রেলওয়ের স্পেয়ার পার্টস ক্রয়ে ‘সার্ভিস কন্ট্রাক্ট’ বানিজ্য
বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০২০ সালে ক্রয়কৃত বহুল আলোচিত ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) স্পেয়ার পার্টস বা মালামাল ক্রয়ে ‘সার্ভিস কন্ট্রাক্ট’ বানিজ্য চলছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে ¯েপয়ার্স এন্ড এক্সেসরিজ সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশন (বারেসাএসাএ)। তাদের দাবি, প্রচলিত উম্মুক্ত দরপত্র বা তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট একটি সরবরাহকারীর সাথে ‘সার্ভিস কন্ট্রাক্ট’ রেলের স্বার্থ বিরোধী ও নিয়ম-নীতির লংঘন। আর এই ষড়যন্ত্রের মুলে রয়েছে শেখ রেহানার সহযোগী প্রতিষ্ঠান দেশ ইন্টারন্যাশনাল। আর এই প্ল্যান বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে ফ্যাসিস্ট সরকারের নিয়োজিত আমলারা। এ বিষয়ে নজর দেওয়ার আকুতি জানিয়ে গত বুধবার (১২ আগস্ট) রেলপথ মন্ত্রীর বরাবরে একটি আবেদন প্রেরণ করেছেন ঠিকাদার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারেসাএসাএ‘র দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে আবেদনের এই কপি গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেছেন তারা। আবেদনের তথ্যমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্রয়কৃত বহুল আলোচিত ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) স্পেয়ার পার্টস বা মালামাল লোকোমোটিভ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান লোকো বিল্ডার্স এর লোকাল এজেন্ট শেখ রেহানার সহযোগী প্রতিষ্ঠান দেশ ইন্টারন্যানাল এর মাধ্যমে ক্রয় করা হয়। যার ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষ হয় আরও তিন বছর আগে। এই সময়ে ক্রয়কৃত লোকোমোটিভের মেইনটেনেন্স ও স্পেয়ার পার্টস প্রদানের চুক্তি লংঘন করেছে প্রতিষ্ঠানটি লোকো বিল্ডার্স। এ নিয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি শেখ রেহানার সহযোগী প্রতিষ্ঠান দেশ ইন্টারন্যাশনাল।সরকার পতনের পর ইন্টেরিম সরকারের সময় স্বার্থান্বেষী মহলের অতি উৎসাহে লোকো বিল্ডার্সের সাথে সার্ভিস কন্ট্রাক্ট কনসেপ্ট প্রস্তাবনা দেয়া হয়। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট দাখিলকৃত প্রস্তাবনার আইএফই নং-৫৪.০১.১৫৪৩.৪৫৫.০৭.০৩৭.২৪, যার খোলার তারিখ ছিল ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর, সেই থেকে সাত বার পেছানোর পরও ডিজেল স্পেয়ার্স এনলিষ্টমেন্ট টেন্ডার নিষ্পত্তি এখনো শেষ করা হয় নাই। এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছেন ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় নিয়োজিত রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট আমলারা। যা পেতে কলকাঠি নাড়ছেন লোকোমোটিভ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান লোকো বিল্ডার্স এর লোকাল এজেন্ট দেশ ইন্টারন্যাশনাল। ঠিকাদারদের প্রশ্ন, বিষয়টি কেন নিষ্পত্তি করা হচ্ছে না এবং কার স্বার্থে এই প্রক্রিয়া ধরে রাখা হয়েছে? মালামাল সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রিতা ঠিকাদাররা জানান, ২০২০ সালে সংগৃহীত ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ওয়ারেন্টি পিরিয়ড উত্তীর্ণ হওয়ার প্রায় ৩ বছর পরও লোকো বিল্ডার্সকে ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের স্পেয়ার পার্টস একচেটিয়া সরবরাহ সুবিধা দেয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যথাসময়ে মালামাল সংগ্রহ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের প্রায় ৭০ ভাগ অচল হয়ে পড়েছে। এতে যাত্রীবাহী গাড়ী চলাচল ঝুঁকিতে পড়ছে প্রতিনিয়ত। অথচ জরুরি মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মালামাল ক্রয় করলে ২-৩ মাসের মধ্যে যন্ত্রাংশ সরবরাহ পাওয়া যায়। যা বাংলাদেশ রেলওয়েকে সচল রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিকট অতীতে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২৬০০, ২৭০০, ২৯০০, ৬২০০, ৬৩০০, ৬৪০০, ৬৫০০ সিরিজের মালামাল ক্রয় করে গাড়ী চলাচল সচল রেখেছে। তাই ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের ক্ষেত্রেও তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যন্ত্রাংশ ক্রয় প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলে ইঞ্জিন আউটর্টানের সংকট কেটে যাবে। সার্ভিস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের মেইনটেনেন্স এর দায়িত্ব দিলে এবং রেলওয়ের যন্ত্র প্রকৌশলী বিভাগের সাথে একটা সাংঘর্ষিক অবস্থার তৈরি হবে এবং রেলওয়ের দক্ষ জনবল এ সিরিজের লোকোমোটিভ মেরামতের জ্ঞান লাভ থেকে বঞ্চিত হতে পারে যা রেলওয়ের জন্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বঞ্চিত নিবন্ধিত সরবরাহকারীর অংশগ্রহণ লোকো বিল্ডার্স ও আমলাদের কারসাজিতে প্রচলিত তালিকাভুক্ত নিবন্ধিত সরবরাহকারী ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। প্রতিযোগিতা না থাকায় নির্দিষ্ট প্রস্তÍতকারক বা সাপ্লাইয়ার্স একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে। এতে রেলওয়ের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কারণ লোকো বিল্ডার্স নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ ব্যাতিত অধিকাংশ যন্ত্রাংশই তাদের কিছু মনোনীত উৎস হইতে সংগ্রহ করে থাকে। আর বাংলাদেশ রেলওয়ে সাধারণত দীর্ঘদিন থেকে তার তালিকাভুক্ত বৈদেশিক সরবরাহকারী এবং তাদের স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে উম্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ভিত্তিতে ইঞ্জিনের বিভিন্ন স্টক ও নন-স্টক মালামাল সমূহ সংগ্রহ করে থাকে। বিশেষ করে মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল সেকশনের প্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয়ে আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী এবং তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশ নেয়। নন-স্টক স্পেয়ার পার্টসের ক্ষেত্রে সকল প্রস্তÍতকারক ও তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দরপত্র আহান করে সর্বনিম্ন দরদাতা ও মানসম্পন্ন উৎস নির্বাচন করাসহ সকল তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের মধ্যে অবারিত প্রতিযোগিতার ফলে সঠিক সময়ে সঠিক মান নিশ্চিত করে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ করে, যা রেলওয়ের বাজেটের ওপর চাপ কমায়।পিপিআরের সাথেও সাংঘর্ষিক সরকারি অর্থ ব্যয় করে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবারিত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া একক উৎস হতে দরপত্র এর মাধ্যমে কেবল নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে লং-টার্ম সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করা সরকারি ক্রয় আইন ও ক্রয় বিধিমালার (পিপিআর) মূল চেতনার সম্পূর্ন পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক। প্রতিযোগিতাহীন সার্ভিস কন্ট্রাক্টে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ ও মালামালের দাম নির্ধারণ করতে পারে। এতে রেলওয়ের পরিচালন ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে স্থানীয় বাজারের ক্ষতি, দেশীয় প্রতিনিধি ও স্থানীয় সাপ্লাইয়ার্সদের অবমূল্যায়ন, দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়েতে সেবা দেওয়া নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ, নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি, দীর্ঘদিন নিদিষ্ট কোন বিল্ডারের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল থাকা, ভবিষ্যতে দর কষাকষির সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এককথায় অদুর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ রেলওয়ে লোকো বিল্ডার্স এর কাছে জিম্মি হয়ে যাবে।উল্লেখ্য, লোকো বিল্ডার্স রেলগাড়ির ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ তৈরি করে (যেমন-আলকো, জিএম-ইএমডি বা বিভিন্ন দেশের রেলওয়ে উৎপাদন কারখানা) তবে প্রতিষ্ঠানটি নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ ব্যাতিত অধিকাংশ যন্ত্রাংশই তাদের কিছু মনোনীত উৎস হইতে সংগ্রহ করে থাকে। তাদের বাংলাদেশ এজেন্ট হচ্ছে শেখ রেহানার সহযোগী প্রতিষ্ঠান দেশ ইন্টারন্যাশনাল।আর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক টিও লাইসেন্স প্রাপ্ত বাংলাদেশ রেলওয়ে ¯েপয়ার্স এন্ড এক্সেসরিজ সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশন (বারেসাএসাএ) রেলওয়ের একমাত্র ব্যবসায়িক সংগঠন। যাহা বাংলাদেশের ব্যবসায়িদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই জিআই এ ক্লাস এসোসিয়েশন। এই সংগঠন সমগ্র বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম জোনের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রায় ১৫০০ সরবরাহকারীর প্রতিনিধিত্ব করে। এই সংগঠনের সদস্যরা বাংলাদেশ রেলওয়েকে সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার দেশীয়, বৈদেশিক যন্ত্রাংশ (ডিজেল ইঞ্জিন, কোচ ও ওয়াগণের অন্যান্য) চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ করে থাকে। একই সাথে বাংলাদেশ রেলওয়ে ¯েপয়ার্স এন্ড এক্সেসরিজ সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশন এর মাধ্যমে রেলওয়ের সরবরাহকারীদের বিভিন্ন যৌক্তিক সমস্যা সমাধানে ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করে বলে জানান সংগঠনটির সভাপতি ফেরদৌস হুদা চৌধুরী। তিনি বলেন, বারেসাএসাএ সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে গত কয়েক মাস আগে রেলপথ মন্ত্রীর বরাবরে স্বারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। যার অনুলিপি রেল প্রতিমন্ত্রী, রেল সচিব, মহাপরিচালক বাংলাদেশ রেলওয়ে, অতি: মহাপরিচালক-আরএস, বাংলাদেশ রেলওয়ে, প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম বরাবরে প্রেরণ করা হয়েছে।রেলওয়ের এডিজি-আরএসের বক্তব্যজানতে চাইলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি-আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, লোকোমোটিভগুলো লোকো বিল্ডার্সের তৈরি। তারা ছাড়া এই লোকোমোটিভগুলোর স্পেয়ার পার্টস কেউ দিতে পারবে না। রেলওয়ে যাদের মাধ্যমে স্পেয়ার পার্টস সংগ্রহ করুক, লোকো বিল্ডার্স থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। তাই রেলওয়ে সরাসরি লোকো বিল্ডার্সের সাথেই সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করতে চাচ্ছে। এটা রেলওয়ের স্বার্থ বিরোধী নয়। বরং যারা এটার বিরোধীতা করছে, তারা তাদের ব্যক্তিগত ইন্টেরেষ্টের স্বার্থেই করছে। এক প্রশ্নের জবাবে এডিজি-আরএস বলেন, লোকো বিল্ডার্স ক্রয়চুক্তি মোতাবেক তাদের শর্ত পূরণ করেছে, মেইনটেনেন্সসহ অনেক স্পেয়ার পার্টস বিনামুলে সরবরাহ করেছে। বর্তমানে ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষ হওয়ায় স্পেয়ার পার্টস সংগ্রহের উদ্যাগ নেয়া হচ্ছে। যা রেলওয়ের আরও ২ বছর আগে নেওয়া দরকার ছিল। তা না হওয়ায় ৪-৫টি লোকোমোটিভ এখন অচল হয়ে পড়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশ ইন্টারন্যাশনাল লোকো বিল্ডার্সের লোকাল এজেন্ট। এজেন্ট ছাড়া লোকো বিল্ডার্স থেকে স্পেয়ার পার্টস ক্রয়ের কোন সুযোগ নেই। তবে ঠিকাদাররা যদি মন্ত্রী মহোদয়ের বরাবরে এ বিষয়ে আবেদন দিয়ে থাকেন, তাহলে মন্ত্রী মহোদয় স্পেয়ার পার্টস ক্রয়ে যে নির্দেশনা বা পদ্ধতি অনুসরণের জন্য বলবেন, সেভাবে অনুসরণ করা হবে। রেলওয়ে সরঞ্জাম বা বৈদেশিক কেনাকাটায় বিজ্ঞজনের অভিমত, রেলওয়ে একটি দূর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। যে যেভাবে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত, সে সেই অবস্থান থেকে কমিশন বানিজ্যে লিপ্ত। বর্তমান সরকার দূর্নীতির বিষয়ে কঠোর হওয়ায় রেলওয়ের বৈদেশিক কেনাকাটায় দেশীয় সাপ্লাইয়ার্সদের কাজ দিয়ে ঝুঁকি নিতে চান না সংশ্লিষ্টরা। সরাসরি বিদেশি প্রতিষ্টানের সাথে সার্ভিস কন্ট্রাক্টের সাথে কমিশন কন্ট্রাক্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছে। বিষয়টি সরকারের নজরে আনা দরকার।