পাউবোর ‘বর্ণচোর’ প্রকৌশলী বর্ণ হক
পদবি সাব ডিভিশনাল (এসডি) ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু হাব-ভাব চিফ ইঞ্জিনিয়ারের চেয়েও একধাপ এগিয়ে। প্রদর্শন করেন বাহুর পেশিও। খাটান রাজনৈতিক প্রভাবও। বিগত সময়ে ফ্যাসিস্টের দোসর হলেও এখন বিএনপির বড় শুভাকাঙ্খি। মামার দাপটে অফিসের সহকর্মী ও সিনিয়রদের সাথে করেন অসদাচরণও।আর এসবের মুল লক্ষ্যই হলো প্রকল্পের অর্থ হাতানোর কৌশল। এমন সুচতুর ‘বর্ণচোর’ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অফিসের এসডি প্রকৌশলী বর্ণ হক। এমন অভিযোগ সহকর্মী ও ঠিকাদারসহ ভুক্তভোগীদের। যার প্রমান মিলল গত রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে এসব বিষয়ে আলাপের সময়।তথ্যগুলো সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে পাউবো চট্টগ্রাম অফিসের তৃতীয় তলায় এসডি প্রকৌশলী বর্ণ হকের অফিস কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখা যায় রাজকীয় কায়দায় সিগারেট ফুঁকছেন তিনি। এ সময় সামনে ছিলেন এক ঠিকাদার ও তার এক সহযোগী। তাদের সাথে এমনভাবে কথা বলছেন যেন তিনিই অফিসের কিং।প্রবেশের পর দেখা যায় সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পুরো অফিস কক্ষ। অফিসে দাড়ানোও কাহিল হয়ে পড়ে সিগারেটের গন্ধে। একপর্যায়ে ঠিকাদার তার সহযোগীকে নিয়ে বেরিয়ে যান। পরে এই প্রতিবেদকের আগমনের হেতু যান চান তিনি।ফলে প্রসঙ্গত জানতে চাওয়া হয়, টেন্ডার বিতরণে ব্যক্তিগত পছন্দের কোন সৃুযোগ আছে কি না? প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সব টেন্ডার ইজিপিতে হয়, এতে কারচুপি বা কারসাজির কোন সুযোগ নেই। ইজিপি প্রক্রিয়ার জন্য বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসাও করেন তিনি।এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতাবলে পছন্দের ঠিকাদার সিলেক্ট করার উদাহরণ তুলে ধরা হলে তিনি স্বীকার করে বলেন, ওটা হয় আরপিওতে। আরপিওটা রিকোয়েষ্টর। কিন্তু রিকোয়েষ্ট কে করেন, কার জন্য করেন, এ ধরণের আইনের ভিত্তি কি জানতে চাইলে তিনি সগর্বে বলেন, সেটা উচ্চ পর্যায়ের ব্যাপার।প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন হাতানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সব মিথ্যা। যেসব ঠিকাদার কাজ পাই না, তারাই এসব কথা বলে। যারা কাজ পাই তারা বলে না। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার বিষয়ে বলা হলে চেহারার চিত্র পাল্টে যায় তাঁর। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে এই প্রতিবেদককে হেয় করার চেষ্টা করেন তিনি।অফিসের সহকর্মী ও ঠিকাদারদের সাথে অসদাচরণের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসের কেউ আপনাকে এসব কথা বলেনি। বলেছেন পওর-২ নির্বাহী প্রকৌশলী তানজির সাইফ আহমেদ। কিভাবে জানলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী তানজির সাইফ আহমেদ আমার একটি বিষয় চট্টগ্রামের বহু সাংবাদিককে দিয়েছেন। আপনাকেও দিয়েছেন। আপনি তার প্রোটেক্ট করতে আসছেন।কি বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা মেসেজ, এরপর তিনি চুপ হয়ে যান। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সেক্রেটারি জহিরুল হক খোকন সম্পর্কে কী হন জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ-আমি জানি তো, আমি সেটাই বলছি। কি জানেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জহিরুল হক খোকন আমার মামা। ওনাকে তানজির সাহেবের বদলির বিষয়ে একটি মেসেজ দিয়েছিলাম। ওটা আপনাকে দিয়েছে আর কি।তাহলে আপনি সরকারি চেয়ারে বসে রাজনৈতিক প্রভাবও খাটান-এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। আপনার কথাবার্তা ও হাব-ভাব নাকি চিফ ইঞ্জিনিয়ার চেয়েও একধাপ এগিয়ে-এমন প্রশ্নের জবাবে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, আপনার কথা আমি অনেক শুনেছি। আপনাকে অনেক উচু মানের সাংবাদিক ভাবতাম। ব্যক্তিগত এসব সস্তা কথা নিয়ে আপানি আমার কাছে আসবেন সেটা ভাবতে পারিনি। আপনি যা বলেছেন তা ৫-১০ হাজার টাকা দিলে সমাধান হয়ে যায়-এমন মন্তব্য করেন এসডি প্রকৌশলী বর্ণ হক।এদিকে ভুক্তভোগীরা জানান, প্রকৌশলী বর্ণ হক অফিসে এসে রাজপুত্রের মত হাব-ভাব দেখান। জিম করেন, তাই পেশিগুলো দেখাতে প্রায় সময় টি-শার্ট বা হাফ হাতা জামা পড়েন। আর অফিসে জুনিয়রসহ সিনিয়রদের সাথে তুই তোখারি করেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবো চট্টগ্রাম অফিসের এক এসডি আক্ষেপ করে বলেন, বর্ণ হক ব্যাচ হিসেবে আমার জুনিয়র। বয়সেও ছোট। তারপরও ওনাকে আমি আপনি সম্বোধন করি, আর ওনি করেন তুই-তোখারি। একইভাবে একাধিক ঠিকাদারও অভিযোগ করেন, পাউবোর চিফ ইঞ্জিনিয়ার থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী সকলে আমাদের আপনি সম্বোধন করেন। আর এসডি বর্ণ হক বলেন তুই বা তুমি করে।এছাড়া এমন ভাব দেখান তিনি যেন চিফ ইঞ্জিনিয়ারের চেয়েও একধাপ ওপরে। এমন ভাব চিফ ইঞ্জিািনয়ারও দেখান না। আর কথায় কথায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সেক্রেটারি জহিরুল হক খোকনের ক্ষমতা দেখান তিনি। ওনি নাকি তাঁর মামা। তাঁর এসব অসদাচারণ নিয়ে কথা বলায় পওর-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী তানজির সাইফ আহমেদকে বদলির জন্য সেই মামার কাছে আবদার করেন বর্ণ হক।আর তার অসদাচারণ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার সব কিছুর মূলই হচ্ছে প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন হাতানোর কৌশল। ঠিকাদারদের ভাষ্য, বর্ণ হক পাউবো চট্টগ্রাম অফিসের পওর বিভাগ-১ এর অধীনে এসডি প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। তিনি বর্তমানে আনোয়ারা সেকশনের দায়িত্বে আছেন। এই উপজেলায় পাউবোর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। যেখান থেকে বরাদ্দের ৩% কমিশন হাতিয়ে নেন এসডি প্রকৌশলী বর্ণ হক। এর বাইরে প্রকল্পের কাজ দেখভালেও সব খরচ বহন করতে হয় ঠিকাদারদের। অন্যথায় নানাভাবে হয়রানি করা হয় ঠিকাদারদের।ঠিকাদাররা জানান, বিগত সময়ে ফ্যাসিষ্টদের দোসর হিসেবে কাজ করেছেন এসডি প্রকৌশলী বর্ণ হক। তখন ওবায়দুল কাদেরসহ প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের দাপট দেখাতেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি বিএনপির বড় শুভাকাঙ্খি হিসেবে জাহির করেন নিজেকে। মামা পরিচয় দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সেক্রেটারি জহিরুল হক খোকনকে।এ বিষয়ে জানতে জহিরুল হক খোকনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর চট্টগ্রাম পওর-১ নির্বাহী প্রকৌশলী (সদ্য বদলিপ্রাপ্ত) শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। এটা বর্ণ হকের ব্যক্তিগত বিষয়। আমার ডিভিশনের কোন বিষয় নয়। এ বিষয়ে আমি কোন কথা বলতে চাই না।এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবো চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খ.ম জুলিফকার তারেক বলেন, বিষয়গুলো আমার জানা নেই। কেউ আমাকে বলেনি। অফিসের কাজে আমি এখন ঢাকায়। বুধবার ফিরে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।(বি: দ্র: পাউবো চট্টগ্রামের এসডি প্রকৌশলী বর্ণ হকের নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে দৈনিক ঈশান। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের অনুরোধ রইল প্রিয় পাঠকদের প্রতি। তথ্যদাতার নাম-পরিচয় গোপন রাখায় অঙ্গিকারাবদ্ধ দৈনিক ঈশান)