বদলির শেষ মুহুর্তেও ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসি-ল্যান্ড) ও রাঙ্গুনিয়া পৌর প্রশাসক দেবব্রত দাশ। তার বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ। তার এই অপকর্মের সহযোগী ছিলেন রাঙ্গুনিয়া ভুমি অফিসের অফিস সহকারী সুভাস বসু তঞ্চাঙ্গ্যা। দূর্নীতির অর্থে চট্টগ্রাম শহরে তিনি বিলাসী জীবনযাপন করছেন।
এমন অভিযোগ তুলেছেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশ ও অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যার নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির শিকার ভুক্তভোগী জনগণ। যারা ভুমিসংক্রান্ত কাজের ভয়ে এতদিন মুখ খোলার সাহস করেনি। বদলি হয়ে তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ ভুমি অফিসে যোগদানের পর ভুক্তভোগীরা ক্রমেই মুখ খোলতে শুরু করেছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশ ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসে যোগদানের পর থেকে ভুমি সমস্যা নিরসনে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ভুমির নামজারিসহ বিভিন্ন ভুমি সেবার কাজ তিনি লাখ টাকা ছাড়া করতেন না। যার কাছ থেকে টাকা পেতেন তার পক্ষে কাজ করতেন। এক্ষেত্রে একজনের জমি অন্যজনের নামে নামজারি করে দিয়ে পারবারিক ও সামাজিক বিরোধ সৃষ্টি করেছেন। তার এ কাজে সহযোগীতায় ছিলেন ভুমি অফিসের অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যা।
যার থেকে ভুমি সংক্রান্ত খতিয়ান ও নকল সংগ্রহে ৫০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করতেন। টাকা না পেলে কোন রকম কাজ করতেন না সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যা। নামজারির ক্ষেত্রে বিগত সময়ে তিনি এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশের ক্যাশিয়ার হিসেবে লাখ লাখ টাকা গ্রহণ করতেন। বলতেন চুক্তি ছাড়া নামজারি ফাইলে স্যার স্বাক্ষর করে না। এমন একটি অডিও রেকর্ড বর্তমানে দৈনিক ঈশান অফিসে সংরক্ষিত রয়েছে।
এভাবে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ভুমি মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশ ও অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যা। শুধু তাই নয়, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমান আদালতের নামে অভিযান চালাতে গিয়ে বিভিন্ন কলাকৌশলেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন এই অসাধু চক্র। হাতিয়েছেন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টাকাও। সরকারি বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন থেকেও হাতিয়েছেন বিপুল অর্থ। সম্প্রতি বদলি হওয়ার শেষ মুহুর্তেও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ভুমি অফিসের পুরাতন ভবন সংস্কারের নামে বরাদ্দকৃত ১৫ লাখ টাকাও হাতিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি।
সূত্র জানায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা, পদুয়া, শিলক, রানির হাট ও টিসির হাট ভুমি অফিসের পুরাতন ও জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের নামে ৩ লাখ টাকা করে মোট ১৫ লাখ টাকা অনুমোদন দেন এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশ। কিন্তু সেই কাজের কোনটিরই কোন কাজ হয়নি। এমনকি বরাদ্দের অর্থ বা চিঠি কোনটাই পাননি ভবনগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, এই ৫ ইউনিয়ন ভুমি অফিস ভবনের মধ্যে শিলক ইউনিয়ন ভুমি অফিস ছাড়া সবগুলো ভবনই নতুন। যেখানে সংস্কারের কিছুই নেই। এর সত্যতাও উঠে এসেছে ইউনিয়ন ভুমি অফিসে কর্মরতদের কথায়। এর মধ্যে জানতে চাইলে পোমরা ইউনিয়ন ভুমি অফিসের তহশীলদার ইমরান রাজীব বলেন, ভবন সংস্কারের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তাছাড়া আমাদের ভবন একদম নতুন। মাত্র এক মাস আগে এই নতুন ভবনে আমরা কাজ শুরু করেছি। এখানে তো সংস্কারের কিছুই নেই। এ বিষয়ে এসি ল্যান্ডের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
একই কথা বলেছেন রানীর হাট ইউনিয়ন ভুমি অফিসের তহশীলদার মোজাহেরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভবন সংস্কারের কোন বরাদ্দ আমরা পায়নি। এ সংক্রান্ত কোন চিঠিও আমাদের কাছে আসেনি। তাছাড়া আমাদের ভবন নতুন। মাত্র কয়েকবছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে তো সংস্কারের কিছু নেই।
একই কথা বলেছেন পদুয়া ইউনিয়ন ভুমি অফিস ও টিসির হাট ভুমি অফিসে কর্মরতরাও। একটু ভিন্ন কথা জানিয়েছেন শিলক ভুমি অফিসের তহশীলদার গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেন, ভবন সংস্কারের জন্য ৩ লাখ টাকা করে বরাদ্দের বিষয়ে আমি জেনেছি। বদলি হওয়ার শেষ মুহুর্তে আমি এসি ল্যান্ড স্যার দেবব্রত দাশের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছি।
তিনি আমাকে বলেছিলেন, ভবন সংস্কারের বরাদ্দের ওই টাকা আমাকে দেয়া হবে। কিন্তু তিনি বদলি হলেও এখনও টাকা বরাদ্দ পায়নি। পাব আশা করছি। তবে স্যার বদলি হওয়ার আগে আমার অফিসে একটি আইপিএস কিনে দিয়ে গেছেন। যার মূল্য প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। সম্ভবত বরাদ্দকৃত ৩ লাখ টাকা থেকে এই টাকা দিয়েছেন স্যার।
ভুমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, ওই টাকা উপজেলার ৫টি ভুমি অফিস ভবনের সংস্কারের নামে দেখিয়ে কোন কাজ ছাড়াই হাতিয়ে নিয়ে গেছেন এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশ। এই টাকা উত্তোলনে অফিসিয়াল কাগজপত্র কারসাজিতে সহযোগীতা করেছেন ভুমি অফিসের অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যা। ফাইলের কাগজপত্রে তার স্বাক্ষরও রয়েছে। সহযোগীতার জন্য তিনি ভাগও পেয়েছেন। এভাবে দূর্নীতির টাকায় সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যা চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট কিনে বিলাসী জীবন যাপন করছেন বলে জানান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার প্রশাসক হিসেবেও নিয়োগ পান এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশ। এ সুযোগ পেয়ে সেখানেও ভুমি অফিসের মতো বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা হাতিয়েছেন তিনি। পৌরসভায় তার সহযোগী ছিলেন সচিব আল হেলাল, প্রকৌশলী জমির উদ্দিন ও হিসাব রক্ষক মো. এরশাদ।
সূত্র মতে, বদলি হওয়ার মাত্র কয়েক মাস আগে সৈয়দবাড়ি পৌর এলাকায় কথিত বিএনপি নেতার বসতবাড়িতে যাতায়াতের সড়ক নির্মানের জন্য ১৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেন। আর ওই কাজ হাতে পান পৌরসভা বিএনপির এক নেতা। যার সহযোগীতায় মাত্র দেড় লাখ টাকার মাটি ভরাটের কাজ করে পুরো টাকা আত্নসাৎ করে ভাগবাটোয়ারা করেন এই চক্র। এভাবে রাঙ্গুনিয়াকে তিনি দূর্নীতির তীর্থস্থানে পরিণত করেন। যা এর আগে কোন এসি ল্যান্ড করেননি।
এ বিষয়ে জানতে এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। রাঙ্গৃুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসের অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যাও প্রথমে কিছুই জানেন না বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দের কাজে তার স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে এসি ল্যান্ড স্যারের সাথে কথা বলে বিষয়টি আপনাকে জানাচ্ছি। এ কথা বলে তিনি ফোন সংযোগ কেটে দেন। এরপর তিনি আর কিছুই জানাননি।
এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া ভুমি অফিসে সদ্য যোগদান করা এসি ল্যান্ড খন্দকার ফারজানা নাজনীন সেতুর মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যোগদান করেছি সবে মাত্র। এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। যেসব ইউনিয়ন ভুমি অফিসের ভবন সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দের কথা বলছেন সেসব ভুমি অফিস ভিজিট করে এবং কাগজপত্র দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
(বি: দ্র: রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসের নানা অনিয়ম ও দূর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে দৈনিক ঈশান। দ্বিতীয় পর্বে সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যার অপকর্ম নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন আসছে। প্রিয় পাঠক চোখ রাখুন দৈনিক ঈশানের অনলাইন ও প্রিন্ট ভার্সনে।)