বিশ্বের ধনী মুসলিম দেশ সৌদি আরবে ৩৫ জনে একটি কোরবানি। আর বাংলাদেশে ১৫ জনে একটি। কোরবানিতে সৌদিকেও ছাড়িয়ে বাংলাদেশ। শুধু কি সৌদি আরব? সারা বিশ্বে কোরবানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ।
সূত্রমতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর দেশে কোরবানি হয় কোটির ওপরে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে পশু কোরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি। এর মধ্যে ৪৭ লাখ গরু ও মহিষ। আর বাকি ৪৪ লাখ ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেবার পশু কোরবানি কম হয়েছে।
২০২১-২৪ সাল পর্যন্ত ক্রমাগত পশু কোরবানি বেড়েছে। তথ্য বলছে, ২০২১ সালে দেশে কোরবানি করা পশুর সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ ৯৩ হাজার। পরের বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯ লাখ ৫০ হাজার। ২০২৩ সালে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। আর ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪ লাখ।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম। সে হিসাবে দেশে ১৫ কোটির বেশি মুসলমান রয়েছে। ফলে দেশে প্রতি ১৫ জন মুসলিমের বিপরীতে একটি পশু কোরবানি হয়।
পেছনে পড়ে রয়েছে জনসংখ্যায় সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়াও। আয়তনের দিক থেকে ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বড়। যার জনসংখ্যা প্রায় ২৯ কোটি।
দেশটির ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তাদের জাতীয় বার্তা সংস্থা আন্তারার (ANTARA) প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বছরে ইন্দোনেশিয়ায় পশু কোরবানির হয় ২০ থেকে ২৫ লাখের মতো।
সৌদি আরবে প্রতি বছর পশু কোরবানি হয় মাত্র ১০ থেকে ১৫ লাখ। এ সংখ্যার মধ্যে হাজিদের কোরবানি করা পশু অন্তর্ভুক্ত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। যারা শুধু সচ্ছলই নন; বরং একাধিক পশু কোরবানি দেওয়ার মতো অর্থশালীও।
দেশটিতেএ জনগোষ্ঠীর তুলনায় পশু কোরবানির হার কম হওয়ার কারণ, সেখানে পশু কোরবানি হয় সমন্বিতভাবে। বাংলাদেশের মতো ঘরে ঘরে বা প্রতিটি সামর্থ্যবান পরিবারের আলাদাভাবে কোরবানি দেওয়ার সংস্কৃতি নেই সেখানে।
বিশ্বের আরেক মুসলিম দেশ পাকিস্তানেও প্রতি বছর গড়ে ৭০-৮০ লাখ পশু কোরবানি হয়। পাকিস্তান ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (পিটিএ) এবং স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
তুরস্কেও প্রতি বছর আনুমানিক ৩৫ থেকে ৩৮ লাখ গবাদি পশু কোরবানি দেওয়া হয়। এ তথ্য দিচ্ছে দেশটির ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তর এবং তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট। সংখ্যার বিচারে এটি বাংলাদেশের মোট এক-তৃতীয়াংশ।
ভারতেও মুসলিম আছে প্রায় ২১ কোটি। কিন্তু কত পশু কোরবানি দেওয়া হয়, তার কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, সে সংখ্যাটি বাংলােদশের কাছাকাছি। এছাড়া ইরাক, ইরান, কাতার, ইউএইসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর জনসংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। দেশগুলোতে কোরবানির সংখ্যাও কম।
বাংলাদেশে কেন এত বেশি পশু কোরবানি হয় জানতে চাওয়া হয়েছিল অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল বায়েসের কাছে। তিনি বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়েও পারিবারিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক একক আধিপত্য দেখাতে অনেকেই পশু কোরবানি দেয়। ধনী বা বুর্জোয়া শ্রেণির কাছে এটা একটা প্রতিযোগিতা।
অথচ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে কোরবানি হয়। সমন্বিত কোরবানি হয় বলে সে সংখ্যা অনেক বেশি নয়।’ মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি কোরবানিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার কথাও বলেছেন। যত্রতত্র পশু কোরবানি না দিয়ে নির্ধারিত জায়গায় পশু কোরবানি দেওয়ার গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন তিনি। একই সঙ্গে সমন্বিত পশু কোরবানির ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শরীফুল হক বলেন, দেশে একক কোরবানির কারণে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি কোরবানি আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ কোরবানিকে প্রাধান্য দেন, ফলে কেউ অর্থনৈতিক চাপে থাকলেও তিনি চেষ্টা করেন কোরবানি দিতে। এ কারণেই কোরবানি করা পশুর সংখ্যা বাংলাদেশে অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, এ বছরও কোরবানির জন্য ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশুর সরবরাহ রয়েছে সারা দেশে। যার বিপরীতে চাহিদা রয়েছে এক কোটির মতো। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত থাকায় এবার কোরবানিতে পশুর সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই— বলছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
অন্য দেশগুলোতে কোরবানি হার কেন কম
ইন্দোনেশিয়ায় অনেকে সচ্ছল পরিবার হলেও আলাদাভাবে, এমনকি নিজের বাড়ির সামনেও এককভাবে পশু কোরবানি দেয় না। সেখানে পুরো সমাজ বা মহল্লা মিলে স্থানীয় মসজিদ কমিটিকে টাকা দেয়। তারা যৌথ তহবিল দিয়ে সীমিতসংখ্যক বড় পশু (যেমন গরু) কিনে কোরবানি দেয়।
বিশেষ করে গরুর ক্ষেত্রে সাতজন মিলে ভাগাভাগি করে বা সমন্বিত কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি দেশটিতে। যে কারণে কোরবানি দেওয়া পশুর সংখ্যা কোরবানিদাতার চেয়ে কম হয়। আবার পাকিস্তানেও যৌথ কোরবানির হার অনেক বেশি। সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মিলে সাধারণত সাত ভাগে একটি বড় গরু বা মহিষ কোরবানি দেয়।
এ ছাড়া মুসলিম দেশের মধ্যে সৌদি আরব এবং তুরস্কের নিজস্ব জনসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে কম হলেও দেশ দুটিতে মোট জনসংখ্যার তুলনায় পশু কোরবানির হার অনেকটাই কম। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, নগরায়ণ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের ভিন্নতা।
তুরস্কে যত্রতত্র, রাস্তার মোড় বা বাড়ির গ্যারেজে পশু জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেখানে শুধু সরকার নির্ধারিত যান্ত্রিক কসাইখানায় কসাইদের মাধ্যমে কোরবানি দেওয়া যায়। কড়াকড়ির কারণে দেশটির বেশিরভাগ নাগরিকই ব্যক্তিগতভাবে পশু কেনার ঝামেলায় যেতে চান না। এ ছাড়া তুর্কি নাগরিকদের মধ্যে নিজে পশু না কিনে দাতব্য সংস্থায় টাকা দেওয়ার প্রবণতা বেশি। এ সংস্থাগুলো তুরস্কের বাইরে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র মুসলিম দেশগুলোতেও পশু কোরবানি দেয়। ফলে তুরস্কের মূল ভূখণ্ডে পশু জবাইয়ের সংখ্যা অনেক কম।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় সৌদি আরবের জনসংখ্যা অনেক কম হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দেশটিতে কোরবানির সংখ্যা কম। সৌদির নাগরিকরা অনেকেই সরাসরি পশু না কিনে বিভিন্ন চ্যারিটি ফান্ড বা ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা জমা দেন। অনেক সময় পুরো একটি একান্নবর্তী পরিবার বা বংশের পক্ষ থেকে মাত্র একটি বা দুটি পশু কোরবানি দেওয়া হয়।
তথ্যসূত্র- কনস্যুলেট ওয়েবসাইট