
দেশের এক সময়ের স্বনামধন্য ইসলামী ব্যাংকের ১৬০০ কোটি টাকা গায়েবের ঘটনায় চট্টগ্রামের বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের সদস্যসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান ও উপপরিচালক মুনাবীল হক বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ পৃথক মামলা দুটি করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপপরিচালক সুবেল আহমেদ শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সকালে মামলা দুটির তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সুবেল আহমেদ বলেন, ৫৪৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এস আলমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে এবং এক হাজার ৭৭ কোটি ১১ লাখ টাকা আত্নসাতের অভিযোগে এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যসহ ৯টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলার তদন্তকালে অপরাধের সাথে সংগতিপূর্ণ অন্য কোনো তথ্য কিংবা অন্য কারও স¤পৃক্ততা পাওয়া গেলে তা আমলে নেওয়া হবে বলে জানান উপপরিচালক সুবেল আহমেদ।
এক হাজার ৭৭ কোটি টাকা আত্নসাতের মামলা
ইসলামী ব্যাংক থেকে এক হাজার ৭৭ কোটি টাকা আত্নসাৎ করে পাচারের অভিযোগে বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার স্ত্রী-সন্তান, ভাই-ভাগ্নেসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক তাহাসীন মুনাবীল হক বৃহ¯পতিবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করেন। মামলার আসামিরা হলেন- এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ, তার ভাগ্নে মোহাম্মদ মোস্তান বিল্লাহ আদিল, ভাই আব্দুস সামাদ, ওসমান গণি, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হাসান ও রাশেদুল আলম, স্ত্রী ফারজানা পারভীন, ছেলে আশরাফুল আলম ও আহসানুল আলম, মেয়ে মায়মুনা খানম, ভাইয়ের স্ত্রী শারমিন ফাতেমা।
মামলায় ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে মিফতাহ উদ্দীন, মোহাম্মদ সাব্বির, মাহবুব উল আলম, মনিরুল মওলা, কায়সার আলী, এহসানুল ইসলাম, সিরাজুল কবীর, মনজুর হাসান ও তাহের আহমেদ চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডিগনিটি বিজনেসের মালিক মো. সাইফুদ্দীন, ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্সের মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, মিনহাজ করপোরেশনের এমদাদুল ইসলাম, জিনিয়াস ট্রেডিংয়ের আবুল কালাম, ক্রাফট বিজনেসের তারিকুল ইসলাম চৌধুরী, এপারচার ট্রেডিংয়ের এস এম নেছার উল্লাহ, দুলারী এন্টারপ্রাইজের সাদেকুর রহমান, ইউনিক ট্রেডার্সের তারেকুল ইসলাম চৌধুরী, আনসাব এন্টারপ্রাইজের আনসারুল ইসলাম চৌধুরী, গ্রিন এক্সপোর্ট ট্রেডার্সের এম এ মোনায়েম এবং আইআইএস কনসাল্টিংয়ের ওয়াহিদুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আসামিরা পর¯পরের যোগসাজশে যোগ্যতা নিরূপণ না করে আয়সীমা বাড়িয়ে দেখিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৭৭ কোটি ১১ লাখ টাকা চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব নম্বরে স্থানান্তর করেন।
এরপর সেই টাকা এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এস আলম অ্যান্ড কো¤পানি, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিল, চেমন ই¯পাত, গ্লোবাল ট্রেডিং, মায়মুনা ট্রেডিং, ইনফিনিটি সি আর স্টিলস, এস আলম ট্রেডিং কো¤পানির নামে থাকা বিভিন্ন হিসেব নম্বরে জমা করেন। সুদে-আসলে সেই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২৮১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা এস আলম গ্রুপের কো¤পানিগুলোর মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে বলে দুদকের তদন্তে তথ্য মিলেছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে দুর্নীতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচারের অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪০২, ৪০৯, ১০৯ ও ৪২০ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
৫৪৮ কোটি টাকা পাচারের মামলা
বেআইনিভাবে প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে নিজ মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫৪৮ কোটি টাকা উত্তোলন করে পাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদসহ নয় জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান বৃহ¯পতিবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে সংস্থাটির চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয়-১ এ মামলাটি করেন। মাহমুদুল হাসান জানান, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে দুর্নীতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচারের অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪০৯, ১০৯ ও ৪২০ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মিফতাহ উদ্দিন, মোহাম্মদ মনিরুল মাওলা ও আকিজ উদ্দীন, মেহের ¯িপনিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান ও পরিচালক শওকত উসমান, টপ টেন ট্রেডিং হাউজের মালিক আলমাছ আলী, গোল্ড স্টার ট্রেডিং হাউজের মালিক বেদারুল ইসলাম এবং আলম ট্রেডিংয়ের মালিক নুরুল আলম।
মামলায় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আসামিরা পর¯পরের যোগসাজশে ওই সময়ে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৫৪৮ কোটি টাকা মেহের ¯িপনিং, টপ টেন ট্রেডিং, গোল্ড স্টার ট্রেডিং ও আলম ট্রেডিংয়ের বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব নম্বরে স্থানান্তর করেন।
এরপর সেই টাকা নেওয়া হয় এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, সোনালী ট্রেডার্স, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ও এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় চলতি হিসাবে। এরপর সেই টাকা পাচার করা হয়েছে বলে দুদকের তদন্তে তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে সুনামের সাথে নেতৃত্ব দেয়া ইসলামী ব্যাংক গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দখলে নিয়েছিল এস আলম গ্রুপ। ব্যাংকটির সিংহভাগ মালিকানা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্নসাৎ করে পাচারের অভিযোগ আছে এস আলমের বিরুদ্ধে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার এসে ব্যাংকটিকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে।