বৃহস্পতিবার- ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

চট্টগ্রামজুড়ে ভোটের উৎসব, ছিল বিক্ষিপ্ত ঘটনাও

চট্টগ্রামজুড়ে ভোটের উৎসব, ছিল বিক্ষিপ্ত ঘটনাও

# সকালের নিরবতা ছাপিয়ে উত্তাপ বাড়ে দুপুরে
# গ্রামের চেয়ে শহর ছিল শান্ত

ভোটগ্রহণ শুরুর আগেও পরে সুনশান নিরবতা ছিল চট্টগ্রামজুড়ে। কেন্দ্রে ভোটারদের ভিড় থাকলেও ছিল না তেমন কোন কোলাহল। উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল ভোটারদের মাঝে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমন নির্বাচন চট্টগ্রামের মানুষ দেখেনি-এমন মন্তব্য ছিল ভোটারদের।

কিন্তু বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে না হতেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে। সংঘর্ষ-মারামারি মতো ঘটনা ঘটে বিভিন্ন কেন্দ্রে। এসব ঘটনায় আহতও হয়েছেন অনেক প্রার্থীর পক্ষের মানুষ। যার অধিকাংশই ছিল গ্রামের ভোটকেন্দ্রগুলোতে। সে হিসেবে তুলনামুলক শান্ত ছিল শহরের ভোটকেন্দ্রগুলো।

বৃহ¯পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে শুরু হয় বহু আকাঙ্খিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও গণভোট। এর মধ্যে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম-৭, ৮, ৯ ও ১০ আসনের বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে শান্ত পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়।

তখন ভোটারদের মুখেও শুনা যায় পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারার কথা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ বোয়ালখালী-চান্দগাঁও একাংশের আসনের বহদ্দারহাট সংলগ্ন ওয়াপদা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিতে আসা ফরিদের পাড়া এলাকার ৭২ বছরের ভোটার শওকত হোসেন বলেন, দেশে এ পর্যন্ত যত নির্বাচন দেখেছি, সব নির্বাচনে ভোটগ্রহণের আগের রাত থেকে চট্টগ্রামজুড়ে শুরু হত ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। ভোটগ্রহণের শুরু থেকে শুরু হত কেন্দ্র দখল-মারামারি ও গোলাগুলির ঘটনা।

কিন্তু এবার ভোটগ্রহণ শুরুর আগে চট্টগ্রামের কোথাও শুনা যায়নি একটা পটকার আওয়াজ। চারদিকে ছিল সুনশান নিরবতা। ভোটাররা কেন্দ্রে ভোট দিতে গেলেও সেখানে ছিল না কোন কোলাহল। ফলে ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছে। এ পরিবেশ বিগত সময়ে কখনও দেখা যায়নি।

একই কথা বলেছেন, চট্টগ্রাম-৯ আসনের বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা রেভারানী দাশ, পুরবী দাশ, মুখলেছুর রহমানসহ অনেকে। এর আগে সকাল ৯ টায় চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া আসনের মুরাদের ঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় ভোটগ্রহণের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ।

সেখানে ভোট দিতে আসা শাহ আলম, আকবর হোসেন, ফরিদা খাতুনসহ অনেকে বলেছেন, এই কেন্দ্রে যে নির্বাচনই হয়েছে সেখানে ভোট লুট হয়েছে। মারামারি সংঘর্ষ লেগে থাকত। এবারের মতো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ কোন সময় ছিল না এই কেন্দ্রটিতে।

তবে ভোটারদের মুখের ফুল চন্দন বেশিক্ষণ প্রস্ফুটিত ছিল না। দুপুর গড়াতেই খবর আসতে থাকে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে সংঘর্ষ ও মারামারির খবর। কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের উপর হামলা ও ভোটারদের ছুরিকাঘাতসহ নানা অশুভ খবর আসতে থাকে।

সূত্র মতে, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে মোমবাতি ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় একজন আহত হন। আহত আসিফ (২৪) মোমবাতি প্রতীকের সমর্থক বলে জানা গেছে। ভোটের দিন দুপুর ১টার দিকে আনোয়ারার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. হাসানুল হক জানান, সংঘর্ষের ঘটনাটি কেন্দ্র থেকে ১০০ গজ দূরে ঘটেছে। এতে কেন্দ্রে কোন প্রভাব পড়েনি। কেন্দ্রের ভেতরে ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক ছিল।

সংঘর্ষে সুন্নী জোটের মোমবাতি সমর্থকদের অভিযোগ, বিএনপি সমর্থক প্রায় ৫০ জনের একটি দল কেন্দ্রের বাইরে এসে মোমবাতি প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এতে তাদের কয়েকজন আহত হয়। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

একই রকম ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া আসনের রাজানগর ২নং ওয়ার্ডের জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা কেন্দ্রে। সেখানে বিএনপির প্রার্থীর কর্মীদের হামলা করতে গিয়ে উল্টো মার খেয়ে আহত হন জামায়াতের এক কর্মী। তবে তার নাম জানা যায়নি। ঘটনাটি দুপুর ২টার দিকে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন :  চট্টগ্রামে ৬৫৩ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা

সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনেও। নির্ধারিত সময়ের আগেই রেজাল্ট শিটে পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ১০-১২ জন আহত হয়।

ভোটের দিন উপজেলার পূর্ব সুয়াবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। জানা যায়, কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মাসুদ বিন রশিদ ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই কেন্দ্রের দরজা বন্ধ করে কয়েকজন পোলিং এজেন্টের কাছ থেকে রেজাল্ট শিটে স্বাক্ষর নেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাঈদ মো. ইব্রাহিম বলেন, প্রিজাইডিং অফিসার সময়ের আগে এজেন্টদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে। যেসব কাগজে অগ্রিম স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সবার সামনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

ফটিকছড়ি সরকারি কলেজ কেন্দ্রেও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। ওই কেন্দ্রে দুজনকে এবং নাজিরহাট আহমদিয়া কামিলা মাদ্রাসা কেন্দ্রে তিনজনকে অর্থদন্ড প্রদান করেন ম্যাজিস্ট্রেট।

ফলাফলের তালিকায় অগ্রিম স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনা ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া) আসনের উত্তর সাতকানিয়া আলী আহমদ প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রেও। এ ঘটনায় দুই প্রার্থীর অনুসারীদের মাঝে হাতাহাতি ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পড়ে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ফরিদুল আলমকে প্রত্যাহার করা হয়।

প্রত্যাহার হওয়া প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ফরিদুল আলম জানান, ভোট শেষে ফলাফলের তালিকা তৈরিতে ঝামেলায় পড়তে হয়। এ কারণে তিনি আগেভাগে ফলাফলের তালিকায় স্বাক্ষর নিয়েছেন। খারাপ উদ্দেশ্যে এ কাজ করেননি।

ওই আসনের ধানের শীষের প্রার্থী জসিম উদ্দিন জানান, ফলাফলের তালিকায় অগ্রিম স্বাক্ষর নিয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা অপরাধ করেছেন। এ কারণে ভোট কেন্দ্রে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

চট্টগ্রাম মহানগরের আকবরশাহ থানাধীন একটি ভোটকেন্দ্র এলাকায় প্রতীক নিয়ে তর্কের জেরে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনাও ঘটেছে। ভোটের দিন দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে হাজী দাউদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

আহত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ নুরুল আফসার (৪৫)। তিনি নগরের উত্তর কাট্টলি এলাকার বশির মোহাম্মদ বাড়ির বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম মৃত নুরুল আলম।

প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য মতে, নুরুল আফসার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কোন প্রতীকে ভোট দেবেন এ বিষয় নিয়ে কথাকাটাকাটিতে জড়ান। একপর্যায়ে ওই তর্কাতর্কি সংঘর্ষে রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় ইমন এবং তার ছোট ভাই নুরুল আফসারকে ছুরিকাঘাত করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।

ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ার ইউনিটে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে ২ নম্বর ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে ভর্তি দেন।

ভোটারদের মতে, সংঘর্ষ ও মারামারির মতো বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া চট্টগ্রামের সবকয়টি আসনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের জেলা ও মহানগর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছিল। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতভর নগরী ও জেলাজুড়ে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে টহল দিয়েছে পুলিশ-সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ফলে ভোট উৎসবে মেতে উঠেন ভোটাররা।

চট্টগ্রাম নগরীর বেড়িবাঁধ এলাকায় বসবাসকারী ৭৯ বছর বয়সী হরি বালা দাসের মুখে শুনা যায় এই ভোট উৎসবের কথা। তিনি নগরীর দক্ষিণ হালিশহর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন ভোট দিতে। বয়সের ভারে শরীর ন্যুজ্ব হলেও ভোটাধিকার প্রয়োগে তার আগ্রহে ছিল না কোনও ভাটা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভোটকেন্দ্রে এলেও তার মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি।

আরও পড়ুন :  জামায়াতের প্রচারণা ছিল ‘এআই‘ প্রতারণা

ভোট প্রদান শেষে তিনি বলেন, আমি দুইটি ব্যালটে ভোট দিয়েছি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আমি আমার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি। ওই কেন্দ্রে সকাল থেকেই ছিল নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। তবুও ভোট দিতে আমার কোন কষ্ট হয়নি। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কেন্দ্রটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

এদিকে ছেলের কোলে ভর করে ভোটকেন্দ্রে আসেন ৮৫ বছরের বৃদ্ধ কবির হোসেন। বৃহ¯পতিবার সকাল ৯ টা ৫৫ মিনিটে মিরসরাই উপজেলার রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

ভোট দিয়ে কবির হোসেন বলেন, ‘একে তো বয়স হয়েছে, তার উপর অসুস্থ ছেলের কোলে ভর করে কেন্দ্রে এসেছি। ভোট দিয়েছি, এটা হয়তো আমার জীবনের শেষ ভোট। যাকে ভোট দিয়েছি সে যদি জিতে তাহলে আরো ভালো লাগবে।’

কবির হোসেন মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের সালাহ উদ্দিনের ছেলে। একই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা গৃহবধূ আসমা আক্তার বলেন, ১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি। অনেক খুশী মনে ভোট দিতে আসছি। সাথে বাড়ির সব মহিলাকে নিয়ে কেন্দ্রে আসছি।

জীবনের প্রথম ভোট দিলেন তামিম ইকবাল

কিন্তু ৩৬ বছর বয়সে জীবনের প্রথম ভোট দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ইতি টানা বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। ভোট দিয়ে নির্বিঘ্ন ও শান্ত পরিবেশে ভোটগ্রহণ হচ্ছে বলে জানান তামিম। এই সময় তাকে দেখতে আশপাশে ভক্তদের ভিড় জমে যায়।

বৃহ¯পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম-৯ আসনের আঞ্চলিক লোক প্রশাসন কেন্দ্রের ১৯ নম্বর ভোটকক্ষে ভোট দেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশের সাবেক এই তারকা। তামিম বলেন, জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। ভোট ভালোই হচ্ছে। পছন্দের প্রার্থীকে একটি ভোটই দিয়েছি।

ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সময় সেনাবাহিনীর প্রটোকল ছিল তামিমের সঙ্গে। শান্ত পরিবেশে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ভোটের পরিবেশ সুস্থ। সবাই নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন বলেও প্রত্যাশা তামিমের। ভোট কেন্দ্রে তামিমকে দেখতে ভিড় করেন স্থানীয় ভোটার ও তরুণরা। অনেকেই তার সঙ্গে মোবাইলে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

৫৬ বছরে বয়সে জীবনের প্রথম ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী রবিউল হোসেন। ভোটের দিন বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম-৯ আসনে আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন তিনি। তিনি চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামাল খান ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।

প্রবাসী রবিউল হোসেন চৌধুরী বলেন, আমি ২২-২৩ বছর বিদেশে ছিলাম, একবারও ভোট দিতে পারিনি। ৫৭ বছর বয়সে এবার জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। এবার নির্বাচনী পরিবেশ খুবই ভালো। এখানে যারা দায়িত্বে আছেন তারা খুব সুন্দর করে আমাদের সহযোগিতা করছে।

ভোট দিলেন কর্নেল অলি. আমির খসরু-সুফিয়ান দিলেন অন্যত্র
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুরফুরে মেজাজে নিজের ছেলে ওমর ফারুকের ছাতা প্রতীকে ভোট দিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম। তবে নিজেকে ভোট দিতে পারেননি চট্টগ্রাম-৯ আসনের প্রার্থী আবু সুফিয়ান ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এর মূল কারণ আমির খসরুর পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রাম-১০ আসনের কাট্টলীতে। ভোটের দিন সকাল ৮টায় তিনি উত্তর কাট্টলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আমীর খসরুর ব্যক্তিগত সহকারী। হেভিওয়েট এই প্রার্থীর ভোট পেয়েছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও নোমানপূত্র সাঈদ আল নোমান।

আরও পড়ুন :  চট্টগ্রামে ৬৫৩ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা

চট্টগ্রাম-৯ আসনে (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) বিএনপির প্রার্থী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানও নিজেকে নিজে ভোট দিতে পারেননি। কারণ তিনি চট্টগ্রাম-৮ আসনের চান্দগাঁও এলাকার ভোটার। চান্দগাঁও আবাসিকের সিডিএ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কেন্দ্রে তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সে হিসেবে তাঁর ভোট পেয়েছেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম ভোট দিয়েছেন নিজ জন্মভুমি চন্দনাইশ উপজেলার সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ভোট প্রদান শেষে তিনি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, কোথাও কোনো কেন্দ্র দখলের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। গত তিন দিন ধরে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে মোটামুটি শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।

ভোটারদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ভোটাররা হয়তো অন্য পক্ষ থেকে টাকা নিতে পারে, কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন। ১১-দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠন করবে।

ভোট দেওয়া হলো না মনু মিয়ার
১৭ বছর পর ভোট দিতে গিয়েও তা আর হলো না মনু মিয়ার (৫৭)। ভোটকেন্দ্রে লাইনে দাড়ানো অবস্থায় হার্ট অ্যাটাকে মারা যান তিনি।

ভোটের দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানার ব্যাটারিগলি এলাকায় কাজীর দেউড়ি বালক পেয়ার মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

মৃত মনু মিয়া ব্যাটারিগলির বাসিন্দা মোহাম্মদ মিয়ার ছেলে। পেশায় নিরাপত্তাকর্মী মনু মিয়ার চার ছেলে মেয়ে আছে।

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনের ওই ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শরীফ উদ্দিন বলেন, মনু মিয়া ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ করে বসে পড়েন। এরপর তার বমি শুরু হয়। খবর পেয়ে স্বজনেরা এসে তাকে নিয়ে যান। পরে মারা গেছেন বলে শুনেছি।

মনু মিয়ার বড় ছেলে মো. শাকিল বলেন, আমরা আব্বাকে এখানে ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তিনি হার্ট অ্যাটাক করেছেন। ১৭ বছর পর বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে মনু মিয়া ভোট দিতে গিয়েছিলেন বলে জানান একসঙ্গে কেন্দ্রে যাওয়া প্রতিবেশি ফজলে কবির।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন গণনা চলছে। তিনজন রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আলাদা তিনটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জেলার ১০টি সংসদীয় আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে চালু করা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ৫টি সংসদীয় আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে, যেগুলোর রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে বিভাগীয় কমিশনার দায়িত্ব পালন করছেন।

আর চট্টগ্রাম বন্দর স্টেডিয়ামে আরেকটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছেন চট্টগ্রাম-১১ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। সেখানে ওই আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। একইভাবে গণভোটের ফলাফলও ঘোষণা করা হবে।

সূত্র আরও জানায়, চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে এবার মোট ভোটার ছিল ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন এবং মহিলা ভোটার ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৭০জন। প্রার্থী আছেন ১১৫ জন। এবারের নির্বাচনে ভোটারেরা সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটেও ভোট দিয়েছেন। গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

ঈশান/খম/মউ

আরও পড়ুন