
# যৌন নির্যাতনের শিকার অধিকাংশই
# লাশ হয়ে ফিরলেন ৮০০ নারী কর্মী
ভাগ্য বদলের আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কামরুন নাহার (ছদ্মনাম)। কিন্তু সেখানে গিয়ে গৃহকর্তা বা কফিল এবং তার ছেলের যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যৌন নির্যাতনের শিকার এমন ১৮ নির্যাতিত নারীর সঙ্গে দেশে ফেরেন তিনিও।
রোববার (৮ মার্চ) বিকেলে কথা হয় কামরুন নাহারের সঙ্গে। মুঠোফোনে তিনি বলেন, কফিল ও তার ছেলের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক দিন অসুস্থ ছিলাম। এখন একটু সুস্থ। কিন্তু কেউ আমার খোঁজ নিল না। সরকারও চিকিৎসায় কোনো সহায়তা দেয়নি।
হাটহাজারী উপজেলার নুসরাত বেগমও (ছদ্মনাম) ২০১৯ সালে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন। কিন্তু কফিলের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনিও দেশে ফিরতে বাধ্য হন। এখন তিনি গ্রামেই আছেন।
পটিয়া উপজেলার আয়েশা আক্তারের (ছদ্মনাম) জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন। ছোটবেলায় বাবা–মাকে হারানোর পর বিয়ে হলেও স্বামী একসময় তাঁকে ছেড়ে চলে যান। দুই সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর সংগ্রাম। ভাগ্য বদলের আশায় দুই বছর আগে সৌদি আরবে যান তিনি। কিন্তু সেখানে চারবার হাতবদল হন।
প্রতিটি পদে অমানবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন তিনি। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন তাঁকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে পাঠায়। বর্তমানে নিজের এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তিনি।
জোবেদা আক্তার নামে আরেক নারী গৃহকর্মীর কাজের প্রলোভনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে মানব পাচারের শিকার হন। সেখানে তাঁকে একটি ক্লাবে আটকে রেখে জোরপূর্বক যৌনপেশায় যুক্ত করা হয়। আট মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি কোনো বেতন পাননি। পরে কৌশলে সেখান থেকে বের হলেও মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এভাবে শুধু কামরুন নাহার, নুসরাত আয়েশা বা জোবেদা নন, তাঁদের মতো গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী নানাভাবে আরবদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। এ বিষয়ে সঠিক কোন পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের কাছেও নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের সরকারে যারা এসব বিভাগে কাজ করতেন তারাও এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি। বর্তমানেও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায় না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, ফেরত আসা নারীদের মধ্যে অন্তত ১২১ জন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফিরেছেন, যাঁদের তারা সেবা দিয়েছে। এ ছাড়া নানা ধরনের নির্যাতনের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন আরও হাজারো নারী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন অসংখ্য নারী। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ নারী কর্মী বিদেশে কাজ করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
তম্মধ্যে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া নারীদের মধ্যে যারা নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরেছেন, তাঁদের বড় একটি অংশই বিধবা, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামীহারা। আবার কেউ কেউ ছোট সন্তান রেখে ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। সেখানে ভালো খাবার ও বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে গিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখেছেন তাঁরা। দেশে ফিরে এসে বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়কে জানালেও তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট সৌদি আরবফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়ে ব্র্যাক একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। সেটি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। ৪৪ শতাংশ নারী নিয়মিত বেতন পাননি।
দেশে ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাঁদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেরত আসা নারী কর্মীদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ৪৮ জন নিয়মিত বেতন–ভাতা পেতেন না। অন্তত ২৩ জন পর্যাপ্ত খাবারও পেতেন না।
ফেরত আসা নারীদের অভিযোগ, সৌদি গৃহকর্তা ও পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তাঁদের নানাভাবে উত্যক্ত করতেন। কেউ কেউ যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। কথা না শুনলে চাবুক বা লাঠি দিয়ে মারধর করা হতো। শরীরে গরম পানি বা তেল ঢেলে দেওয়া, গরম ছ্যাঁকা দেওয়া, বাথরুম বা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা এবং পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
লাশ হয়েও ফিরেছেন অনেকে। তাদের একজন রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রেশমা বেগম। ভাগ্য বদলের আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে একসময় গৃহকর্তার বাসার টয়লেট থেকে স্বজনদের কাছে ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে দেশে ফেরার আকুতি জানান। পরে তাঁকে দেশে ফেরানো হলেও জীবিত নয়, কফিনবন্দী লাশ হয়ে ফিরতে হয়। নির্যাতনে নিহত রেশমার মরদেহ দেশে আসে মৃত্যুর ৫৩ দিন পরে, গত বছরের ২৪ অক্টোবর।
জানা যায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান রেশমা। হাসপাতালে ক্লিনারের চাকরি দেওয়ার কথা বলা হলেও তাঁকে বাসাবাড়িতে কাজ করানো হয়। সেখানে তাঁকে যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরবে যান আবিরুন বেগম। পরে গৃহকর্তার বাসায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর ৫১ দিন পর পরিবার এ খবর জানতে পারে। তাঁর মরদেহের সনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে হত্যা উল্লেখ করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, নিয়োগকর্তা নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে হত্যা করেছে। কিন্তু এই ঘটনার বিচার হয়নি।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ নারীর মরদেহ দেশে এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারগুলোর দাবি, অনেক মৃত্যুর ক্ষেত্রেই সন্দেহ রয়েছে। যেমন ২০১৯ সালের এপৃল মাসে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন লিলি বেগম (ছদ্মনাম)। পরে কীভাবে তিনি মিশরে গিয়ে মারা গেলেন, সেই রহস্যের সমাধান আজও হয়নি।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাঁদের মধ্যে কতজন ফিরে এসেছেন, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। তাঁদের অধিকাংশই নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া অন্তত ৮০০ নারীর লাশ দেশে এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারী মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে গিয়ে কত নারী বিপদে পড়েছেন বা ফিরে এসেছেন, তার সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। কারণ ভয় ও সামাজিক অপবাদের কারণে অনেকেই নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করেন না। তবে যে চিত্র সামনে আসে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারীদের ওপর নিপীড়নকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়—কাজ ও বেতনসংক্রান্ত সমস্যা, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন নির্যাতন। অনেক ক্ষেত্রে এই নির্যাতন এতটাই ভয়াবহ যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
এ বিষয়ে কথা বলতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব নেয়ামত উল্লা ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে কয়েক ঘণ্টা পর আবার ফোন করা হলেও একই কথা বলে কল কেটে দেন।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া নারীদের অধিকাংশই সৌদি আরবে যান। ২০১৫ সালের পর থেকে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবের শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আহমেদ আল ফাহাইদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে নারী কর্মী পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে। গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ নারী সৌদি আরবে গিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ প্রবাস থেকে অর্থ পাঠিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলেছেন, আবার অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন।
উল্লেখ্য, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ—সব নারীর জন্য। অর্থাৎ দেশে থাকা নারীদের যেমন অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি প্রবাসে থাকা নারীদের ক্ষেত্রেও তা নিশ্চিত করা জরুরি।











































