বিদায়ের আগের তিনদিনে রাঙ্গুনিয়ায় সাত শতাধিক ভুয়া নামজারি!
নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতির কারণে আটকা ছিল এমন সাত শতাধিক নামজারি ফাইলে স্বাক্ষর করে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা থেকে সদ্য বিদায়ি এসি-ল্যান্ড দেবব্রত দাশের বিরুদ্ধে। এমন অভিযোগও উঠেছে আরএস খতিয়ানমুলেও নামজারি করে দেওয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে।আর এ কাজের মূল নায়ক ছিলেন খোদ এসি-ল্যান্ডের অস্থায়ী ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম ও অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্ছাঙ্গ্যা সিন্ডিকেট। যাদের অধীনে রয়েছে ভুমি সেবা দাতা হিসেবে সংযুক্ত কতিপয় দালাল চক্র। এ কাজে মোটা অঙ্কের ভাগও পেয়েছেন তারা।এমন অভিযোগ মিলেছে দূর্নীতি দমন কমিশন-দুদকে দায়ের করা একটি অভিযোগ থেকে। অভিযোগটি করেছেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসে নামজারিসহ বিভিন্ন ভুমি সেবা পেতে নানাভাবে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হওয়া একাধিক ভুক্তভোগী।দুদকে দায়ের করা অভিযোগের তথ্যমতে, দেবব্রত দাশ ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসে এসি-ল্যান্ড হিসেবে যোগদানের পর থেকে ভুমি সমস্যা নিরসনে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ভুমির নামজারিসহ বিভিন্ন ভুমি সেবার কাজ তিনি লাখ টাকা ছাড়া করতেন না। যার কাছ থেকে টাকা পেতেন তার পক্ষে কাজ করতেন।এক্ষেত্রে একজনের জমি অন্যজনের নামে নামজারি করে দিয়ে পারবারিক ও সামাজিক বিরোধ সৃষ্টি করেছেন। যার কারণে ভুমি বিরোধ নিয়ে দিন দিন অস্থিরতা বাড়ছে রাঙ্গুনিয়ায়। তার এ কাজে সহযোগীতায় ছিলেন ভুমি অফিসের অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যা ও অস্থায়ী ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম।যারা ভুমি সংক্রান্ত খতিয়ান ও নকল সংগ্রহে ৫০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিতেন। টাকা না পেলে কাজের ফাইল আটকে রাখতেন অফিস সহকারি সুভাস বসু তঞ্ছাঙ্গ্যা। আর ফাইল ছাড়ার জন্য ভুমি সেবা পেতে আসা লোকজনের সাথে মোটা অঙ্কের চুক্তি করতেন ড্রাইভার ইব্রাহিম।যাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারত তাদের ফাইল উঠত এসি-ল্যান্ডের টেবিলে। এই্ কাজে টাকার অর্ধেক পেতেন এসি-ল্যান্ড দেবব্রত দাশ। বাকি অর্ধেক ভাগবাটোয়ারা করতো ড্রাইভার ইব্রাহিম ও সুভাষ বসু। এর আগে দালাল চক্র মূলত টাকার বিনিময়ে ফাইল নিয়ে সুভাষ বসু বা ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করে দেয় ভুমি সেবা গ্রহিতাদের।আর যারা চাহিদামতো টাকা দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করতেন তাদের কাজ অফিস সহকারী সুভাষ বসুর টেবিলেই আটকা থাকত। এভাবে হাজার হাজার ফাইল আটকা আছে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসে। যার মধ্য থেকে সাত শতাধিক নামজারি ফাইলে স্বাক্ষর করে নগদ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এসি-ল্যান্ড দেবব্রত দাশ ও সহযোগী চক্র।অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত আগস্ট মাসে বদলির অর্ডার পাওয়ার পর এসি-ল্যান্ড দেবব্রত দাশ শুক্র ও শনিবার বন্ধের দিনেও গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে বসে কাজ করেছেন। এ সময় তিনি সাত শতাধিক নামজারি ফাইলে স্বাক্ষর করেন। যার মধ্যে আরএস খতিয়ান মুলে নামজারি পর্যন্ত রয়েছে। আর এসব নামজারি ফাইল থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। যেখান থেকে প্রায় ৬-৭ কোটি টাকা লুট করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।এসব কাজের মুল হোতা হিসেবে ড্রাইভার ইব্রাহিম ও অফিস সহকারী সুভাষ বসুসহ দালাল সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ইছাখালি ভুমি অফিস এলাকায় ভুমি অফিসের বিপরীতে কাপ্তাই সড়কের উত্তর পাশে সরকারি খাস জমিতে নির্মাণাধীন ভবনের মালিক থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। এমনকি উপজেলার ইটভাটাগুলো থেকেও প্রতি মৌসুমে ২০ হাজার টাকা হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, রাঙ্গুনিয়ার অসহায় ও নিরীহ মানুষের কাছ থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন ড্রাইভার ইব্রাহিম ও অফিস সহকারী সুভাষ বসু। অভিযোগের তথ্যমতে, সুভাষ বসু অফিস সহকারী পদে চাকরি করলেও চট্টগ্রাম শহরে কেনা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বাড়িতে বিলাসী জীবন যাপন করছেন।এছাড়া কাপ্তাই রেশম বাগান এলাকায় প্রায় ২৩ একর জমিতে বাগান ও বাড়ি করেছেন। পদুয়ায়ও ১৭ একর জমির উপর বাগান ও বাড়ি রয়েছে। যা সম্পুর্ণ অবৈধ আয়ের টাকায় গড়ে তুলেছেন সুভাষ বসু। একইভাবে ড্রাইভার ইব্রাহিম চট্টগ্রাম শহরে খুলশি এলাকায় ফ্ল্যাট কেনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে।অথচ তার বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কোদালা এলাকায়। যেখান থেকে সর্বোচ্চ ৬ কিলোমটারের দূরত্ব রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিস। এরপরও ড্রাইভার ইব্রাহিম রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসের কক্ষে স্বপরিবারে বসবাস করেন। এমনকি অফিসের কম্পিউটারে বসে কাজও করেন। যা চাকরির বিধি বহির্ভূত। একইভাবে সুভাষ বসুর বাড়িও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নে। সে হিসেবে সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে প্রায় ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজ উপজেলায় চাকরি করছেন তিনি।অভিযোগে আরও বলা হয়, ড্রাইভার ইব্রাহিম ও সুভাষ বসু দু‘জনেই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সক্রিয় দোসর ছিলেন। তৎকালীন রাঙ্গুনিয়ার জালিম এমপি ও সাবেক মন্ত্রী ডা, হাসান মাহমুদের হস্তক্ষেপে ভৃুমি অফিসে এসি-ল্যান্ডের ড্রাইভার হিসেবে সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি পান ইব্রাহিম। আর সাবেক এই মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ঠ হয়ে রাঙ্গুনিয়াজুড়ে দখলবাজি-চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেন। ভুমি সেবা গ্রহিতাদের বিভিন্ন কৌশলে ভয়ভীতি দোিখয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে উঠেন।এর আগে বদলির মুহুর্তে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইউনিয়ন ভুমি অফিস সংস্কার কাজের জন্য বরাদ্দকৃত ১৫ লাখ টাকা লুটে নিলেন এসি-ল্যান্ড দেবব্রত দাশ-এ সংক্রান্ত প্রতিবেদেন-১ প্রকাশের পর নামজারি ফাইলের কাজের দায়িত্ব থেকে সুভাষ বসুকে সরিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সেই সাথে কয়েকটি ভুমি অফিসের সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।তবে ভুমি অফিস সংস্কার ও মেরামতের নামে বরাদ্দকুত ১৫ লাখ টাকা লুটে সহযোগীতা বা ফাইলে স্বাক্ষর না করায় পোমরা ইউনিয়ন ভুমি অফিসের তহশীলদার আবু বক্কর সিদ্দিকীর আইডি হ্যাক করে রাখা হয়েছে। যার ফলে তিনি অফিসের স্বাভাবিক কাজ করতে পারছেন না। এ বিষয়ে তহশীলদার আবু বক্কর সিদ্দিকীও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন মুঠোফোনে।সূত্র মতে, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা, পদুয়া, শিলক, রানির হাট ও টিসির হাট ভুমি অফিসের পুরাতন ও জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের নামে ৩ লাখ টাকা করে মোট ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পান এসিÑল্যান্ড দেবব্রত দাশ। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত কোনটিরই কাজ শুরু করা হয়নি।বিস্ময়ের ব্যাপার, এই ৫ ইউনিয়ন ভুমি অফিস ভবনের মধ্যে শিলক ইউনিয়ন ভুমি অফিস ছাড়া সবগুলো ভবনই নতুন। যেখানে সংস্কারের কিছুই নেই। এর সত্যতা উঠে এসেছে ইউনিয়ন ভুমি অফিসে কর্মরতদের কথায়। যা প্রতিবেদন-১ এ প্রকাশ করা হয়েছে।এছাড়া রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার প্রশাসক হিসেবেও নিয়োগ পান এসিÑল্যান্ড দেবব্রত দাশ। এ সুযোগ পেয়ে সেখানেও ভুমি অফিসের মতো বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা হাতিয়েছেন তিনি। পৌরসভায় তার সহযোগী ছিলেন সচিব আল হেলাল, প্রকৌশলী জমির উদ্দিন ও হিসাব রক্ষক মো. এরশাদ।সূত্র মতে, বদলি হওয়ার মাত্র কয়েক মাস আগে সৈয়দবাড়ি পৌর এলাকায় কথিত বিএনপি নেতার বসতবাড়িতে যাতায়াতের সড়ক নির্মানের জন্য ১৫ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেন। আর ওই কাজ হাতে পান পৌরসভা বিএনপির টেন্ডারবাজ আরেক নেতা। যার সহযোগীতায় মাত্র দেড় লাখ টাকার মাটি ভরাটের কাজ করে পুরো টাকা আত্নসাৎ করে ভাগবাটোয়ারা করেন এই চক্র। এভাবে রাঙ্গুনিয়াকে তিনি দূর্নীতির তীর্থস্থানে পরিণত করেন। যা এর আগে কোন এসিÑল্যান্ড করেননি।এ বিষয়ে জানতে সদ্য বিদায়ী এসিÑল্যান্ড দেবব্রত দাশের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসের অফিস সহকারী সুভাষ বসু তঞ্চাঙ্গ্যাও কল রিসিভ থেকে বিরত ছিলেন। তবে ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম তার সব অভিযোগ অম্বীকার করে বলেন, এসিÑল্যান্ডের অর্ডার ছাড়া আমার কোন কাজ করার সুযোগ নেই। এসিÑল্যান্ড যা করতে বলেছেন তাই করেছি।প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এসিÑল্যান্ড বদলি হওয়ার সময় স্বাভাবিকভাবে কাজ একটু বেশি হয়। সে হিসেবে সদ্য বিদায়ী এসিÑল্যান্ড বিদায় নেওয়ার আগে কিছু কাজ করেছেন। এ সময় স্যারের অর্ডার মোতাবেক আমরা কাজ করেছি। এ নিয়ে অন্য কোন মন্তব্য করতে পারব না। আর ইটভাটা থেকে চাঁদাবাজির কোন প্রশ্নই আসে না বলে দাবি করেন তিনি। একই সাথে খুলশীতে ফ্ল্যাট কেনার কথাও অস্বীকার করেন তিনি।এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসের বর্তমান এসিÑল্যান্ড খন্দকার ফারজানা নাজনীন সেতু মুঠোফোনে বলেন, আমি যোগদানের পর অভিযোগের কারণে অফিস সহকারী সুভাষ বসুকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছি। এমন কোন অভিযোগ থাকলে ড্রাইভার হোক আর যেই হোক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সিন্ডিকেট ও দালাল চক্রের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। খোঁজ নিয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।(বি: দ্র: রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভুমি অফিসের নানা অনিয়ম ও দূর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন-২ প্রকাশ করছে দৈনিক ঈশান। তৃতীয় পর্ব প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। প্রিয় পাঠক এ বিষয়ে কোন তথ্য থাকলে তা দৈনিক ঈশানে পাঠিয়ে সহযোগীতা করতে পারেন)এ সংক্রান্ত আরও :বদলির মুহুর্তেও রাঙ্গুনিয়া থেকে ১৫ লাখ টাকা হাতালেন এসি ল্যান্ড দেবব্রত দাশ