
নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর রবিবার দিনগত মধ্যরাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি কর্মসূচি এক সপ্তাহের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারী সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
এর ফলে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়। ফলে বন্দর এলাকায় কনটেইনার ওঠানামা, পণ্য ডেলিভারি এবং পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল শুরু হয়। এতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়।
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) সব টার্মিনালেই ধীরে ধীরে কাজের গতি ফিরে আসে। একই সঙ্গে বহির্নোঙর থেকেও জেটিতে জাহাজ আসা-যাওয়া শুরু হয়।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ও বিডার চেয়ারম্যান ¯পষ্টভাবে জানিয়েছেন বর্তমান সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা চুক্তি করা হবে না। পাশাপাশি শ্রমিক-কর্মচারীদের বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এসব বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই আমরা দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হিসেবে কর্মবিরতি স্থগিত করেছি। বন্দরের স্বার্থ, দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দাবিগুলোর বাস্তব অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে আবার কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ফলে বন্দরের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটতে শুরু করেছে। জমে থাকা কনটেইনার দ্রুত সরানো এবং জাহাজ পরিচালনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগলেও কার্যক্রম এখন সচল রয়েছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের কাস্টমস বিষয়ক স¤পাদক রাইসুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিনের অচলাবস্থায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। কাজ শুরু হওয়ায় আমরা স্বস্তি পাচ্ছি। দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় বন্দর চালু হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সূত্রমতে রবিবার দিনগত রাত সাড়ে ১২টায় পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেয় বন্দর রক্ষা পরিষদ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেয়ার চুক্তি হবে না বলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ঘোষণা দেওয়ায় ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজানে পণ্য খালাসের স্বার্থে ধর্মঘট কর্মসূচি সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। তবে বন্দর কর্মচারীদের গ্রেফতার, হয়রানিমূলক বদলি, সাময়িক বরখাস্তসহ পাঁচটি সমস্যা সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি আবার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
গত সপ্তাহে দফায় দফায় কর্মবিরতির কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার অচলাবস্থার পর রোববার সকাল ৮টা থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি শুরু করে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এ অবস্থায় রবিবার বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কো¤পানি ডিপিওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা নেই।
উল্লেখ্য, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে তিনদিন কর্মবিরতির পর ৩ ফেব্রুয়ারি ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি শুরু করেন। এতে চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রমের পাশাপাশি বন্দরে জাহাজ আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
এ অচলাবস্থার মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে এসে শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন। আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারীরা বন্দর ভবনে প্রবেশের পথে উপদেষ্টার গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন।
এ সময় তাদের ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালেরা- হুঁশিয়ার সাবধান, গো ব্যাক অ্যাডভাইজার গো ব্যাক, মা মাটি মোহনা- বিদেশিদের দেব না- এমন নানা ¯ে¬াগান দিতে শোনা যায়। অনেকে উপদেষ্টার গাড়ির সামনে গিয়ে ভুয়া ভুয়া, দালাল দালাল বলে স্লোগান দেন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে প্রবেশ করে নৌ উপদেষ্টা বন্দরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধি দল এবং বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকে পরিষদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। দাবিগুলো হচ্ছে- নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব-আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল ঘোষণা, বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের বদলি আদেশ প্রত্যাহার করে আগের পদে ফিরিয়ে নেওয়া, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের মামলা-হয়রানি না করা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার করা।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দাবি, বৈঠকে নৌ উপদেষ্টা বদলি ও মামলা সংক্রান্ত দাবি নৌ মন্ত্রণালয় থেকে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। বাকি দুটি দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করবেন বলে জানান।
শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠকের পর তাদের দাবির বিষয়ে নৌ উপদেষ্টা বলেছিলেন, দাবিগুলো তিনি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন। তবে চুক্তি ঠেকানো যাবে না জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, চট্টগ্রাম বন্দর সচল করার কাজে কেউ বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যাবে।
এরপর সংগ্রাম পরিষদ ৪৮ ঘণ্টা জন্য কর্মবিরতি স্থগিত ঘোষণা করে। ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে কাজে যোগ দেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। তবে এর মধ্যে সরকার দাবি মেনে নেওয়ার সু¯পষ্ট ঘোষণা না দিলে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরুর ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল সংগঠনটি।
সেই ঘোষণা অনুযায়ী রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে লাগাতার ধর্মঘট শুরু করে সংগ্রাম পরিষদ। এর আগে, কর্মবিরতি চলাকালে সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়কসহ ১৫ জনকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বদলি করা হয়। কিন্তু তারা কেউই বদলি করা কর্মস্থলে যোগ দেননি।
যেদিন নৌ উপদেষ্টা বৈঠক করেন, সেদিনই ১৫ কর্মচারীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তাদের স¤পদ অনুসন্ধানের জন্য চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে আন্দোলনকারীরা আরও ক্ষুব্ধ হন। সর্বশেষ লাগাতার ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণার পর পুলিশ পাঁচ কর্মচারীকে আটক করে। এছাড়া বদলি হওয়া ১৫ কর্মচারীর সরকারি বাসার বরাদ্দ বাতিল করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।











































