তেলচুরি থেকে কাউন্সিলরের পথে ট্যাংকলরী মালিক সমিতির সভাপতি কামাল
চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ গাড়ি ব্যবহারের জন্য ক্রয়কৃত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল (ডিজেল) নিয়মিত চুরির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ট্যাংকলরী ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেটের যোগসাজশে এই তেল লোপাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।তেল চুরির এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে ট্যাংকলরী মালিক সমিতির স্ব-ঘোষিত সভাপতি মো. কামাল উদ্দিনের নাম উঠে এসেছে। যিনি দীর্ঘ দেড়দশক ধরে তেলচুরির মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। বর্তমানে স্বপ্ন দেখছেন বিএনপির সমর্থনে চট্টগ্রামের ৩৮নং ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবেন।আর এই অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একান্ত সচিব বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন মো. শাহ আলম নামের এক ট্যাংকলরী ঠিকাদার। অভিযোগপত্রে তিনি লিখেন, বিপিসি নিয়ন্ত্রণাধীন স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত সংঘবদ্ধ চোরচক্র সক্রিয় রয়েছে। যাদের নেতৃত্বে রয়েছে ট্যাংকলরী মালিক সমিতির সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন।অভিযোগপত্রের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব গাড়ির ব্যবহারের জন্য বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড হতে প্রতি সপ্তাহে ৯ হাজার লিটার করে ১৫টি গাড়ির জন্য মোট ১ লাখ ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল ক্রয় করা হয়।যা কামাল উদ্দিনের ট্যাংকলরীগুলো দিয়ে সংগ্রহের চুক্তি করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। যাকে অনিয়মিত ও অবৈধ চুক্তি বলে দাবি করা হয়। পূর্বে বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে এই তেল কেনা হলেও তেল পাচারের অসৎ উদ্দেশ্যে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি থেকে ডিজেল ক্রয় শুরু হয়। যার নেপথ্যে প্রভাব বিস্তার করে কামাল উদ্দিন।অভিযোগ রয়েছে, ট্যাংকলরী মালিক সমিতির স্বঘোষিত সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন সিন্ডিকেট এবং বন্দরের কিছু অসাধু কর্মচারী সঞ্জয় ও মান্না মিলে বন্দরের ১নং জেটিতে অবস্থিত স্টোরে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল থেকে সংগৃহীত ডিজেল পুরোটা আনলোড না করে বড় একটি অংশ চুরি করেন।পরবর্তীতে পতেঙ্গা এলাকার বিভিন্ন চোরাই ডিপোতে সেই তেল কম দামে বিক্রি করা হয়। এই তেল চুরির বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ট্যাংকলরীর ড্রাইভারদের নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বখশিশ বা উৎকোচ প্রদান করা হয়।তেল চুরির দায়ে আটক কামাল উদ্দিনের মালিকানাধীন একটি ট্যাংকলরী (নম্বর: নোয়াখালী-ট-১৯৭৭) বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং কেপিসিও কর্তৃক নিষিদ্ধ ও মামলাভুক্ত হলেও অদৃশ্য বলে সেটি এখনো তেল পরিবহনের কাজে বহাল রয়েছে।অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে , দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিভিন্ন নেতার সাথে মিলে কামাল উদ্দিন ও তার ভায়রা ভাই মাহবুব এই তেল চুরির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর তারা রাতারাতি ভোল পাল্টে বিএনপির অঙ্গসংগঠন শ্রমিক দলের নাম ভাঙিয়ে এই অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।একইভাবে নামমাত্র বা নির্বাচনবিহীনভাবে ট্যাংকলরী মালিক সমিতির স্ব-ঘোষিত সভাপতি হয়ে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। লালন-পালন করেছেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের।তেল চুরির সাথে জড়িত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রণাধীন স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিসাধনকারী এই তেল চুরির সিন্ডিকেটকে পাকড়াও করতে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল থেকে তেল বহনকারী ট্যাংকলরীগুলোর গেটে ওজন যাচাই এবং কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি জানানো হয়েছে।একইসঙ্গে মো. কামাল উদ্দিনের ট্যাংকলরীগুলোর সাথে সম্পাদিত অনিয়মিত চুক্তি বাতিল করে অন্য মালিকদের মাধ্যমে তেল পরিবহন নিশ্চিত করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যাংকলরী মালিক সমিতির স্ব-ঘোষিত সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন স্বীকার করে বলেন, সমিতির সভাপতি মারা যাওয়ার পর আমি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলাম। বর্তমানে সভাপতি হয়েছি। সমিতির নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ-আমি কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করব। এ কারণেই তো একটি চক্র আমার পেছনে উঠে-পড়ে লেগেছে। এ বিষয়ে এ পর্যন্ত আমি ৭ জন সাংবাদিকের সাথে কথা বলেছি। আপনিসহ ৮ জন। ওই ৭ জনসহ আপনি আমার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। আপনার চায়ের দাওয়াত রইল।কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে ব্যয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে কামাল উদ্দিন বলেন, আমি তো ফকিন্নির পুত না, আমার বাবা আমাকে সব দিয়ে গেছে। আমি নির্বাচন করতে পারব। তবে আপনারা যেভাবে লেগেছেন তাতে মনে হয় আমাকে বঙ্গোপসাগরে চলে যেতে হবে।তেল চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তেল চুরির সাথে জড়িত আছি এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আপনারা প্রমাণ করেন। যারা অভিযোগ করেছেন তারাও প্রমাণ করতে পারবে না। তাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।(বি: দ্র:- ট্যাংকলরী সমিতির স্ব-ঘোষিত সভাপতি মো. কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, রেলওয়ের জমি দখল করে দোকান নির্মাণ, মাদক পাচার, চোরাচালানসহ নানা অপরাধের তথ্যসংবলিত ধারাবাহিক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করবে দৈনিক ঈশান। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রদান করে দৈনিক ঈশানকে সহযোগীতার অনুরোধ রইল প্রিয় পাঠকদের প্রতি।)