ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ, বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে অপপ্রচার
জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের অনেক গ্রাহকও অভিযোগ করছেন, আগের মাসের তুলনায় তাদের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কারও বিল দ্বিগুণ, কারও তিনগুণ, আবার কোথাও পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি এসেছে।সামাজিক মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলের কপি প্রকাশ করে ক্ষোভ জানাচ্ছেন অসংখ্য গ্রাহক। কেউ দাবি করেছেন, পুরো মাস বাড়িতে না থাকলেও আগের তুলনায় বেশি বিল এসেছে। আবার কেউ বলছেন, আগে যেখানে মাসে দুই হাজার টাকার কম বিল দিতেন, এবার সেখানে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। তবে সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টিকে অপপ্রচার আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত যতগুলো অভিযোগ জমা পড়েছিল, তা বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলো যৌথভাবে সমাধান করেছে। এরপরও যদি কোনো গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ কাছের অফিসে আবেদনের আহ্বান জানানো হয়েছে। লিখিত আবেদন পেলে দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।গ্রাহকদের অভিমতচট্টগ্রাম পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা খায়রুল ইসলামের মতে, তার পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার গত কয়েক মাসে তেমন পরিবর্তন হয়নি। প্রতি মাসে তার বিল ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে থাকত। কিন্তু জুন মাসে তার বিল আসে প্রায় ৬ হাজার টাকা। হঠাৎ চার গুণের বেশি বিল দেখে তিনি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেন। তার প্রশ্ন, ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও বিল এত বেড়ে গেল কীভাবে?একই ধরনের অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা। তাদের দাবি, জুন-জুলাই মাসে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যায়নি। তারপরও আগের মাসের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল এসেছে। তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকলে ব্যবহারও কম হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে এত বেশি বিলের যৌক্তিকতা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।শুধু পোস্টপেইড নয়, প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের মধ্যেও একই ধরনের ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকার অনেক গ্রাহক বলছেন, আগে যে পরিমাণ টাকা রিচার্জ করলে প্রায় এক মাস বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেত, এখন একই পরিমাণ টাকা দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। মিটার পরীক্ষা করিয়েও তারা স্পষ্ট কোনো কারণ জানতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার আগের মতোই থাকলেও রিচার্জের টাকা অস্বাভাবিক দ্রুত কেটে যাচ্ছে।পাভেল বড়ুয়া নামে একজন বলেন, ১ হাজার টাকা রিচার্জ করে বিদ্যুৎ পেলাম ৭০৮ টাকার। মানে ২৯২ টাকা নাই। এর মধ্যে ডিমান্ড চার্জ ১৬৮, ভ্যাট ৪৭। কারা জানি বলেছিলেন মিটার ভাড়া নেবে না সরকার! আমার তো নিল ৮০ টাকা। এভাবে ১ হাজারে ৭০০ টাকা মানে ৩০০ টাকা নাই হয়ে যাওয়াকে সাগর-চুরি বলে মনে করি আমি।এ ধরনের অভিযোগ শুধু একজন বা দুটি এলাকার নয়। নগরীর পাহাড়তলী, পতেঙ্গা, গোসাইলডাঙ্গ, ফিরিঙ্গিবাজার, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকাম ফরিদের পাড়া, কাপাসগোলা, বাকলিয়া, চাক্তাই, সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক গ্রাহকের দাবি, দিনের বড় অংশ লোডশেডিংয়ে কাটলেও তাদের বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে।এসব অভিযোগে স্পষ্ট, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। তাই বিষয়টি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।পোস্টপেইড গ্রাহকদের অভিযোগ, কোথাও মিটার রিডিংয়ে ভুল হয়েছে, কোথাও অনুমাননির্ভর বিল করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে সমন্বয় করায় বিল হঠাৎ বেড়ে গেছে। অনেক গ্রাহক বিল হাতে পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করছেন।বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যাঅস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগের পর বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, জুন মাসে তীব্র গরমের কারণে সারা দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বিশেষ করে এসি, ফ্রিজ, পাখা ও কুলারের ব্যবহার বাড়ায় অনেক গ্রাহকের বিদ্যুৎ খরচও আগের তুলনায় বেশি হয়েছে। তাছাড়া ঈদুল আজহার কারণে মে মাসে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই মিটার রিডিং নেওয়া হয়। ফলে জুন মাসের বিলে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার যুক্ত হয়েছে। এ কারণেও অনেকের বিল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি এসেছে। একই কারণে জুলাই মাসের বিলেও কিছু ক্ষেত্রে এমন প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।এ ছাড়া কোথাও কোথাও মিটার রিডিংয়ে ভুল, বিল তৈরির ত্রুটি কিংবা একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে সমন্বয় করার কারণেও অস্বাভাবিক বিল হয়েছে বলে স্বীকার করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এসব অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।সন্তুষ্ট নন গ্রাহকরা, ছুড়ছেন প্রশ্নতবে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অনেক গ্রাহকরা। তাদের প্রশ্ন, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও কীভাবে বিল দুই, তিন কিংবা পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে?অনেকের অভিযোগ, দিনের পর দিন লোডশেডিংয়ের কারণে এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্বাভাবিকভাবে ব্যবহারই করা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যবহারের যুক্তি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদেরও অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলেও রিচার্জের টাকা অস্বাভাবিক দ্রুত কেটে যাচ্ছে।নাগরিক সমাজের উদ্বেগজুন মাস থেকে বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ার পরই জুলাই মাসে অনেক গ্রাহকের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল পাওয়ার অভিযোগ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকের দাবি, আগের তুলনায় বিল দুই থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিল বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। মিটার রিডিং, বিলিং সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত সংশোধনের পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।সংগঠনটি অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, বিল পুনর্মূল্যায়ন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত বিলে জরিমানা বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা এবং ভবিষ্যতে এমন সমস্যা এড়াতে বিলিং ব্যবস্থার নিয়মিত প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের বিলের কপি, মিটারের রিডিং ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, শুধু তীব্র গরম বা অতিরিক্ত কয়েক দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার দিয়ে এত বড় বিলের পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। কোথাও মিটার রিডিংয়ে ত্রুটি, কোথাও বিলিং ব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা প্রশাসনিক গাফিলতি রয়েছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।বাড়তি বিলের ক্ষোভের মধ্যেও লোডশেডিংবিদ্যুৎ বাড়তি বিল নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখনই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে শুরু করেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি কোনো না কোনোভাবে জ্বালানি সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ২৬টি, তরল জ্বালানিভিত্তিক ৩৩টি এবং কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর থেকেই দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়। টার্মিনালটির কার্যক্রম আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।এর আগে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন গড়ে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে ৬৮ থেকে ৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি কমেছে।গত সপ্তাহে গড় উৎপাদন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট, যা আগের সপ্তাহে ছিল মাত্র ৩২০ মেগাওয়াট। ১ আগস্ট ঘাটতি বেড়ে ২ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়। রোববার গভীর রাতে একপর্যায়ে ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে ওঠে। দিনের বেলাতেও অনেক সময় ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে।ভোগান্তি বেশি গ্রামাঞ্চলেলোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে গ্রামাঞ্চলে। অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার এক বা দুই ঘণ্টা লোডশেডিং এখন অনেক এলাকার নিত্যদিনের ঘটনা।রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একটি চালকলের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, একদিনে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কার্যত বন্ধ ছিল। আগে দুই-তিন ঘণ্টার লোডশেডিং কোনোভাবে সামলানো যেত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। সাতকানিয়ার মাছচাষি রহমত উল্লাহ জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালাতে টানা তিন রাত লেগেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি কাজও নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় গ্রিডে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ, অতপর লোডশেডিংমাতারবাড়ী ও বাঁশখালী এসএস পাওয়ারের মতো মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বিদ্যুৎ পাঠানো হচ্ছে পুরো দেশের জাতীয় গ্রিডে। ফলে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গত ৩০ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ-সংক্রান্ত সরকারি প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এই চিত্র উঠে এসেছে। সর্বশেষ সোমবার দুপুর ১টার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ ছিল ৯০০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২০০ মেগাওয়াট। কাগজে-কলমে ২০০ মেগাওয়াটের লোডশেডিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র এর চেয়ে খারাপ। রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। টানা এক-দুই ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না জেলার কোনো এলাকায়।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।’ সরবরাহ কেন কম সেটি তিনি জানেন না বলে জানান।চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল ভিত্তি এখন দুটি বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। বাঁশখালীর এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার কেন্দ্র থেকে ১ ও ২ আগস্ট টানা ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ যোগ হয়েছে জাতীয় ও স্থানীয় গ্রিডে। মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০ জুলাই সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট উৎপাদিত হয়। যদিও ৩১ জুলাই সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটিতে তা কমে ৭৯০ মেগাওয়াটে নামে। এ ছাড়া গ্যাসভিত্তিক শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি নিয়মিত ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন বজায় রেখেছে।বিপরীতে সরকারি পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ভিন্ন চিত্র মিলেছে। চট্টগ্রাম শহরঘেঁষা রাউজান ১ ও ২ নম্বর ইউনিট (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ ছিল সিইপিজেডের ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনাইটেড পাওয়ার প্ল্যান্টও। কক্সবাজারের বায়ু ও টেকনাফ-কাপ্তাইয়ের সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও ধারাবাহিকতা নেই। ৩০ জুলাই বেলা ১১টায় কক্সবাজার বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিললেও পরদিন একই সময়ে সেখান থেকে উৎপাদন নেমে আসে শূন্যে। কাপ্তাই, টেকনাফ ও কেইপিজেডের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রাতে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। আর মেঘলা দিনেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদ্যুৎ দিতে পারছে না বলে তথ্যে উঠে এসেছে।লোডশেডিংয়ের এই বাস্তবতায় দুর্বিষহ দিন কাটছে নগরবাসীর। চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, সকালে খাবার তৈরি করতে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি গ্যাস নেই। ভাবলাম কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। বেডরুমে গিয়ে দেখি বিদ্যুৎ নেই। এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি।হালিশহরের বাসিন্দা সুরাইয়া জান্নাত বলেন, রবিবার রাত ১টা ৩৫ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যায়। এক ঘণ্টা পর আসে। আবার ভোরে চলে যায়। আসে সকালের দিকে। রাতে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে বাচ্চারা গরমে ছটফট করতে থাকে।’ নগরের রাজাপুকুর লেনের বাসিন্দা পুতুল দাশগুপ্ত বলেছেন, তাদের বাসায় রাতে বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে ভোররাতে।’বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের বিদ্যমান উৎপাদন দিয়েই স্থানীয় গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব। তবে জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডের বণ্টন-নীতির কারণে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম থেকে টেনে নিয়ে রাজধানীসহ অন্যান্য এলাকার ঘাটতি মেটানো হচ্ছে। অথচ গ্যাস সরবরাহের বেলায় চট্টগ্রাম পুরোপুরি বঞ্চিত। চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ দেশের কোন কুপ থেকে আসে না, সম্পূর্ণ আমদানিকৃত তরল এলএনজির উপর নির্ভর। তদন্তের নির্দেশ সরকারের বিতর্ক বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের সব বিতরণ কোম্পানিকে দ্রুত অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের বিল ব্যবহারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলো পুনরায় যাচাই করতে হবে। তদন্তে ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধিত বিল দিতে হবে।এ জন্য প্রতিটি বিদ্যুৎ বিতরণ অফিসে আলাদা অভিযোগ গ্রহণ সেল চালু করা হয়েছে। গ্রাহকরা বিল, মিটারের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে সেখানে আবেদন করতে পারবেন। প্রয়োজনে মিটার পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, জুন মাসের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও অনিয়ম, অবহেলা বা অসাধু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ইকবাল মাহমুদ বলেন, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত কারণ কী, সেটি তদন্ত করেই নিশ্চিত হওয়া হবে। কোনো গ্রাহক যেন অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।