রেলের চায়না বগি ক্রয়ে ডিজি আফজালের ২০০ কোটি ধান্ধা!
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে পদ্মা রেললিংক প্রকল্পের অধীনে ১০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহি ক্যারেজ বা বগি কেনা হয় চীন থেকে, যা খুবই নিম্নমানের। কিন্তু এই বগি কেনা হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের এযাবৎ কালের সবচেয়ে উচ্চ দামে। নেপথ্যে লুট হয় ২০০ কোটি টাকা। যার মূলে রেলওয়ের বর্তমান ডিজি আফজাল হোসেন।যার সত্যতা উঠে এসেছে রেলওয়ের অডিট আপত্তিতেও। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের অভিযোগেও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এই কারসাজির মুলে বাংলাদেশ রেলওয়ে তৎকালীন পরিচালক ও বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) জড়িত। তাঁকে সহায়তা করেন রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার।এতে লাভবান হন প্রাক্তন ডিজি আমজাদ হোসেন, ডি এন মজুমদারও। এমন তথ্য ফাঁস করেছেন রেলওয়ের কয়েকজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তাদের মতে, বাংলাদেশ সরকারের ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করে এ ধরনের প্রকল্পের মালামাল কেনার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি।বরং ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে খ্যাত আফজাল হোসেন প্রভাব খাটিয়ে নিম্নমানের বগি অতি উচ্চ দামে ক্রয় দেখিয়ে ২০০ কোটি আত্নসাৎ করেছেন। এর সত্যতার তথ্য মেলে বাংলাদেশ রেলওয়ের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি-আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দিনের কথায়ও।তিনি বলেন, ২০২২-২৩ সালে ১০০ বগি কেনা হয় চায়না থেকে। আবার ২০২৫ সালে ইন্ডিয়া থেকেও কেনা হয় ২০০ বগি। যার প্রথম চালানের ২০ বগি আসছে বাংলাদেশে। কিন্তু ২০২২-২৩ সালে চায়না থেকে কেনা বগির সাথে ইন্ডিয়ান বগির বিশাল দামের ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া ইন্ডিয়ান বগির তুলনায় চায়না বগি অত্যন্ত নিম্নমানের।তিনি আরও বলেন, ইন্ডিয়া থেকে কেনা বগির তুলনায় চায়না থেকে কেনা বগি প্রায় ২০০ কোটি টাকা বেশী দাম দিয়ে কেনা হয়েছে। অথচ চায়না থেকে কেনা বগির দাম অনেক কম হওয়ার কথা। কিন্তু কেনা হয় অতি উচ্চ দামে। এতে সিন্ডিকেট লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বাংলাদেশ সরকার।সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২-২৩ সালে কেনা চায়না ১০০ বগির প্রতিটি যাত্রীবাহী বিজি শোভন চেয়ার কার (ডব্লিউইসি) বগির দাম পরে- ৫৭,৮৩৮২ ইউএস ডলার। একই বগি ২০২৫ সালে ইন্টারিম সরকারের আমলে ইন্ডিয়া থেকে কেনা প্রতিটি বগির বিজি শোভন চেয়ার কার (ডব্লিউইসি) কেনা হয় ৩,১২০০০ ইউএস ডলার দামে। ইন্ডিয়ান বগির চেয়ে ২৮.২৮১৫ ডলার বেশি দেয়া হয় চায়না বগিতে!! আবার ইন্ডিয়ান বগির চেয়ে চায়না বগি খুবই নিম্নমানের।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, বগিগুলোর দাম যেমনি অতি উচ্চ, তেমনি গুণগত মানও বেশ খারাপ। অতি অল্প সময়ে বগিগুলোর চাকা নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও আওয়ামী সরকারের দোসর হওয়ার সুবিধার্থে বিশেষ ক্ষমতা বলে যাত্রীসুবিধা হ্রাস করে লাগেজ ভ্যান ব্যবহার না করে যাত্রীবাহী সচল ট্রেনের চাকা খুলে নিম্নমানের চায়না বগিতে ব্যবহার করে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়েছে।ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, দুর্নীতি করার উদ্দেশ্যে বগি ক্রয়ে পৃথক প্রকল্প না নিয়ে প্রকৌশল বিভাগের প্রকল্পের মাধ্যমে স্বল্প মুল্যের আইটেমের মতো করে ১০০টি বগি কেনা হয়। এতে প্রাক্তন ডিজি আমজাদ হোসেন, ডি এন মজুমদারও আর্থিকভাবে বিপুল লাভবান হয়েছেন।বর্তমান ডিজি আফজাল হোসেন প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে কৌশলে চায়না প্রতিষ্ঠানের সাথে পাতানো টেন্ডার করে এযাবৎ কালের সর্বোচ্চ দামে নিম্নমানের চায়না কোচ কেনেন। বিপুল কারসাজির মাধ্যমে এগুলো কিনতে গিয়ে তিনি প্রাক্তন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন ও তৎকালীন ডিজির মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করেন রোলিং স্টক বিভাগকে ব্যবহার করে।সেই সাথে পদ্মা রেলসেতু প্রকল্পের আওয়ামী সিন্ডিকেটের সব তথ্য অতি গোপনীয়তার সাথে রক্ষার লক্ষ্যে আফজাল হোসেনকে ডিজি পদে প্রমোশনের রাস্তাও তৈরি করে দেন তৎকালীন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। নেপথ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার তাঁকে সহায়তা করেন। ফলে আওয়ামী সরকারের পতন হলেও তাদের দোসর রেলওয়ে ডিজি আফজাল হোসেনের ক্ষমতা এখনো অক্ষত রয়ে যায়।আওয়ামী স্বার্থ সংরক্ষণকারী এ কর্মকর্তা (ডিজি) বর্তমানে তার অনুসারী কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন নেতাকর্মীকে ব্যবহার করেছেন বলে জানা যায়। এসব বিষয়ে জানতে রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব বগি কেনার চুক্তিপত্রের সাথে জড়িত নন বলে দাবি করেন।সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) স¤পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এত বড় দুূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তা দুূর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত করে দেখা দরকার। একই সঙ্গে জবাবদিহিতার স্বার্থে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তরফ থেকেও তদন্ত হওয়া উচিত।রেলভবনের কয়েকজন কর্মকর্তার প্রত্যাশা, দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান নির্বাচিত সরকার নিশ্চয়ই এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের ব্যবস্থা নেবে। তারা রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তারা আরো বলেন, দুর্নীতি যেই করুক, তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা জরুরী।এ সংক্রান্ত আরও : -ডিজি আফজালের দূর্নীতির ছায়া পুরো রেলে!!রেল লুটছে রেল কর্মকর্তারাই,শীর্ষে ডিজি আফজাল হোসেন!রেলের সর্বনাশ হচ্ছে যেসব কারণে!