শনিবার- ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দর

চাপ না কাটতেই ফের লাগাতার কর্মবিরতির ডাক

কর্মবিরতির চাপ কাটিয়ে উঠছে চট্টগ্রাম বন্দর

# দু‘দিনে রেকর্ড জাহাজ হ্যান্ডলিং
# এক জোয়ারে ২৬ জাহাজের ইনবাউন্ড ও আওটবাউন্ড মুভমেন্ট
# ইউরোচ্যামের উদ্বেগ

নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানীর কাছে ইজারা চুক্তি প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে টানা ছয় দিন কর্মবিরতির পর শুক্রবার থেকে কর্মমূখর হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম বন্দর। যা শনিবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এতে রেকর্ড সংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডলিং করে কর্মবিরতির চাপ কিছুটা কাটিয়ে উঠে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু সেই চাপ পুরো না কাটতেই ফের লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন।

আর এ ঘোষণার পর পরই চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান এই অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ)। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই স্থবিরতা দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াচ্ছে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শনিবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, টানা ছয়দিন কর্মবিরতির পর শুক্রবার সকালে এক জোয়ারে ২৬ জাহাজের মুভমেন্ট স¤পন্ন করে রেকর্ড স্থাপন করে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি।

এর মধ্যে বন্দরের জেটিতে আটকা পড়া ১০টি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করেছে এবং বহির্নোঙরে জটে থাকা ১৬টি জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করে বিভিন্ন জেটিতে বার্থিং নিয়েছে। একইভাবে শনিবারও সমসংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। যা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নজির স্থাপন হলো।

তিনি বলেন, এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে এক জোয়ারে এত জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়নি। স্বাভাবিক সময়ে বন্দরে গড়ে ৮ থেকে ১০টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়। ৫টি জাহাজ জেটি ত্যাগ করলে ৫টি জাহাজ ভিড়ে। কখনো কখনো এ সংখ্যা দুয়েকটি এদিক-ওদিক হয়।

ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত বাড়লে বন্দর থেকে সব জাহাজ বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময় সব জেটি খালি করে বন্দর থেকে সর্বোচ্চ ১৫-১৬টি জাহাজ বের করে দেয়া হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জাহাজগুলোকে ফিরিয়ে আনা হয়।

কিন্তু একই দিনের একই জোয়ারে জেটি থেকে ১০টি জাহাজকে বাইরে পাঠিয়ে বহির্নোঙর থেকে ১৬টি জাহাজকে জেটিতে নিয়ে আসার কোনো রেকর্ড নেই। এটি বন্দরের ইতিহাসে এক জোয়ারে সর্বোচ্চ জাহাজের মুভমেন্ট।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে ঠিক কবে এক জোয়ারে এত জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে, সে তথ্য নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে একই দিনে মাত্র সোয়া তিন ঘণ্টার জোয়ারের মধ্যে ২৬টি জাহাজের ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড মুভমেন্ট প্রথম।

বন্দর সূত্র জানায়, শুক্রবার সকালের জোয়ারে জেটি থেকে ১০টি জাহাজকে বহির্নোঙরে পাঠানো হয়। এসব জাহাজ বহির্নোঙর হয়ে বিশ্বের নানা গন্তব্যে চলে যায়। জেটি থেকে সব জাহাজ বেরিয়ে যাওয়ার পর বেলা ১১টা ৩ মিনিটে এমটি সোয়ান প্যাসিফিক নামের গ্যাসভরতি জাহাজটি বন্দর চ্যানেল ধরে সিইউএফএল জেটিতে বার্থিং নেয়।

এরপর একের পর এক জাহাজ আসতে থাকে বন্দরের জেটিতে। সর্বশেষ দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে জোয়ার শেষ হওয়ার আগে এমভি আমওয়াজ নামের জাহাজটি জেটির পথে যাত্রা করে। সব মিলিয়ে শুক্রবার সকালের জোয়ারে বন্দরে সব জেটিতে জাহাজ বার্থিং স¤পন্ন হয়েছে। একইভাবে সমসংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে শনিবারও।

আরও পড়ুন :  হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লা

সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে কেবলমাত্র সকালের জোয়ারে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়। নাইট নেভিগেশন না থাকায় রাতের জোয়ারে বন্দরে কোনো জাহাজ আসা-যাওয়া করে না। শুক্রবার জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ার পরপর প্রতিটি জাহাজে কাজ শুরু হয়।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, কর্মবিরতির কারণে সৃষ্ট জট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি কন্টেনার হ্যান্ডলিং ও ডেলিভারি কার্যক্রমেও গতি ফিরেছে। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে মোট ৩৬ হাজার ৭০৮ টিইইউএস কন্টেনার ছিল।

এর মধ্যে ফুল কন্টেনার লোড (এফসিএল) রয়েছে ২৯ হাজার ৬৫১ টিইইউএস, ডিপোতে ১ হাজার ৩৪০ টিইইউএস, এলসিএল ১ হাজার ৩৮ টিইইউএস, আইসিডিমুখী ১ হাজার ৬৭৮ টিইইউএস, আইসিটিতে যাবে ১০৫ টিইইউএস, খালি কন্টেনার (এমটি) ২ হাজার ৭৮ টিইইউএস এবং রপ্তানি কন্টেনার রয়েছে ৮১৮ টিইইউএস।

এর মধ্যে শুক্রবার ২ হাজার ২৪৭ টিইইউএস কন্টেনার ডেলিভারি স¤পন্ন হয়েছে। শনিবার ২ হাজার ৮২৬ টিইইউএস ডেলিভারি নির্ধারিত রয়েছে। বন্দরের মোট ধারণক্ষমতা ৫৯ হাজার টিইইউএস হওয়ায় বর্তমানে কন্টেনার অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্দরের কর্মকর্তারা বলেন, কর্মবিরতির চাপ কাটিয়ে স্বাভাবিক গতিতে ফিরছিল চট্টগ্রাম বন্দর। কর্মবিরতির কারণে যে জট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বন্দর সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে। তবে এর মধ্যে শ্রমিকরা ফের কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে। যা উদ্বেগজনক।

ফের লাগাতার কর্মবিরতির ডাক
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রত্যাহারসহ তিন দফা দাবিতে রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল আটটা থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন। তিনি বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যানই চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান সংকটের কারণ। তাকে অবিলম্বে চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।

সংগ্রাম পরিষদের অন্য দাবিগুলো হলো আগের আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত ও পদাবনতি করা হয়েছে, সেসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল করে সবাইকে নিজ নিজ পদে পুনর্বহাল করা। পাশাপাশি আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুণ, সাধারণ স¤পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, মার্চেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ক ইয়াসিন রেজা রাজুসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

এর আগে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ তিন দফায় ৬ দিন কর্মবিরতি পালন করে। এতে আমদানি পণ্য ডেলিভারি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং জেটিতে জাহাজ আনা-নেওয়া বন্ধ হয়ে বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

গত বৃহ¯পতিবার নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করে আশ্বাস দিলে সাময়িকভাবে কর্মবিরতি স্থগিত করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে বলে দাবি করেন আন্দোলনকারী শ্রমিকদেও সংগঠনের (স্কপ) নেতারা।

আরও পড়ুন :  জামায়াত-এনসিপি প্রার্থীর অনৈক্যে জয়ের পথে বিএনপির প্রার্থী

নেতারা বলেন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে বন্দরে আন্দোলনকারী ১৫ জন শ্রমিকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের স¤পদ তদন্তের আবেদন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। স্কপের মতে এটি নৌ পরিবহন উপদেষ্টার নির্দেশেই করা হয়েছে।

স্কপ এ ধরনের পদক্ষেপকে অনৈতিক ও গর্হিত আখ্যা দিয়ে জানায়, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা কিংবা স¤পদ তদন্তের হুমকিতে শ্রমিকরা ভীত নন। বরং এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌ উপদেষ্টা, বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বন্দর চেয়ারম্যানের স¤পদের হিসাব নেওয়াই অধিক জরুরি বলে মন্তব্য করেন তারা।

নেতারা বলেন, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দমনে যে কোনো হয়রানিমূলক পদক্ষেপ প্রতিহত করতে স্কপ প্রস্তুত রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ যা করছে তা নিতান্ত আগুন নিয়ে খেলা করছে। তাদের দাবি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় ফের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়া হলো।

ফের কর্মবিরতির ডাকে উদ্বেগ জানিয়েছেন আমদানি-রপ্তানিকারক ও শিপিং সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি খাত সংকটে রয়েছে। কর্মবিরতির নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা না গেলে এই সংকট তীব্র হবে।

আন্দোলনকারীদের স¤পদের তদন্ত ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দাবি
চট্টগ্রাম বন্দরের আন্দোলনরত ১৫ জন কর্মচারীর স্থাবর ও অস্থাবর স¤পদ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাঁদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।

বৃহ¯পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা এক চিঠিতে এসব আবেদন জানানো হয়। চিঠিটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। এর অনুলিপি দেওয়া হয়েছে নৌপরিবহন উপদেষ্টার দপ্তর, দুদক এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালকের কাছেও। বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণার পর এ চিঠি দেওয়া হয়।

চিঠিতে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন। এর আগে তাঁদের প্রেষণে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। তালিকার অন্যরা হলেন, মো. ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. জহিরুল ইসলাম, খন্দকার মাসুদুজ্জামান, মো. হুমায়ুন কবীর (এসএস পেইন্টার), মো. শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মো. শামসু মিয়া, মো. লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল ও মো. রাব্বানী।

চিঠিতে বলা হয়েছে, উক্ত কর্মচারীগণ রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত। এ সকল বিপথগামী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও এজেন্সিকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।

এ ছাড়া শুধু দুদকের জন্য অংশে বলা হয়েছে, বর্ণিত কর্মচারীদের সকল স্থাবর-অস্থাবর স¤পদ তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

ইউরোচ্যামের উদ্বেগ
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ)। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই স্থবিরতা দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াচ্ছে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

আরও পড়ুন :  বিএনপির সাবেক মন্ত্রী বনাম জামায়াতের সাবেক কাউন্সিলর

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ জানায়, কাজ বন্ধ থাকার কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে হাজার হাজার কন্টেনার আটকে আছে এবং রপ্তানির নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে এবং এটি রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোর প্রধান প্রবেশদ্বার। স্বাভাবিক সময়ে এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ রপ্তানি কন্টেনার পরিবহন হয়। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অচলাবস্থার কারণে কন্টেনার চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

ইউরোচ্যামের সদস্য প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহকারী ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রপ্তানি সময়সূচি ভেঙে পড়ায় পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং অতিরিক্ত পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়ছে। বর্তমানে বন্দরের টার্মিনাল, বেসরকারি ডিপো ও জাহাজে আটকে থাকা প্রায় ১৩ হাজার কন্টেনারে আনুমানিক ৬৬ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা) রপ্তানি পণ্য আটকে আছে।

ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ বলেছে, নিরবচ্ছিন্ন, পূর্বানুমানযোগ্য ও দক্ষ বন্দর কার্যক্রম রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে, বিদেশি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখতে এবং ইউরোপ ও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে সুনাম বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে— বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক র্ব্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি ও সময়মতো ডেলিভারির বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত নিশ্চিত করা, জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে চলমান বিরোধগুলো গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এবং দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতাশীলতা বাড়াতে বন্দর আধুনিকায়ন কার্যক্রম জোরদার করা।

ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ আরও জানিয়েছে, তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা এবং দেশের বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে একটি স্থিতিশীল, দক্ষ ও ভবিষ্যৎমুখী বন্দর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।

ইউরোচ্যামের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৮ লাখ ৩১ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যার মোট মূল্য ছিল ৪২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারকে পরিণত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি সম্প্রতি ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।

ঈশান/খম/মম

আরও পড়ুন

জনপ্রিয়