শুক্রবার- ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুর রাজত্ব!

বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুর রাজত্ব!

# কয়েকদিনে ৫০ ফিশিং ট্রলারে ডাকাতি
# গুলিতে নিহত হচ্ছে একের পর এক জেলে
# নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জেলেরা

শান্ত হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর উপকূল। সাগরজুড়ে একধরণের রাজত্ব কায়েম করেছে জলদস্যুরা। সম্প্রতি গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে অন্তত ৫০টি ফিশিং ট্রলারে ডাকাতি ও লুটপাট চালিয়েছে জলদস্যুরা।

এমনকি গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুর গুলিতে কুতুবদিয়ার শাহাদাত হোসেন খোকন (১৭) নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন। এতে ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধ শতাধিক জেলে আহত হয়েছেন। বরগুনার পাথরঘাটা ও খুলনার বেশ কিছু জেলে জলদস্যুর হামলায় আহত হয়ে কুতুবদিয়ায় চিকিৎসা নিচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ জলদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধিতে জেলেরা আতঙ্কিত হয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জেলেদের দাবি জরুরি ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া না হলে সাগরে জলদস্যুদের অরাজকতার ফলে মৎস্য শিকার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

জেলেরা জানান, ত্রযোদশ নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিন থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা গহীরা উপকূল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকাজুড়ে জলদস্যুদের ভয়ংকর অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কুতুবদিয়াসহ অন্য উপকূলীয় মৎস্যজীবী ও ফিশিং বোট মালিকদের কাছে নিয়মিত ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করছে জলদস্যু ও ডাকাত চক্র। তারা মোবাইল ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে, মুক্তিপণ দাবি করছে এবং চাঁদা না দিলে সাগরে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া বা অপহরণের হুমকি দিচ্ছে।

মাঝিমাল্লাদের ভাষ্যমতে, সাগরে একাধিক জলদস্যু গ্রুপ ফিশিং বোটে লুটপাট ও ডাকাতিতে জড়িত। জলদস্যুগুলো আনোয়ারা, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী এলাকার বাসিন্দা। তারা সাগরে দস্যুতা করলেও এলাকায় বড় বড় রাজনৈতিক নেতা। এদের অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও পুলিশ প্রশাসন নিরব ভুমিকা পালন করছে। তবে কোস্টগার্ড অভিযান চালালে কিছু জলদস্যু ধরা পড়ে।

আরও পড়ুন :  কক্সবাজারে ফিলিং স্টেশনে দগ্ধ ৭ জন চমেক হাসপাতালে

কুতুবদিয়ার জলদস্যু আক্রান্ত ফিশিং ট্রলার এফবি অজুফা আক্তার মানুর মালিক জসীম উদ্দিন জানান, তার ফিশিং বোটটি ২০ জন মাঝি-মাল্লাসহ গত বুধবার দুপুরে সাগরে মাছ ধরছিল। বেলা আনুমানিক ২টার দিকে একদল জলদস্যু বোটটিকে ধাওয়া দেয়। একপর্যায়ে দস্যুরা বোটে উঠতে না পেরে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে।

এতে শাহাদাত হোছাইন খোকন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বোটটি কুতুবদিয়া উপকূলে ফিরে আসে। পরে স্বজনরা শাহাদাতকে উদ্ধার করে কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এছাড়া গত বুধবার ভোরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের ৩টি মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মনি নামের এক ট্রলারের মাঝি গুলিবিদ্ধ হয়। বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলে এই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় ট্রলারগুলোতে থাকা ৩০ জন মাঝিমাল্লা জলদস্যুর হামলায় আহত হয়।

এছাড়া গত ১৫ দিনে সাগরে আরও অর্ধশতাধিক ফিশিং বোট ডাকাতির শিকার হয়েছে এবং জলদস্যুদের হামলায় তিনজন মৎস্যজীবী নিহত হয়েছে। জলদস্যুরা আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কুতুবদিয়াসহ অন্য উপকূলীয় মৎস্যজীবী ও ফিশিং বোট মালিকদের কাছে নিয়মিত ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে সাগরে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া বা অপহরণের হুমকি দিচ্ছে।

আরও পড়ুন :  চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে আট তলা ভবনে ফাটল

কুতুবদিয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি ও ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, গত ১৫ দিনে বঙ্গোপসাগরে বেপরোয়া জলদস্যুর কারণে মৎস্যজীবীরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে সাগরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। সাগরে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া নিরীহ জেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুতুবদিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুল হক জানান, সাগরে জলদস্যুদের গুলিতে নিহত শাহাদাত হোছাইনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বৃহ¯পতিবার সকালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।

এদিকে কয়েকটি ফিশিং ট্রলার ডাকাতির পর বুধবার বিকেলে মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে একটি জলদস্যু গ্রুপের প্রধান জাহাঙ্গীর ও তার ৮ সহযোগীকে ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক এবং ডাকাতের কবলে পড়া ৪ জেলেকে উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন।

তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জলদস্যুরা স্বীকার করেন তারা দীর্ঘদিন ধরে সাগরে ডাকাতি করে আসছিলো। উদ্ধারকৃত জেলে ও ট্রলার এবং জব্দকৃত আলামত ও আটক ডাকাতদের পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্ধার অভিযান কোস্টগার্ড অব্যাহত রেখেছে বলে জানায় সাব্বির আলম সুজন।

আরও পড়ুন :  চট্টগ্রামে কাচ্চি ডাইনে তেলাপোকা-ঈঁদুর, জরিমানা ৩ লাখ টাকা

এদিকে এ ঘটনায় কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের সাম্প্রতিক মাসিক সাধারণ সভায় উপস্থিত থেকে মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের নবনির্বাচিত সংসদ আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ সাগরে জলদস্যুর গুলিতে জেলে নিহত ও মালামাল লুটপাটের বিষয়ে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের পুলিশ সুপারদের অবগত করেন। জলদস্যুদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ প্রদান করেন তিনি।

সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার জামশেদ আলম রানা উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে জলস্যুদের তৎপরতা উদ্বেগজনক। এতে দেশের অর্থনীতির উপর চরমভাবে আঘাত হানছে। জলদস্যুদের দ্রুত শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার থেকে খুলনা উপকুল জুড়ে জলদস্যুদের তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাদের দমনে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জলদস্যুদের অপরাধ সাধারণ ক্ষমার আওতায় এনে তাদের পূনর্বাসনের উদ্যোগ নেন।

এই ক্ষমার সুযোগ নিয়ে বরগুনায় একদল জলদস্যু অস্ত্র ও আত্নসমর্পণ করে। পরবর্তিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতেও কতিপয় জলদস্যু অস্ত্র ও আত্নসমর্পণ করে সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণ করে। কিন্তু এরপরও জলদস্যুদের উল্লেখযোগ্য অপতৎপরতা থামেনি।

বরং ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর কারাগারে থাকা কিছু জলদস্যু জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার সাগরে নেমে ফিশিং বোটে ডাকাতি ও লুটপাট শুরু করেছে। এতে মৎস্য আহরণে ব্যাঘাত ঘটছে। যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে আঘাত পড়ছে। নিরাপত্তহীনতায় ভুগছেন জেলেরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বিষয়টি চ্যালেঞ্জ তৈরী করেছে।

ঈশান.খম/বেবি

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page