২৫৫ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল
২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষে ফল ঘোষণা করা হয়।নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচনি কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৩৪৯, ভোট পড়েছে ৩৪৩টি। নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ও কর্নেল (অব.) অলি পেয়েছেন ৮৮ ভোট।এর আগে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও।নির্বাচনি কর্মকর্তা ও সিইসি নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, আজ বৃহস্পতিবারই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গেজেট প্রকাশ করা হবে।বাংলাদেশ সচিবালয় ও সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আগামীকাল শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন। এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। এর আগে গত ২৪ জুলাই দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর ৬ আগস্ট শূন্য পদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। রাষ্ট্রপতির হাতে যত ক্ষমতাবাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি। সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকার প্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বাধ্য নন। একটি হলো প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কে সরকার গঠন করতে পারবেন, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না বা দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো আদালত তদন্ত করতে পারে না।দণ্ড মওকুফের ক্ষমতারাষ্ট্রপতির অন্যতম ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করার ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে এ ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে মার্জনা বা কমাতে পারেন।দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তি রয়েছে। তার কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।তবে রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণভাবে অপসারণের বাইরে নন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাকে অভিশংসন করা যায়। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাকে অপসারণের বিধান রয়েছে।অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে তার পদ শূন্য হয়।রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ পরপর দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।কীভাবে নির্বাচিত হনবাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদের সদস্যরা তাকে নির্বাচিত করেন। একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন এবং অন্য একজন তা সমর্থন করেন। একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সর্বাধিক ভোট পাওয়া ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সমান ভোট হলে সংবিধান অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।পাবেন যেসব সুযোগ-সুবিধারাষ্ট্রপতির আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্ট-এ। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ বেতন আয়করমুক্ত। সর্বশেষ ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতির বেতন বাড়ানো হয়। এর আগে মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা।রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরও সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য কিছু সরকারি সুবিধা বহাল থাকে। রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা এন্টারটেইনমেন্টের জন্য বার্ষিক ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে এবং এই ব্যয়ের নিরীক্ষা করা হয় না।রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। ভবনটির সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়। সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহনসুবিধা দেওয়া হয়। সরকারি কাজে বিদেশ সফরের সময় সরকার নির্ধারিত হারে ভাতাও তিনি পান।রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছাধীন তহবিল বছরে ২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ অর্থ ব্যয় করা যায়। রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যেকোনো হাসপাতালে তারা বিনা খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের বিমাসুবিধা রয়েছে, যার বর্তমান অর্থ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে এই সুবিধার পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।