রবিবার- ৩১ আগস্ট, ২০২৫

সিরাজ-দুলাল দুই ভাইয়ের কব্জায় কেজিডিসিএল!

সিরাজ-দুলাল দুই ভাইয়ের কব্জায় কেজিডিসিএল!

ড় ভাই সিরাজ পাটোয়ারী সিবিএ নেতা। আর ছোট ভাই দোলোয়ার হোসেন পাটোয়ারী ওরফে দুলাল ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির নেতা। ব্যস, আর কি লাগে! এক ভাইয়ের দাপটে কাঁেপ পুরো প্রতিষ্ঠান। আরেক ভাইয়ের কথায় অচল হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানের সব উন্নয়ন কার্যক্রম।

সেই হতভাগা প্রতিষ্ঠানটির নাম কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। যেটি এখন সিরাজ পাটোয়ারী ও দুলাল পাটোয়ারীর কব্জায় পুরোপুরি। তাদের দাপটের কাছে মাথা নত প্রতিষ্ঠানটির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।

তবে গুটি কয়েক কর্মকর্তার ইন্ধনে প্রতিষ্ঠানটির এই বেহাল দশা বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের ভুক্তভোগী মানুষগুলো। যাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে নানা অনিয়ম আর দূর্নীতির করালগ্রাসে প্রতিনিয়ত পকেটের টাকা খোয়াচ্ছে চট্টগ্রামের মানুষ।

আর পকেট ভারী করছে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিবিএ নেতা ও ঠিকাদাররা। যাদের সিংহভাগই চট্টগ্রামের বাইরের জেলা থেকে আসা। তাদের অন্যতম সিরাজ পাটোয়ারী ও দুলাল পাটোয়ারী দুই ভাই।

জানা গেছে, তারা উত্তরবঙ্গের লোক। কেজিডিসিএলে চুতর্থ শ্রেণির চাকরির সুবাধে চট্টগ্রামে আসেন সিরাজ পাটোয়ারী। বনে যান সিবিএ নেতা। আর ছোট ভাইকে চাকরির বদলে কেজিডিসিএলের ঠিকাদার নিযুক্ত করেন। তিনিও হয়ে উঠেন ঠিকাদার কল্যান সমিতির নেতা।

ব্যস, সিবিএ ও ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির দাপটে ক্রমেই নিজেদের কব্জায় করে নেন কেজিডিসিএলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। সেই থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে গ্যাস সংযোগের টেন্ডার ভাগিয়ে নিয়ে গোপন চুক্তিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে হাতাতে থাকেন মোটা অঙ্কের টাকা।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কের অক্সিজেন জালালাবাদ এলাকায় একটি নীটওয়্যার কারখানায় ধরা পড়ে এ ধরণের জালিয়াতি। জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর আগে গ্যাস সংযোগে ৯৪ কেজি বয়লার লাগানোর অনুমতি পান কেজিডিএিসএল থেকে।

কাজ পান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শাওন এন্টারপ্রাইজ। যার স্বত্ত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারী ওরফে দুলাল পাটোয়ারী। কিন্তু সেখানে গোপন চুক্তির মাধ্যমে লাগানো হয় ২৫০ কেজির বয়লার। যা ব্যবহারে আড়াইগুণ বেশি গ্যাস অপচয় হয়।

আরও পড়ুন :  সীতাকুন্ডে অস্ত্র কারখানায় সেনাবাহিনীর হানা, সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার ৪

নীটওয়্যার কারখানার সংশ্লিষ্টরা জানান, দুলাল পাটোয়ারী ২৫০ কেজির বয়লার বসিয়ে দ্বিগুণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। আর প্রতিমাসে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া গ্যাস বিলের অর্ধেক পকেটে ভরে দুলাল পাটোয়ারী। যার সাথে যোগসাজশে ছিল প্রতিষ্ঠানটির একজন ব্যবস্থাপকও। গত মাসে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি ধরা পড়লে কারখানাটির গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় কেজিডিসিএল। পরে ৯৪ কেজি বয়লারের স্থলে ফের ১০০ কেজির বয়লার বসিয়ে দেয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নীটওয়্যার কারখানার মালিকপক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বয়লাররের কারণে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। জরিমানা দিয়ে সমস্যাটি সমাধান করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে আর কোন কথা বলতে চাই না মালিকপক্ষ। বললে যদি সমস্যা বাড়ে, সেই ভয়ে।

দ্দধু ওই নীটওয়্যার কারখানা নয়, শাওন এন্টাপ্রাইজসহ দুলাল পাটোয়ারীর একাধিক লাইসেন্সের অধীনে নগরীর বিভিন্ন শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ নতুন গ্যাস সংযোগে এ ধরণের কারচুপি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। লুট করছে রাষ্ট্রের সম্পদ। যা তদন্ত করলে সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে জোর দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, দুলাল পাটোয়ারীর আরও বড় ধরণের জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হয়েছে। সেটা হলো শাওন এন্টারপ্রাইজের নামে সাম্প্রতিক সময়ে পতেঙ্গায় বিপিসি নিয়ন্ত্রণাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারীর সি এম এস আভ্যন্তরীণ গ্যাস লাইনের জরুরী রক্ষনাবেক্ষণ কাজে আর এফ কিউর মাধ্যমে ১৮ লক্ষ টাকার কার্যাদেশ বিনা টেন্ডারে ভাগিয়ে নেন দুলাল পাটোয়ারী। অথচ এ পদ্ধতিতে ৬ লাখ টাকার বেশি কার্যাদেশ দেওয়ার নিয়মই নেই।

আরও পড়ুন :  পিআরও‘র আড়ালে বেলাল কেজিডিসিএলের ঠিকাদারও?

এর মধ্যে রয়েছে আরও বড় ধরণের কারচুপি ও সরকারি অর্থ লোপাটের ঘটনা। সেটি হলো কার্যাদেশ শেষে ইস্টার্ন রিফাইনারী থেকে নেওয়া কার্যাদেশ সমাপ্তির প্রত্যয়নে ৮২ লক্ষ টাকা খরচ দেখানো হয়। যা পুরো তুলে আত্নসাৎ করেছেন দুলাল পাটোয়ারী। আর এই কারচুপিতে ইস্টার্ন রিফাইনারীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কেজিডিসিএলের এক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ও ডেপুটি ম্যানেজার (ডিএম) কামরুল ইসলামের যোগসাজশ রয়েছে। কামরুল ইসলাম সম্প্রতি দুদকের তদন্তে অভিযুক্ত আসামি বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির একাধিক ঠিকাদার।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, দুলাল পাটোয়ারী নিজের ক্ষমতা পোক্ত রাখতে ফের ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির যুগ্ম সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন। আগামি ১ সেপ্টেম্বর এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলে তিনি ভোট কেনার চেস্টায় আছেন।

অন্যদিকে তার বড় ভাই সিরাজ পাটোয়ারী গত কয়েকমাস আগে চাকুরি থেকে অবসর নিলেও সিবিএ নেতা হিসেবে আগের মতোই সক্রিয় রয়েছেন। সিবিএ নেতার দাপটে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হয়েও কেজিডিসিএল থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন। দূর্নীতির টাকায় চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার এলাকায় তিন ইউনিটের ৬ তলা ভবন গড়ে তুলেছেন তিনি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যাংকে তার হিসাবে কোটি কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে বলে জানান তার ঘনিষ্ট নির্ভরযোগ্য কয়েকজন।

ঠিকাদাররা আরও জানান, কেজিডিসিএলে দুই শতাধিক ঠিকাদার কাজ করলেও কোন ঠিকাদারের ভাগ্যে তেমন কাজ জুটে না। তাদের দুই ভাইয়ের দাপটে অনেক ঠিকাদার টেন্ডার পর্যন্ত ড্রপ করতে পারে না। ফলে ঘুরেফিরে প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কাজের টেন্ডার পায় দুলাল পাটোয়ারী। এর মধ্যে কেউ যদি কোনভাবে একটি কাজ পেয়েও যায় সেখানে গিয়ে দুলাল পাটোয়ারী নানারকম কুমন্ত্রণা দিয়ে ওই ঠিকাদারের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের দুই ভাইয়ের অত্যাচারে কেজিডিসিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার, এমনকি সেবাপ্রার্থী চট্টগ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন :  ইসলামী ব্যাংকের ১৬০০ কোটি টাকা গায়েব

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুলাল পাটোয়ারী মুঠোফোনে বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারীর কাজের টেন্ডারই তো হয়নি। তাহলে কাজটি আমি পেলাম কিভাবে? আর এই কাজটি ছিল আর এফ কিউর। যেখানে ৬ লাখ টাকার বেশি কার্যাদেশ হয় না। কিন্তু কাজটি তো ১৮ লাখ টাকার। আপনাকে যে এই তথ্য দিয়েছে সে ভুল দিয়েছে। একপর্যায়ে তিনি ব্যস্ততা দেখান। শেষে ৩০ আগস্ট শনিবার সকাল ১১টার মধ্যে সাক্ষাতের সিডিউল দেন। কিন্তু তখন থেকে অপেক্ষায় থাকলেও শনিবার দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত তার কোন সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে কথা বলতে তার বড় ভাই সিবিএ নেতা সিরাজ পাটোয়ারীর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি। এ কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোন করে কেজিডিসিএলের ডেপুটি ম্যানেজার (ডিএম) কামরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারীর কাজের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। এ কাজে কীভাবে আমার যোগসাজশ থাকতে পারে।

দুলাল পাটোয়ারীর সাথে সম্পর্ক কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি এখানকার নিবন্ধিত ঠিকাদার। তার মতো আরও ২০০-৩০০ ঠিকাদার আছে। সবার সাথে যেমন সম্পর্ক ঠিক দুলাল পাটোয়ারীর সাথেও আমার সম্পর্ক তেমন। তার সাথে বিশেষ কোন সম্পর্ক নেই আমার। কেউ যদি বলে থাকে তাহলে সব মিথ্যা বলেছে।

দুদকের তদন্তে অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, দুদকে অভিযোগ হয়েছে সেটা জানি। অভিযুক্ত কি না সেটা জানি না। দুদকের মামলা সম্পর্কেও আমার জানা নেই।

ঈশান/খম/বেবি

আরও পড়ুন