লকার ইনচার্জকে অবহিত করে চলে যান।

এস এম শফিকুল মওলা চৌধুরী বলেন, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। উনারা পরামর্শ দিয়েছেন, আগে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হোক। তারপর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সত্যত্যা যাচাই না করে পুলিশের কাছে কোন যুক্তিতে যাব? গ্রাহকের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের স¤পর্ক। মৌখিকভাবে উনাদের কাছে আমরা সময় চেয়েছি। অ্যামি কেবল রিলেশনের মাধ্যমে সমঝোতা করতে চেয়েছি। উনারা আমাদের সাত দিন সময় দিয়েছেন।

লকারের প্রযুক্তিগত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে গ্রাহক ছাড়া কারও পক্ষে সেটি খোলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে ব্যাংকের এই কর্মকর্তা বলেন, মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখেছি। লকার রুমে কোনো জানালা বা ভেন্টিলেটর নেই। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা রক্ষী সেখানে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। লকার রুমে চুরির কোনো সুযোগ নেই।

এদিকে রোববার (২ জুন) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম জানান, গত ২৯ মে গ্রাহক তার লকার ব্যবহার করতে এসে তার গহনা খোয়া গেছে বলে জানান। অথচ এর আগে তিনি নিজে লকার বন্ধ করে চাবি নিয়ে গেছেন।

তারপর লকার হোল্ডার (গ্রাহক) একবার বলেন তার ৩০০ ভরি স্বর্ণ নেই, কিছুক্ষণ পর আবার জানান ১৫০ ভরি স্বর্ণ নেই এবং কিছুক্ষণ পর আবার জানান ১৫০ ভরির মধ্যে অর্ধেক পেয়েছেন, বাকি অর্ধেক পাননি। তিনি এ ধরনের স্ববিরোধী ও বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়েছেন।

ইসলামী ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি লকার খোলার জন্য দুটি চাবির প্রয়োজন হয়, যার একটি গ্রাহক ও অন্যটি ব্যাংকের কাছে থাকে। গ্রাহকের চাবি ছাড়া কেবল ব্যাংকে রক্ষিত চাবি দিয়ে কোনোভাবেই লকার খোলা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহককে তার লকারের মূল চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। লকারে রক্ষিত মালামাল ও তার পরিমাণ স¤পর্কে একমাত্র গ্রাহক ছাড়া ব্যাংকার বা অন্য কোনো ব্যক্তির জানার সুযোগ নেই।

একমাত্র গ্রাহকের পক্ষে তার চাবি দিয়ে লকার বন্ধ করার সুযোগ আছে। লকার বন্ধ না করা পর্যন্ত গ্রাহকের চাবি বের করে আনা যায় না। লকার বন্ধ করার সময় নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের কারও সেখানে থাকার সুযোগ নেই।

রোকেয়া আক্তার বারীও অবশ্য জানিয়েছেন, ৮ এপ্রিল তিনি লকারে সব সোনার অলংকার পেয়েছিলেন এবং তিনি যথারীতি লকার বন্ধ করেই ফিরে যান। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ও তার মেয়ে নাসিয়া মারজুকা যৌথ নামে লকারটি ব্যবহার করে আসছিলেন। কোন সময় অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনায় তিনি যেমন বিস্মিত, তেমনি হতাশাজনক বলে জানান।

ঈশান/খম/সুম

ঘূর্ণিঝড় রিমালে চট্টগ্রামের ক্ষতি পৌনে ৪৩ কোটি

ঘূর্ণিঝড় রিমালে চট্টগ্রামের ক্ষতি পৌনে ৪৩ কোটি টাকা

print news

ঘূর্ণিঝড় রিমালে চট্টগ্রামের ক্ষতি প্রায় পৌনে ৪৩ কোটি টাকা। সম্প্রতি জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর ক্ষয়ক্ষতির এই প্রাথমিক হিসাব নির্ধারণ করেছে। তবে এই তথ্য মানতে রাজী নন চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাসেম। 

তিনি বলেন, ত্রাণ ও পূনর্বাসন দপ্তারের এই তথ্যের সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। এই তথ্য লুটপাটের। এই তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি কোন বরাদ্দ মিললেও চট্টগ্রামবাসীর কোন উপকারে আসবে না।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের হিসেব মতে, ঘুর্ণিঝড় রিমালে চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার মধ্যে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি পটিয়া ও সাতকানিয়াসহ মোট ৭টি উপজেলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

বাকি উপজেলাগুলোর মধ্যে সন্দ্বীপে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি দেখানো হয়েছে। উপজেলাটিতে মোট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২৮ কোটি ৮৮ লাখ ২৫ হাজার ১৭৪ টাকার।

এছাড়া বাঁশখালী উপজেলায় ১ কোটি ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকার, লোহাগাড়া উপজেলায় ৩৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার, সীতাকুণ্ড উপজেলায় এক কোটি ১৪ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকার, মিরসরাই উপজেলার ২ কোটি ৩৯ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকার, আনোয়ারা উপজেলায় ১ কোটি ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকার, কর্ণফুলী উপজেলায় ৫৮ লাখ টাকার এবং চন্দনাইশ উপজেলায় ৭ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাইফুল্লাহ মজুমদার বলেন, ঘূর্ণিঝড় রিমালে চট্টগ্রামে ৪২ কোটি ৭২ লাখ ৬১ হাজার ১৭৪ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা হিসেব করে এই প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি।

প্রসঙ্গত, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমাল, যেটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। এটি গত ২৬ মে সন্ধ্যা থেকে ২৭ মে সকাল নাগাদ স্থলভাগ অতিক্রম করে। এ সময় চট্টগ্রামে মাঝারি বৃষ্টিপাত হলেও তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। পাকা বোরো ধান কেটে নেওয়ায় কোনরকম ফসলহানি হয়নি। এমনকি কোন ধরণের প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটেনি।

ত্রাণ ও পূনর্বাসন দপ্তারের এই তথ্যের সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই দাবি করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাসেম। তিনি বলেন, এই তথ্য লুটপাটের। তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি বরাদ্দ মিললেও চট্টগ্রামবাসীর কোন উপকারে আসবে না।

ঈশান/মখ/সুপ

কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন চালুর খবরে কমাতে শুরু করেছে বাস ভাড়া

কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন চালুর খবরে কমাতে শুরু করেছে বাস ভাড়া

print news

কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন চালুর খবরে কমতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটের বাস ভাড়া। ইতোমধ্যে বড় দুটি বাস কোম্পানি ১০০ টাকা পর্যন্ত তাদের ভাড়া কমিয়েছে। আরও কয়েকটি বাস কোম্পানি ভাড়া কমানোর পরিকল্পনা করছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, টানা দুই মাস কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন চালু থাকায় কমাতে শুরু করে বাস ভাড়া। ট্রেনটি চালুর আগে বাস মালিকরা তাদের কাছ থেকে যেমন খুশি তেমন ভাড়া আদায় করতেন। যাত্রী কমে যাওয়ায় তারা ভাড়া কমাতে বাধ্য হয়।

সূত্র জানায়, সৌদিয়া পরিবহনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ভাড়া এখন ৩৩০ টাকা। যা আগে ছিল ৪২০ টাকা। সে হিসাবে সৌদিয়া কর্তৃপক্ষ ভাড়া কমিয়েছে ৯০ টাকা। পাশাপাশি লোহাগাড়া এবং কেরানীহাটগামী রুটের ভাড়াও কমিয়েছে এই পরিবহন কোম্পানি।

অন্যদিকে পূরবী পরিবহনও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ভাড়া ১০০ টাকা কমিয়েছে। এই পথের নতুন ভাড়া ৩২০ টাকা নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যা আগে ৪২০ টাকা ছিল। এছাড়া ঈদগাঁ-চট্টগ্রাম, চকরিয়া-চট্টগ্রাম এবং কেরানীহাট-চট্টগ্রাম রুটের ভাড়াও কমেছে।

জানতে চাইলে পূরবী পরিবহনের এমডি কাজল কান্তি দাশ জানান, যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ছাড়ের ফলে আরও বেশি মানুষ বাসে যাতায়াত করবেন। যাত্রীরা ভাড়া কমানোর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। এই ছাড় অব্যাহত থাকবে।

কাজল কান্তি দাশ আরও বলেন, মানবিক কারণে যাত্রীদের সুবিধার্থে আমরা ভাড়া কমিয়েছি। যদিও কম ভাড়া নির্ধারণে পরিবহন মালিক সমিতিতে আমাকে অনেক প্রশ্ন করা হয়েছে। কিন্তু সেটি উপেক্ষা করে যাত্রীদের আর্থিক দিক চিন্তা করে ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

তবে বাস মালিকদের এই যুক্তি মানতে নারাজ স্থানীয়রা। সোলায়মান আলম নামে স্থানীয় একজন বলেন, বাস মালিকপক্ষ যাত্রীর প্রতি সদয় হয়ে নয়, টিকে থাকার সংগ্রামে ভাড়া কমিয়েছে। কারণ ট্রেন চালুর পর থেকে বাসের একচেটিয়া রাজত্ব কমেছে। মানুষ ট্রেনেই বেশি যাতায়াত করছে।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ মে থেকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটে স্পেশাল ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় এই রুটের যাত্রীরা ফের বাস মালিকদের হাতে জিম্মি হবে বলে দাবি করেছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতিগুলোর নেতারা।

তাদের দাবি, ইঞ্জিন ও ক্রু সংকটের অজুহাতে স্পেশাল ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হলেও এর পেছনে বাস মালিকদের প্রেসক্রিপশন রয়েছে। তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, পরিবহন মালিকদের ষড়যন্ত্রের কারণেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম স্পেশাল ট্রেন বন্ধ করা হয়েছে। নাগরিক সমাজ দ্রুত এই স্পেশাল ট্রেন পুনরায় চালুর দাবি জানাচ্ছে। তবে সুখবর হচ্ছে-রেলওয়ে কর্তৃৃপক্ষ ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ১২ জুন থেকে ফের ট্রেনটি চালুর ঘোষণা দিয়েছে।

তবে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা বলছেন, কোরবানির ঈদকে ঘিরে স্পেশাল ট্রেনটি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ঈদের পরে এটি যে কোন মুহুর্তে বন্ধ য়ে যেগত পারে। এটি যদি হয় তাহলে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলবো।আমরা চাই এই রুটে নিয়মিত ট্রেন চালু করা হোক।

তিনি বলেন, ট্রেনটি চালু নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্রেন চালকসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত রয়েছে। এরপর লাভজনক এই ট্রেনটি কেন বন্ধ করা হচ্ছে তা তারা জানে না।

কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনের মাস্টার মো. গোলাম রব্বানি জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১২ জুন থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এবং ঈদের পরের দিন থেকে টানা এক সপ্তাহ চলবে কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন। যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন চলাচলের সময় বাড়ানো হতে পারে।

যাত্রীরা জানান, চট্টগ্রাম থেকে পর্যটননগরী কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেনের ভাড়া বাসের চেয়ে অনেক কম। সর্বনিম্ন ৫৫ টাকা আর সর্বোচ্চ ৬৯৬ টাকায় ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়। এছাড়া ট্রেনের যাত্রা বাসের চেয়েও আরামদায়ক ও স্বাচ্ছন্দ্যের। ফলে বাসের চেয়ে ট্রেনকেই বেছে নিচ্ছেন যাত্রীরা।

ঈশান/খম/সুম

লাভজনক হওয়ার পরও বন্ধ কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন

লাভজনক হওয়ার পরও বন্ধ হয়ে গেল কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন

print news

লাভজনক হওয়ার পরও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে চলাচল করা কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন বন্ধ করে দিয়েছে রেলওয়ে। এতে ক্ষুব্দ হয়েছেন চট্টগ্রামের সাধারণ যাত্রীরা। 

বৃহস্পতিবার থেকে ট্রেন বন্ধ রাখতে বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে (ডিআরএম) চিঠি দিয়েছে রেলওয়ের যান্ত্রিক বিভাগ। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত ৮ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের বিশেষ ট্রেনটি চালু করেছিল কর্তৃপক্ষ।

যাত্রী চাহিদা ও স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে ট্রেনটি চালু রাখার সময়সীমা ৩০ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছিল। বন্ধের চিঠিতে বলা হয়, ইঞ্জিন ও কর্মী সংকটে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী একমাত্র ও বিশেষ ট্রেনটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর দাবি, বাস মালিকদের প্রেসক্রিপশনে কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন বন্ধ করে দিয়েছে রেলওয়ে। এই প্রেসক্রিপশনে হয়তো ও কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন রাখেন,শুধু রাজধানীবাসীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য কি ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথটি নির্মাণ করা হয়েছে? এই রেলপথ নির্মাণে চট্টগ্রাম, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জনগণের জমিজমা, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নদী-নালা, খাল-বিল বিলীন হয়েছে। অথচ এই ট্রেন সার্ভিস চালুর পর থেকে তারা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে যাতায়াতের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এতে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্বাঞ্চল রেলের পাঁচজন কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনটি দেশের সবচেয়ে লাভজনক ছিল। ট্রেনটি চালানোর মতো সব রকমের প্রস্তুতি তাঁদের রয়েছে। তারপরও রেল কেন চালাচ্ছে না, সেটি তাঁরা বুঝতে পারছেন না।

তারা বলেন,চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে আলাদা ট্রেন দরকার। অন্য কোনো ট্রেনকে চট্টগ্রামে স্টপেজ দিয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নিয়ে গেলে চট্টগ্রামের যাত্রীরা কোনো সুফলই পাবে না। কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনটি স্থায়ীভাবে চলাচল করলে চট্টগ্রামের মানুষ উপকৃত হত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনটি দেশের সবচেয়ে লাভজনক ছিল। ট্রেনটি না চালানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এতে আমাদের কিছু করার নেই।’ এখানে কোন প্রেসক্রিপশন নেই।

পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যিক বিভাগ জানায়, ট্রেনটিতে প্রতি মাসে আয় ছিল ৬৫ লাখ টাকার বেশি, যা দেশে চলা অন্যান্য ট্রেনের চেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন, সুবর্ণসহ অন্য আন্তনগর ট্রেনের সঙ্গে তুলনা করলে এই কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের আয় বেশি।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) তারেক মো. ইমরান বলেন, কক্সবাজার স্পেশাল ৯ / ১০ ঈদ উপলক্ষে মাত্র চলেছে ১৮ দিন। এই সময়ে ট্রেনটি থেকে আয় হয়েছে ৪২ লাখ টাকা। ট্রেনটি গত ৮ এপ্রিল থেকে চলাচল শুরু করে। ৮ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিলের (১১,১৫ ও ১৬ তারিখ বন্ধ ছিল) হিসেবে দেখা যায়, প্রতিদিনই যাত্রীদের চাপ ছিল।

তারেক মো. ইমরান বলেন, চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রেনটি ১০ / ২০ লোড নিয়ে চলাচল করেছে। ট্রেনটিতে সিট ছিল ৪৩৮টি। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির সিট ৫৪টি, প্রথম শ্রেণির চেয়ার ৫৪ ও শোভন ৩৩০টি। এটি চট্টগ্রামের ষোলোশহর, জানালীহাট, পটিয়া, দোহাজারী, সাতকানিয়া, চকরিয়া, ডুলাহাজারা ও রামুতে থামত।

উল্লেখ্য, প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০১ কিলোমিটার রেলপথ গত বছরের ১১ নভেম্বর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ডিসেম্বর থেকে দুই ধাপে ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে দুটি বিরতিহীন আন্তনগর ট্রেন চালু করে রেলওয়ে।

ঈশান/মখ/সুপ

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারি ধান ব্রি-১০৫

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারি ধান ব্রি-১০৫

print news

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ব্রি ধান-১০৫ উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। এ ধানে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মান ৫৫। তাই লো জিআই মান সম্পন্ন এ ধানের ভাতকে ডায়াবেটিক ভাতও বলা যায়।

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রমতে, গত বছরের মার্চে চাষের অনুমোদন পায় নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান-১০৫। তারপর গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের গবেষণা মাঠে ধানটি চাষ করা হয়। এটি বোরো মৌসুমের ধান হলেও আমন মৌসুমে বীজ হিসেবে চাষাবাদ করা হয়। এতে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়।

এ জাতের ধান পাকার পরও গাছ সবুজ থাকে। পূর্ণ বয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা হয় ১০১ সেন্টিমিটার। গড় ফলন হেক্টরে ৭ দশমিক ৬ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে অনুকূল পরিবেশে হেক্টর প্রতি ৮ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এ জাতের দানার আকার ও আকৃতি মাঝারি, সরু ও রং সোনালি। এর জীবনকাল ১৪৮ দিন। এ জাতের ১ হাজারটি দানার ওজন ১৯ দশমিক ৪ গ্রাম। এতে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৭ শতাংশ এবং প্রোটিনের পরিমাণ ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। রান্না করা ভাত ঝরঝরে এবং সুস্বাদু।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডায়াবেটিস রোগীরা এ ধানের চালের ভাত নিরাপদ মনে করে পেটভরে খেতে পারবেন। লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) সম্পন্ন এ ধানের চালের ভাত খেলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করা খুব কম যাবে। ব্রি’র প্রধান কার্যালয়ে পুষ্টি গবেষণা বিভাগের পরীক্ষায় ব্রি ধান-১০৫ এর পুষ্টিমান নির্ণয় করে এ তথ্য জানা গেছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এ ছাড়া এ ধান ভবিষ্যতে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমাদের গবেষণা মাঠে উৎপাদিত ব্রি ধান-১০৫ এর বীজ বোরো মৌসুমে গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও বাগেরহাট জেলায় কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেই।’

কৃষকরা জানান, ‘নতুন এ জাতের ধান চাষে সেচ ও সার কম লেগেছে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এ জাতের ধানচাষ লাভজনক। বাজারে এ ধানের চাহিদা রয়েছে। তাই আগামীতে আমরা ডায়াবেটিক রাইস চাষ সম্প্রসারণ করব।’

কৃষক সুমন লস্কর বলেন, ‘ব্রি ধান-১০৫ আমরা প্রথম চাষাবাদ করেছি। এ ধানের হেক্টর প্রতি সাড়ে ৭ টন ফলন হয়েছে। ধানটি লম্বা ও চিকন। ডায়াবেটিস রোগীরা এ ধানের চালের ভাত খেতে পরেন। তাই অনেকেই এ ধান চাষাবাদে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আমার জমিতে উৎপাদিত সব ধান বীজ হিসেবে রেখে দিয়েছি। এ ধান অন্তত ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে পারব।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও নড়াইল জেলায় এ ধানের পরীক্ষামূলক আবাদ করা হয়। এ তিন জেলার ৮ দশমিক ৭ হেক্টর জমিতে ব্রি ধান-১০৫ প্রথম আবাদেই সাফল্য মিলেছে। হেক্টরপ্রতি কৃষক ৬ দশমিক ৫ টন থেকে ৭ দশমিক ৫ টন ফলন পেয়েছেন। ফলে এ ধান চাষে কৃষক লাভবান হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কৃষি বিজ্ঞানী সৃজন চন্দ্র দাস জানান, নতুন উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে ব্রি-১০৫ বোরো মৌসুমের একটি কম জিআই সম্পন্ন ডায়াবেটিক ধান। প্রচলিত ধানগুলোতে জিআই এর মান ৬৫ থেকে ৭৫। কিন্তু ব্রি-১০৫ ধানে জিআই এর মান ৫৫। এ চালের ভাত খেলে রক্তে শর্করা কম নামবে। এ ধানের বৈশিষ্ট্য হলো মাঝারি লম্বা ও চিকন দানা। কম জিআই হওয়ার কারণে এটি ডায়াবেটিক চাল হিসেবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে।

ঈশান/খম/সুম

ঘুষ ছাড়া পণ্য খালাস হয় না চট্টগ্রাম কাস্টমসে

ঘুষ ছাড়া পণ্য খালাস হয় না চট্টগ্রাম কাস্টমসে

print news

ট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের চরমভাবে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ঠুনকো অজুহাতে চালান আটকে দিচ্ছে ওই চক্র। এরপর মোটা অংকের ঘুষে খালাস করতে হয় ওই পণ্য।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তৈরি পোশাক শিল্প, পাওয়ার প্ল্যান্টের সরঞ্জাম এবং কেমিক্যালসহ নানা পণ্য খালাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করা হলেও চাহিদামতো উৎকোচ না পেলে অনিয়মের ঠুনকো অজুহাত তুলে ফাইল আটকে দেওয়া হচ্ছে। কোয়ারি বা খতিয়ে দেখার নামে দিনের পর দিন টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরছে ফাইল। মোটা অংকের ঘুষ না দেওয়া ছাড়া কোয়ারি আর শেষ হয় না।

এ কারণে বন্দরে দীর্ঘ সময় পণ্য পড়ে থাকায় পোর্ট ডেমারেজসহ নানা ধরনের মাশুল গুনতে হয়। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমদানি-রপ্তানিকারী ব্যবসায়ীরা। এছাড়া পণ্য রপ্তানি বিলম্বিত হলে অর্ডার বাতিলের মতো ঝুঁকিতে পড়তে হয়। এতে বাধ্য হয়ে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে পণ্য খালাস করতে হয়।

ব্যবসায়ীরা জানান, কাস্টমস কর্মকর্তাদের ওই সিন্ডিকেটের হয়রানির কারণে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। আমদানি-রপ্তানিও কমে আসছে। এতে বাণিজ্যিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে হুমকি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একতথ্যেও  আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট আমদানি আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৪ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ ৬৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৮৬ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামালের আমদানি হ্রাসের কারণে আমদানি কমেছে বলে তথ্যে উঠে এসেছে। আবার চলতি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬৩ শতাংশ সংকুচিত হয়ে ৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তাদের একটি চক্রের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। এ জটিলতা কাটানোর অনুরোধ জানাতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গত ১৫ মে বৈঠক করেছেন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ নেতারা। এর আগে ১৩ মে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গেও বৈঠক করেন বিজিএমইএ নেতারা। মন্ত্রী সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপন করবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন।

বিজিএমইএর সভাপতি এসএম মান্নানের নেতৃত্বে ব্যবসায়ী নেতারা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে হয়রানি বন্ধে কাস্টমসের তরফ থেকে সহযোগিতা কামনা করেন। বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল আমদানি করা ওভেন কাপড়ের চালান ছাড়করণ, রপ্তানি পণ্যের চালান জাহাজীকরণে ওজনজনিত সমস্যা, ডকুমেন্টেশন সমস্যা এবং আমদানি পণ্য খালাসে এইচএস কোড সংক্রান্ত জটিলতাসহ কাস্টমস সম্পর্কিত পরিষেবাগুলোতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করেন।

বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় তৈরি পোশাকের ব্যবসায় এখন খারাপ সময় চলছে। এমন বাস্তবতায়, শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, দ্রুততর ও হয়রানিমুক্ত করা প্রয়োজন। তারা বলেন, পোশাক শিল্পের রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে কাস্টমস সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব হচ্ছে।

বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীদের একজন বিজিএমইএ নেতা মহিউদ্দীন রুবেল বলেন, ‘আমরা কাস্টমস কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে সহযোগিতা চেয়েছি। যাতে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বিড়ম্বনায় পড়তে না হয়। আমাদের কথা শোনার পর কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘সরকার নিয়মনীতির মধ্যে থেকে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা হবে। এক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অসহযোগিতা করবে না।’ এরপরও পরিস্থিতির কোনা উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে সরেজমিন পরিদর্শনকালে কাস্টমসের হয়রানির বিষয়ে একাধিক আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু ভবিষ্যতে তাদের ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করা হতে পারে এমন আশঙ্কায় নিজেদের পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি।

তাদের অভিযোগ, গার্মেন্টস শিল্প, পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং কেমিক্যালসহ অন্যান্য পণ্য খালাসে নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করলেও কিছু কর্মকর্তা ‘সিস্টেমে’র অজুহাতে পণ্য ছাড় প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছেন। তবে চাহিদামতো টাকা দিলে দ্রুততার সঙ্গে ছাড়পত্র মেলে। আর টাকা না দিলে কোয়ারির নামে টেবিলের পর টেবিলে ঘুরতে থাকে ফাইল। মাসের পর মাস বন্দরে আটকে থাকে পণ্য।

ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার কাজী ইরাজ ইসতিয়াক কর্মকর্তাদের এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই কর্মকর্তা ঠুনকো অজুহাত তুলে ব্যবসায়ীদের সর্বাধিক সংখ্যক ফাইল আটকে রেখেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, পণ্য খালাসের ফাইল তার কাছে উত্থাপিত হওয়ার পর প্রচলিত কাস্টমস বিধি না মেনে বা নিকটতম সময়ে আমদানিকৃত একই পণ্যের রেফারেন্স আমলে না নিয়ে ব্যক্তিগত চিন্তাপ্রসূত মতামত দিচ্ছেন। এমনকি ওই কর্মকর্তার হাত ধরে ছাড় পাওয়া পণ্যের রেফারেন্স দিলেও তিনি তা মানছেন না। তিনি অধিকাংশ ফাইলে ‘আলোচনা করুন’ লিখে দিচ্ছেন। সেই আলোচনা আবার চলে ১০-১৫ দিন ধরে। এভাবে সময়ক্ষেপণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই কর্মকর্তার অধীনে সরকারি পণ্য, ডিউটি ফ্রি বন্ডের পণ্য, সরকারি প্রকল্পের মালামাল, বিদ্যুৎ, ওয়াসা, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীর মালামাল এবং কেমিক্যাল খালাসের ফাইল ছাড় হয়। তিনি ফাইলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফাঁকফোকর বের করেন। এমনও দেখা যাচ্ছে, ১০ দিন আগে নিজে ফাইল ছাড় করেছেন এমন পণ্যের নতুন চালান খালাসের ফাইল উত্থাপিত হলেও নতুন করে বাধার সৃষ্টি করছেন। অথচ, মাত্র ১০ দিন আগেই এই পণ্য খালাসের ফাইল তিনি ছাড় করেছেন। ১০ দিন আগে একই পণ্য খালাস করা হয়েছে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর তিনি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিকে বলছেন, ‘আগে আমি ভুল করছি, এখন হবে না।’

কাস্টমসের হয়রানির বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, ‘কাস্টমসে আমাদের সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফাইলে সবকিছু ঠিক থাকার পরও আপত্তি দেয় কাস্টমস। আবার কিছু ক্ষেত্রে দাখিল করা ফাইলে সত্যিই ত্রুটি থাকে। ফলে ত্রুটি সারিয়ে পণ্য খালাস করতে হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে ডেপুটি কমিশনার কাজী ইরাজ ইসতিয়াক বলেন, ‘রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টারোধ করলেই কাস্টমসের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে হয়রানির অভিযোগ তোলেন ব্যবসায়ীরা। সাধারণত, ফাইলে কোনো ঝামেলা না থাকলে কাস্টমস সেই ফাইল আটকে দেয় না। আর কোনো ফাইল আটকে গেলে আমি একক সিদ্ধান্ত দিই না। ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত দিই।’

এই কাস্টমস কর্মকর্তার বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে কাস্টমসে আসলেই ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হয় না। বাস্তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী এবং সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধির বক্তব্য উল্টো। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাস্টম হাউসে এখন ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইলই ছাড় হয় না। কেউ ঘুষ দিতে না চাইলে নানা ফাঁকফোকর বের করে তার ফাইলটি আটকে দেওয়া হয়। ফাইলে বড় কোনো অনিয়ম না থাকার পরও এক কর্মকর্তা আরেক কর্মকর্তার কাছে মন্তব্যের জন্য ফাইল পাঠিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। যাতে সময়ক্ষেপণের কারণে আমদানি-রপ্তানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হন। আর এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন।

শুধু সময়ক্ষেপণ করে ঘুষ নেওয়ার কৌশল ছাড়াও ব্যক্তিগত সহকারী রাখার অভিযোগও পাওয়া গেছে। একাধিক কর্মকর্তা ‘ব্যক্তিগত সহকারী’ নিয়োগ দিয়েছেন ঘুষ গ্রহণের সুবিধার্থে। এর মাধ্যমে ওই কর্মকর্তা সরাসরি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধির সঙ্গে ঘুষ বিষয়ে আলোচনা করেন না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ‘ব্যক্তিগত’ কর্মকর্তা ঘুষ লেনদেন করেন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা আমদানি-রপ্তানিকারকদের কীভাবে হয়রানি করছে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, এখন হয়রানির অন্যতম কৌশল হয়ে উঠেছে ওজন পদ্ধতি। এই ওজন পদ্ধতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে। যদিও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, ‘হয়রানি নয়, কেউ যেন অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্য কঠোরভাবে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া দেখভাল করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।’ কাস্টমস কর্তৃপক্ষের এমন ‘কঠোরতা’র কারণেই ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক শিল্প কারখানার জন্য আমদানি করা পণ্য চালানের ওভেন কাপড় আমদানি হয় গজ বা মিটারে। কিন্তু কাস্টম হাউস পরীক্ষার সময় ওই কাপড় পরিমাপ করে ওজন বা কেজি ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে ওজনে কিছুটা কমবেশি হলেই আটকে দেওয়া হয় আমদানিকৃত কাপড়ের চালান। আবার আমদানি করা কাপড় দিয়ে তৈরিকৃত পোশাক রপ্তানির চালান পরীক্ষার সময় ওজন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাদ দেওয়া হয় পলি, কার্টন ও বোর্ডসহ আনুষঙ্গিক দ্রব্যের ওজন। পণ্য চালানের বিভিন্ন সাইজের কার্টনের ওজন পরিমাপ না করেই এক সাইজের কার্টনের ওজন পরিমাপ করেই বের করা হয় কার্টনের সর্বমোট ওজন। আনুষঙ্গিক দ্রব্যের প্রকৃত ওজন বের না হওয়ায় তারতম্য তৈরি হয় আমদানির সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের ওজনে। এই ওজন কমবেশির অজুহাতে প্রায় সময় রপ্তানি পণ্যের চালান আটকে দিচ্ছে কাস্টম হাউস। এতে লোকসানে পড়ছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, ওজনে কমবেশির অজুহাতে রপ্তানি চালান আটকে দেওয়ায় অতিরিক্ত পোর্ট ডেমারেজ চার্জ পরিশোধ করতে হয় রপ্তানিকারকদের।

পোশাক কারখানার জন্য কাপড় আমদানি এবং প্রস্তুতকৃত পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের কাস্টম হাউসের হয়রানির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এসএম আবু তৈয়ব বলেন, ‘রপ্তানির সময় কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ রপ্তানিকারকরা কতটুকু পণ্য রপ্তানি করছেন তা ওজন হিসেবে পরিমাপ করা শুরু করেছেন গত সাত-আট মাস আগে থেকে। এর আগে এই পদ্ধতি ছিল না। আমরা মনে করি, আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ওজন পরিমাপের বিষয়টি হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, আমরা আমদানি করি গজ হিসেবে। তাই কেজি বা ওজনের হিসাব করি না। এখন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ওজন পদ্ধতিতে হিসাব করছে। এতে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ওজনে তারতম্য হলেই বলছে, ‘তুমি কম এনে বেশি মাল রপ্তানি করছো। আবার রপ্তানির সময় ওজনে কম হলে বলছে তুমি বেশি এনে কম রপ্তানি করছো।’

তিনি আরও বলেন, আমদানিকৃত কাপড়ের ক্ষেত্রে জেটিতে কাস্টমস কর্মকর্তা কর্তৃক পণ্য চালানের কাপড়ের কয়েকটি রোলের ওজন পরিমাপ করে গড় ওজন নির্ণয় করেন। অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃক ওজন পরিমাপের যন্ত্রের ত্রুটির কারণে সঠিকভাবে পরিমাপ নির্ণয় হয় না। এগুলোর কারণেও ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

পোশাক রপ্তানিকারকরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী এইচএস কোড সংক্রান্ত জটিলতায় শুধু এক্সেসরিজের ক্ষেত্রে অঙ্গীকারনামা প্রদান সাপেক্ষে পণ্য চালান খালাসের নির্দেশনা রয়েছে। এক্ষেত্রে কাপড়ের উল্লেখ না থাকায় কাস্টম হাউস, চট্টগ্রামের মাধ্যমে আমদানিকৃত কাপড় ছাড়করণের ক্ষেত্রে এইচএস কোড সংক্রান্ত জটিলতায় অঙ্গীকারনামার পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টি গ্রহণ সাপেক্ষে খালাসের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় চলমান সংকটময় পরিস্থিতিতে কারখানাগুলো এটি প্রতিপালন করতে পারছে না। ফলে পণ্য চালান খালাস বিলম্বে রপ্তানিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে রপ্তানির আগে কারখানাগুলো নিজস্ব ছোট ওজন মেশিনে পোশাক পরিমাপ করে। কিন্তু একই পণ্য প্রাইভেট আইসিডিতে কাস্টমস অফিসাররা বড় ওজন মেশিনে পরিমাপ করেন। এতেও ওজনের কিছুটা তারতম্য হয়।

এছাড়া পরীক্ষণের সময় ওজন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পলি, কার্টন ও বোর্ডসহ আনুষঙ্গিক দ্রব্য বাদ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এসব আনুষঙ্গিক দ্রব্য সঠিকভাবে নির্ণয় করে না। ফলে কারখানা বনাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ওজনে তারতম্য হচ্ছে। আবার, বিভিন্ন সাইজের কার্টনের ওজন পরিমাপ না করে এক সাইজের কার্টনের ওজন পরিমাপ করে পুরো চালানের কার্টনের ওজন নির্ধারণ করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

অথচ, একটি চালানে নানা সাইজের কার্টন থাকে। এতেও ওজনে তারতম্য হয়। এই ওজন তারতম্যের বিষয়টি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে। কাঁচামাল আমদানির সময় ওজনের তারতম্যকে মিথ্যা ঘোষণা হিসেবে চিহ্নিত করছে কাস্টমস। তারপর বাড়তি ওজনের কাপড়ের ওপর শুল্কসহ দ্বিগুণ জরিমানা করছে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একজন আমদানিকারককে বাড়তি সময় গুনতে হয় অন্তত ১০-১৫ দিন।

ওজন পদ্ধতির কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উল্লেখ করে বিজিএমইএ নেতা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘কাস্টমস কমিশনার আমাদের জানিয়েছেন, ওজন পদ্ধতি বাদ দেওয়া যাবে না। তবে সহনশীল করা হবে। এখন আমরা সেই অপেক্ষায় আছি।’

ওজন পদ্ধতিসহ ঠুনকো অজুহাতে ফাইল আটকে দেওয়ার অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টম হাউসের উপকমিশনার নাজিউর রহমান মিয়া বলেন, ‘ওজন কমবেশির অজুহাতে রপ্তানিকারকদের হয়রানি করা হচ্ছে এই অভিযোগটি সঠিক নয়। পরীক্ষায় যদি ওজন কমবেশি পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে আইনানুগ যেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, সেটিই গ্রহণ করা হয়।

এক্ষেত্রে ওজন ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমবেশি হলে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয় না। যদি ওজনের তারতম্য এর চেয়ে বেশি হয়, তখন আমরা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তবে তখনও পণ্যের চালানটি আটকে রাখা হয় না। চালানটি শিপমেন্টের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। যাতে পণ্য রপ্তানিতে কোনো জটিলতা তৈরি না হয়।’

তিনি দাবি করেন, ‘কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কাউকে হয়রানি করে না। অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে কেউ যাতে রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্য কাস্টমস কর্মকর্তারা কঠোরভাবে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া দেখভাল করে।

ঈশান/খম/সুম

চট্টগ্রামে আবাসনের কোপে সাবাড় হচ্ছে পাহাড়!

চট্টগ্রামে আবাসনের কোপে সাবাড় হচ্ছে পাহাড়!

print news

ট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামির টেক্সটাইল মোড় থেকে কিছুটা দক্ষিণে গেলেই চন্দ্রনগর আবাসিক এলাকা। সেই আবাসিকের পাশ দিয়ে পশ্চিমে চলে গেছে কিশোয়ান গলি। সেই গলির শেষ প্রান্তে রয়েছে এক পাহাড়, স্থানীয়ভাবে যা পরিচিত নাগিন পাহাড় হিসেবে। এই পাহাড়ের পূর্বপাশের পুরো ঢাল কেটে ফেলা হয়েছে খাড়াভাবে।

পাহাড়ের পাদদেশে কিছুটা জায়গা বাড়ির আঙিনার মতো। বছর দশেক আগেও ওই পুরো অংশে পাহাড় ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা হাশেম। কারা, কীভাবে পাহাড় কাটছে- এমন প্রশ্নে হাশেম যেন মুখে কুলুপ আঁটেন।

একপর্যায়ে শুধু বলেন, কখনও এক্সকাভেটর দিয়ে, কখনও ওপর থেকে কিছু অংশ কেটে মাটির চাক ফেলে পাহাড়গুলো কাটা হয়। তবে কারা কাটে এই বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। এলাকারই আরেকজন বলে ওঠেন এটা তো গ্রিনভ্যালি হাউজিং-২ এর অধীনে। হাউজিংয়ের সভাপতি আজম উদ্দিন সাহেব, সেক্রেটারি দিদারুল আলম। তাদের আন্ডারেই কাটা হচ্ছে। এটা তো সহজ কথা।

নাগিন পাহাড়ের ঢালের পাশ ঘেঁষে উত্তর দিকে একটি রাস্তা চলে গেছে। ওই রাস্তাটাও পাহাড় কেটে বানানো। সেই পথ ধরে কিছুটা এগোলে দেখা মেলে আরেকটি টিলার মতো জায়গার। সেটি যে মেশিন দিয়ে কেটে সমান করা হয়েছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। কেটে সমান করা পাহাড়ের ওই অংশটার আশপাশে টিনের কয়েকটি ঘরের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে।

ওই ঘরের বাসিন্দা বিউটি বেগম সেখান থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর এখন পাশেই আরেকটি ভাড়াঘরে থাকেন। বিউটি বেগমের আদি নিবাস নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায়। নদীভাঙনে সব হারিয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে আসেন। স্বামী একটি ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন। পাহাড় কেটে বানানো ওই প্লটে ঘর করে থাকতেন তিনি। জায়গা দেখাশোনার পাশাপাশি প্লটে সামান্য চাষাবাদও করতেন বিউটি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশ অনেক বছর ধরেই ওই এলাকায় পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে হাউজিং সোসাইটি। শুধু গ্রিনভ্যালি নয়, আশপাশের বেশিরভাগ হাউজিং সোসাইটি একই কায়দায় গড়া। প্রথমে পাহাড় কেটে সমান করে প্লট বানিয়ে সেখানে বিউটি বেগমের মতো জলবায়ু উদ্বাস্তু কিংবা ভূমিহীনদের থাকতে দেওয়া হয়। পরে সেসব জায়গা বিক্রি করা হয় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকায়। একেকটি প্লটের আয়তন তিন কাঠার মতো।

জানা যায়, গত সংসদ নির্বাচনের সময় বেশ কয়েকদিন ধরে দিনে-রাতে পাহাড় কাটা চলতে থাকে। এসব ঘটনা জানুয়ারির শেষদিকে নজরে আসে পরিবেশ অধিদপ্তরের। জানুয়ারিতে একটি ও গত মাসে আরও একটি মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। দুটি মামলার আসামি হলেন স্থানীয় দুই আওয়ামী লীগ নেতাসহ ১৮ জন।

মামলার এজাহারভুক্ত দুই আওয়ামী লীগ নেতা হলেন মো. শামসুদ্দিন ও মো. বাহার উদ্দিন। বলা হচ্ছে, তাদের নেতৃত্বেই নাগিন পাহাড় কাটা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাহারের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালেও পাহাড় কাটার অভিযোগে মামলা হয়। ২০২১ সালে চন্দ্রনগর এলাকায় পাহাড় কাটার অপরাধে শামসুদ্দিন ও বাহারকে ৬ লাখ টাকা করে জরিমানাও করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এদের মধ্যে বাহার উদ্দিন জালালাবাদ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শামসুদ্দিন সাংগঠনিক সম্পাদক।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. শামসুদ্দিন বলেন, ‘পাহাড় কেটে কোনো স্থাপনা করিনি। আমার যে ঘর ছিল, সেটি সমতলে। তারপরও পরিবেশ অধিদপ্তর আমার স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ৬ লাখ টাকা জরিমানাও করে। অধিদপ্তরের লোকজন এসে হুটহাট মামলা দিয়ে যায়, কারও কথা শোনে না। এ কারণে আসামি হয়েছি। আমি আসলে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার।’

বিভিন্ন সময় মামলা করলেও বিদ্যমান আইনের দুর্বলতার কারণে পাহাড় কাটা রোধ করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন মামলার বাদী পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মনির হোসেন। তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। অনেকদিন ধরেই ওই এলাকায় পাহাড় কাটছে কিন্তু বিদ্যমান আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর খুঁজে তারা ঠিকই বের হয়ে যাচ্ছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের জ্যেষ্ঠ রসায়নবিদ জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘নাগিন পাহাড় কাটার ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। ঘুরেফিরে একই ব্যক্তিরা আসামি। মামলা করেও তাদের থামানো যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত মাসেও একটি মামলা হয়েছে। গত ২২ এপ্রিল এই মামলার শুনানি ছিল, কিন্তু অভিযুক্তরা কেউ আসেননি। আগের মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি।

শুধৃু নাগিন পাহাড় নয়, চট্টগ্রামের সবকটি পাহাড় এভাবে সাবাড় হচ্ছে আবাসনের কোপে। পাহাড় কাটার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এপিক প্রপার্টিজ, স্যানমার প্রপার্টিজ, সিপিডিএলসহ বহু আবাসন প্রতিষ্ঠান। এমনকি চউক ও চসিক কাউন্সিলররাও পাহাড় কাটার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোন রকম আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কোনকালেও। ফলে একের পর এক সাবাড় হচ্ছে চট্টগ্রামের পাহাড়।

স্থানীয়দের বর্ণনামতে, নগরীর চকবাজার থানার চট্টগ্রাম কলেজ রোড সংলগ্ন পার্সিভ্যাল হিল কেটে ১২ তলা ভবন তৈরী করেছে এপিক প্রপার্টিজ। ভবনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এপিক ভূঁইয়া এম্পেরিয়াম’। এভাবে পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করায় আবাসন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদফতর। মামলাটি এখনও আদালতে বিচারাধীন। এরই মধ্যে গোপনে নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছে তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবর পার্সিভ্যাল হিল নামের পাহাড়টি কাটার দায়ে এপিক প্রপার্টিজকে ৯৬ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদফতর। ২০২১ সালের ১৭ জুলাই পাহাড় কাটার সময় এপিক প্রপার্টিজের চার শ্রমিককে আটক করে পুলিশ। আটক শ্রমিকরা এপিক ভূঁইয়া এম্পেরিয়াম ভবনের নির্মাণকাজে নিয়োজিত ছিলেন। তখন তাদের বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় মামলা করা হয়। পরে পার্সিভ্যাল হিল কেটে এপিক প্রপার্টিজের বহুতল ভবন নির্মাণ মামলার তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে পাঁচজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন।

মামলার এহাজারভুক্ত আসামিরা হলেন- চকবাজার থানার পার্সিভ্যাল হিল এলাকার মৃত খায়ের উল্লাহ ভূঁইয়ার ছেলে খোরশেদ আলম ভূঁইয়া, নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর এলাকার মোহাম্মদ নেছার আলীর ছেলে মো. বকুল আলী, নগরীর চান্দগাঁও থানার হামিদচর এলাকার মো. তাইজ উদ্দিনের ছেলে মো. আশরাফুল ইসলাম মিন্টু, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার তেঁতুলিয়া পূর্বপাড়া এলাকার মো. শহিদুল ইসলাম প্রামাণিকের ছেলে মো. সজীব ইসলাম ও মহাদেবপুর উপজেলার চান্দনাইশ গ্রামের মৃত কলিম উদ্দিনের ছেলে মো. রবিউল।

পাহাড় কেটে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করায় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ১২, ৪(১), (২) ও ১৫ (১) এর ক্রমিক ১ ও ৫ নম্বর ধারা লঙ্ঘনের অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে চারজনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২১ সালের ১৭ জুলাই চকবাজার থানার কাশিমবাজার মৌজার বিএস খতিয়ান নং-৪১/৬, বিএস দাগ নং-২৮৮ (অংশ), ২৮৯ (অংশ) ও ২১১(অংশ)-এর পার্সিভ্যাল হিল এলাকায় পাহাড় কাটার স্থান পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শক মনির হোসেন। পাহাড় কাটার সময় চার শ্রমিককে আটক করা হয়। পরে পরিবেশ অধিদফতর মহানগর কার্যালয়ের পরিচালকের নির্দেশে আবারও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পরিদর্শক মনির। ওই সময় তদন্তে দুই হাজার ৪০০ ঘনফুট পাহাড় খোরশেদ আলম ভূঁইয়ার নির্দেশে কাটা হয় বলে প্রমাণ পান পরিদর্শক। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, চকবাজার এলাকার পার্সিভ্যাল হিল ভূ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও অক্সিজেনের আধার। অথচ এসবের ক্ষতি করে পরিবেশ অধিদফতরের শর্ত ভেঙে বহুতল ভবন করছে এপিক প্রপার্টিজ।

চট্টগ্রাম পরিবেশ আদালতের বেঞ্চ সহকারী আলাউদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন। এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছে। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।’

এপিক প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের অভিযোগ আছে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার লিংক রোডের আরেফিন নগর এলাকায় পাহাড় কেটে ‘এপিক রেডিমিক্স কনক্রিট’ নামে কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে।

মামলার পরও পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের বিষয়ে এপিক প্রপার্টিজের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, ‘পার্সিভ্যাল হিলের জমিটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। পরিবেশ অধিদফতর মামলা দিয়েছে। আদালতে মামলা বিচারাধীন। আদালত কাজ বন্ধ রাখার কোনও নির্দেশনা দেননি। যার কারণে ভবনের নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছি আমরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নগরীতে ভবন নির্মাণের দেখভাল করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সংস্থাটি আমাদের ভবনের অনুমোদন দিয়েছে। তাদের অনুমোদন নিয়েই আমরা ভবন নির্মাণ করছি।’

অন্যদিকে নগরীর এসএস সাইফুদ্দিন খালেদ সড়কের আসকার দীঘির পাড়ের কাছে গ্রিনল্যাজ পাহাড়ের সামনের পাহাড়টির অনেকখানি কাটা হয়েছে। সেখানে ২২ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি চেয়েছিলেন ভূমির মালিক। এবিসি টাওয়ার আর মিশন গ্রুপের ভবনের মাঝখানে ১৫ কাঠা পাহাড়ি ভূমিটি গোপনে কেটেছিল মালিকপক্ষ।

২০২০ সালের ১ জুন পরিবেশ অধিদপ্তরের ওই অভিযানে ভূমির মালিক সনজিত দত্তকে জরিমানা করে। এরপর সড়ক বা আশপাশের এলাকা থেকে যাতে ওই পাহাড়ি ভূমি দেখা না যায়, সে জন্য সড়কের পাশে উঁচু করে টিনের ঘেরা দেওয়া হয়। এখন সেখানে ভবন তৈরির কাজ চলছে। অভিযোগ আছে, মোটা অঙ্কের টাকায় সিডিএ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে পাহাড়ি ভূমিতে আবাসিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন পেয়েছেন মালিক। ১৫ তলা ভবনের ছাড়পত্র দিয়েছে বিশেষ কমিটি।

জানা গেছে, সিডিএর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ওই পাহাড়ি ভূমিতে ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সুযোগ নেই। তবে ‘নগর উন্নয়ন কমিটি’ চাইলেই অনুমোদন দিতে পারে। সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্রসহ চারটি শর্তে নগর কমিটি ছাড়পত্র দিয়েছে। পরিবেশ রক্ষা করে ভবন নির্মাণের শর্তে ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর; এরপর বিশেষ কমিটি ছাড়পত্র দেয়। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি এবং নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ১৫ তলার বেশি অনুমোদন পাবে না।

নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন আরেফিননগর বাজারে বাইপাস রোডের দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড় কেটে ২৬ তলা ভবন নির্মাণ করছে স্যানমার প্রপার্টিজ। প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে মহানগর সমিতির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের ভিত্তিতে। প্রকল্পের প্ল্যান দেখিয়ে ২০১৬ সালে প্রতি বর্গফুট কমপক্ষে ৬ হাজার টাকা মূল্যে ফ্ল্যাট বিক্রি শুরু করে স্যানমার প্রপার্টিজ। গ্রাহকদেরও রাখা হয় অন্ধকারে। তবে পাহাড় কাটা নিয়ে স্থানীয়রা আপত্তি তোলার পরই শুরু হয় বিপত্তি। পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরে আসে বিষয়টি। এরপর সেখানে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার সত্যতা পাওয়া যায়। বর্তমানে স্যানমার প্রপার্টিজের ‘স্যানমার গ্রিন পার্ক’ শীর্ষক প্রকল্পের স্থানে পাহাড় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যদিও স্যানমার প্রপার্টিজ এরই মধ্যে প্রকল্পটির বেশির ভাগ ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছে।

স্যানমার প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের এটিই একমাত্র অভিযোগ নয়। উত্তর খুলশী থানার ইম্পেরিয়াল হিলের ১০৯/সি নং প্লটের ৪ নম্বর রোডে ছয়তলার অনুমতি নিয়ে ১২ তলা ভবন নির্মাণেরও অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এ প্রকল্পেও ফ্ল্যাট কেনাবেচা চলমান রয়েছে। খুলশীর স্থানীয় ১১ জন বাসিন্দার পক্ষে এ নিয়ে স্যানমারের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন আলম।

মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে, স্যানমার গ্রানডি নামের উঁচু ভবনটি নির্মাণ করতে গিয়ে এরই মধ্যে প্রায় ৬০ ফুট পাহাড় কেটেছে স্যানমার। ওই স্থানে এখন আর পাহাড়ের চিহ্ন নেই। ভবনটি তৈরি করতে গিয়ে ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২-এর ১২ ধারা এবং সিডিএ আইন ২০১৮-এর ৪৪ ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এছাড়া সেখানে যান চলাচলের জন্য প্রশস্ত কোনো সড়কও নেই। ফলে ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ড বা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে উদ্ধার তৎপরতা চালানোও বেশ দুষ্কর হয়ে পড়বে।

এছাড়া নগরীর ষোলশহরে ডানকান হিলের পাদদেশে মাটি কেটে উঁচু ভবন নির্মাণেরও পরিকল্পনা নিয়েছিল স্যানমার। স্থানীয় ২৪ বাসিন্দা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের কাছে স্যানমারের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার অভিযোগ আনার পর বেকায়দায় পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্প এলাকায় এরই মধ্যে অসংখ্য গাছ কেটে ফেলার অভিযোগও উঠেছে।

প্রকল্পটির ব্যাপারে সিডিএর বক্তব্য হলো ২০১৩ সালে ডানকান হিলে ২৫ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তবে অনুমোদনের তিন বছরেও কাজ শুরু না হওয়ায় সেটি বাতিল হয়ে যায়। পরে আর অনুমোদন দেয়া হয়নি। ডানকান হিল এলাকায় পাহাড় ও গাছ কাটা এবং বহুতল ভবন নির্মাণসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

স্যানমার প্রপার্টিজের অপারেশনাল ডিরেক্টর এহসানুল বারী বলেন, স্যানমার গ্রিন পার্ক প্রকল্পে বেজমেন্টসহ কাজ করতে গিয়ে পাহাড়ের হয়তো কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এখানে এক হাজার বর্গফুটের ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তি আছে। আমরা সেটা মেনেও নিয়েছি। আর স্যানমার গ্রানডি নামের প্রকল্পে সিডিএ যেভাবে অনুমোদন দিয়েছে, তার বাইরে কিছু করছি না। এছাড়া ষোলশহর বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডানকান হিলের প্রকল্পটি আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এটা নিয়ে এখনই কিছু বলার মতো নেই।

এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ এলাকায় পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে রূপনগর আবাসিক এলাকা। এখানে দুটি স্থানে পাহাড় কাটা হয়েছে। আকবর শাহ থানার পূর্ব ফিরোজ শাহ নাছিয়া ঘোনা ১ নম্বর ঝিলে পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে গাউসিয়া লেকসিটি নিউ আবাসিক এলাকা। এখানে অভিযান চালাতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে পরীর পাহাড়ে আইনজীবী সমিতির পাঁচ ভবনের নকশা কী করে অনুমোদন দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে এর ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিয়েছে গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়। ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর দেয়া উক্ত চিঠিতে পরীর পাহাড় থেকে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ব্যাপারে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়। একই চিঠিতে জমির স্বত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা কোন সংস্থার নেই বলেও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

পাহাড়ে শুধু ভবন অনুমোদন দেওয়া হয়, ১৫টি পাহাড় কেটে নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কটি নির্মাণ করে সিডিএ। এই পাহাড় কাটার জন্য সিডিএকে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০১৫-১৬ সালে এই সড়ক নির্মাণ শুরু হয়।

পাহাড় কাটা বন্ধ করতে না পারা ও বসতি বেড়ে যাওয়ার দায় জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নিতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নদীদূষণ হলে দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যাবে। কিন্তু পাহাড় ধ্বংস করা হলে কেউ বানাতে পারবে না। কিন্তু চট্টগ্রামে আশঙ্কাজনক হারে পাহাড় কাটা ও বসতি দুটোই বাড়ছে।

একটি গবেষণার বরাত দিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘২০০৮ সাল পর্যন্ত ছোট-বড় ১২০টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুধু পাঁচলাইশ এলাকায় ৭৪ শতাংশ পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। আকবরশাহ এলাকায় একজন জনপ্রতিনিধি (জহুরুল আলম ওরফে জসিম) নির্বিচারে পাহাড় কেটে যাচ্ছে। আশা করি মেয়র মহোদয় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।’

গত ১১ জুন চট্টগ্রামের একটি হোটেলে নগরের পাহাড় কাটা রোধে এক মতবিনিময় সভায় পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক অভিযোগ করেন, এমন কিছু পাহাড় রয়েছে, যেখানে সিডিএ ভবন তৈরির নকশা অনুমোদন করেছে। এ কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাহাড় রক্ষার মামলা বা উদ্যোগ হালকা হয়ে যায়।

অভিযোগের জবাবে তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম বলেন, তিনটি কমিটির মাধ্যমে নকশা অনুমোদন দেয় সিডিএ। এর মধ্যে অথরাইজেশন কমিটি একটি। এরপর কিছুটা জটিল হলে তা বিশেষ কমিটির কাছে যায়। যেগুলো ঝামেলাপূর্ণ, সেগুলো অনুমোদনের জন্য নগর উন্নয়ন কমিটিতে যায়। তবে জনবলের অভাবে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়।

বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বান্দরবান-রাঙামাটির পাহাড় অনেক উঁচু। সেখানে পাহাড়ের ওপর রাস্তা হয়েছে। এখানে তো অত উঁচু ছিল না। তাহলে কেন আমরা চিন্তা করলাম না। ব্যক্তির উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে আমরা পাহাড় কেটে রাস্তা করেছি। আমরা একটা পাহাড় নির্মাণ করতে পারব না।’

মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত কোনো প্রভাবশালীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে, আমি তাঁকে বাঁচাতে চাই, এই চিন্তা বাদ দিতে হবে। পাহাড় কাটার ব্যাপারে যদি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেখানে সবার আগে আমি থাকব। তবে সব দপ্তরের প্রধানদের নিয়ে এই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আজকের সভায় সব দপ্তরের প্রধানেরা এলে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হতো। প্রতিনিধি দিয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।’

বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি দিয়ে কখনো প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করা যাবে না। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। সরকার পাহাড়ে বসতি উচ্ছেদ করে বলে জানায়, কিন্তু সরকার নিজে যখন পাহাড় কাটে, তখন মানুষ আর সরকারি সংস্থার ওপর ভরসা রাখতে পারে না।

ঈশান/খম/সুম

সম্পর্কিত আরো খবর

জনপ্রিয়

error: Content is protected !!