শনিবার- ৩০ আগস্ট, ২০২৫

পেশাদার খুনি আরিফকে দিয়ে পুত্রবধূকে খুন করান শ্বাশুড়ি

পেশাদার খুনি আরিফকে দিয়ে পুত্রবধূকে খুন করান শ্বাশুড়ি

শ্বাশুড়ি বদরাগী, অত্যাচারী। পুত্রবধূর সঙ্গে কোনোভাবেই বনিবনা হত না তার। ছেলে পরপর দু‘বার বিয়ে করেছেন। কিন্তু মায়ের সঙ্গে মিল না হওয়ার দুই স্ত্রীকেই ত্যাগ করেন। এরপর সেই মা তার আপন বোনের মেয়েকে ছেলের বৌ করে ঘরে তোলেন।

বোনের মেয়ে হলে কী হবে, যথারীতি তার সঙ্গেও ঝগড়া-ঝাটি, পরিবারে অশান্তি। কিন্তু তৃতীয় পুত্রবধূকে নিয়ে আর ডিভোর্সের ঝামেলায় গেলেন না। দেড় লাখ টাকায় পেশাদার খুনি ভাড়া করে পুত্রবধূকে খুন করে ডাকাতির নাটক সাজান শ্বাশুড়ি।

এটি কোনো গল্পের অংশ নয়। পুরোপুরি সত্য শ্বাসরুদ্ধকর এ ঘটনার জট খুলেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দেড় লাখ টাকায় হত্যাকান্ড বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব যাকে দেওয়া হয়েছিল, ঘটনার চার বছর পর সেই আরিফকেও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পিবিআই।

সোমবার (২৫ আগস্ট) চট্টগ্রামের আদালতে জবানবন্দি দিয়ে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন মো. আরিফ (৩৫)। আর মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) সকালে লোমহর্ষক এ তথ্য জানান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিটের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মহসীন চৌধুরী।

আরও পড়ুন :  রাজপথে চুয়েট শিক্ষার্থীরাও

তিনি জানান, ঘটনার টানা অনুসন্ধানে আরিফের অবস্থান শনাক্ত করে গত ২৪ আগস্ট রবিবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন আরিফ জবানবন্দি দিয়েছেন। আরিফ ২০২১ সালে ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতো। নিহতের শ্বশুরবাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতো। এ হিসেবে ওই পরিবারের সঙ্গে তার সুস¤পর্ক ছিল।

একদিন শ্বাশুড়ি নাজনীন আরিফের কাছে তার পুত্রবধূকে খুন করতে পারবে কী না জানতে চান। আরিফ দেড় লাখ টাকার চুক্তিতে রাজি হন। চুক্তি অনুযায়ী আরিফ তার বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে তিনজন প্রফেশনাল কিলার ভাড়া করে আনেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন শুক্রবার দুপুরে নামাজরত অবস্থায় মাহবুবাকে শারীরিক আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

নাজনীন বেগম কথামতো আরিফকে দেড় লাখ টাকা দেন। সেগুলো আরিফসহ চারজন মিলে ভাগ করে নেন। আরিফসহ চারজন কক্সবাজারে চলে যান। বছরখানেক আগে আরিফ আবার চট্টগ্রাম শহরে এসে আতুরার ডিপোতে হকারের পেশায় যুক্ত হন।

আরও পড়ুন :  কর্ণফুলী টানেলে ৫৮৫ কোটি টাকা লোপাট

হত্যাকান্ডের নেপথ্যের কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসআই মহসীন বলেন, কারণ একমাত্র শ্বাশুড়ি। প্রচন্ড বদরাগী এই মহিলা আগের দুই বৌকে ডিভোর্স দিতে ছেলেকে বাধ্য করেছেন। ছেলেও ছিল মা অনুরাগী। তৃতীয় বউ তার মায়ের আপন বোনের মেয়ে। সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় ডিভোর্স সম্ভব নয়, তাই খুন করান।

এমনকি খুনের সময় তিনি ও তার ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর গৃহবধূ তখন ছিলেন ছয় মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা। আরিফের জবানবন্দির তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকান্ডে জড়িত তিন পেশাদার খুনিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে এসআই মহসীন জানান।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগরীর ইপিজেড থানার নারকেল তলা এলাকায় এক বাড়িতে মাহবুবা আক্তার (২৪) নামে এক গৃহবধূ খুন হন। এ ঘটনায় তার ভাই মো. মিশকাত গৃহবধূর স্বামী আব্দুল গোফরান (৩৫) ও তার মা নাজনীন বেগমকে (৫৫) আসামি করে মামলা করেন।

হত্যাকান্ডের তিন বছর আগে গোফরানের সঙ্গে তার আপন খালাতো বোন মাহবুবার বিয়ে হয়। মাহবুবার বাবার বাড়িও কাছাকাছি নগরীর সল্টগোলা ক্রসিং এলাকায়। বিয়ের পর থেকেই নিজ খালা অর্থাৎ শ্বাশুড়ি ও স্বামী মিলে মাহবুবাকে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে আসছিল।

আরও পড়ুন :  জাহাজে লুকিয়ে বিদেশ যাত্রার চেষ্টা, যুবক আটক

ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে গোফরানের বোন শান্তা- মাহবুবার ছোট বোন সাদিয়াকে ফোন করে জানান, অজ্ঞাত লোকজন তার ভাবীকে শ্বাসরোধ করে অজ্ঞান করে রেখে গেছে। এ খবর পেয়ে ভাই মিশকাত সেখানে গিয়ে মাহবুবাকে মৃত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। তার গলায়, মুখে এবং শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তখন নাজনীন তাকে জানান, তাদের বাসায় ডাকাতি হয়েছে এবং ডাকাতরা মাহবুবাকে খুন করেছে।

তবে মিশকাত থানায় মামলা করার পর পুলিশ নাজনীন ও তার ছেলে গোফরানকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে আরিফের স¤পৃক্ততার তথ্য পেলেও তাকে গ্রেফতারে ব্যর্থ হয় ইপিজেড থানা পুলিশ। ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর এ তিনজনকে আসামি করে পুলিশ অভিযোগপত্র দেয় আদালতে। কিন্তু আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ না করে পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন।

ঈশান/খম/মসু

আরও পড়ুন