
# টয়লেট ইজারায় নাড়ছেন কলকাঠি
# ডিইএন-১ দপ্তর যেন যৌনশালা
# যোগসাজশে চিফ ইঞ্জিনিয়ার তানভিরুল
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সংস্কার কাজের ইজারায় নানা অনিয়মের মাধ্যমে উলঙ্গ দূর্নীতি করেই চলেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন-১) আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গর্বিত সন্তান তিনি। যিনি সামান্য টয়লেট ইজারার কমিশন হাতাতে করছেন নানারকম জোচ্চুরি।
এমন অভিযোগ ঠিকাদারদের। ঠিকাদারদের ভাষ্য, গত দেড় বছর ধরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ এর চেয়ারে বসে রেলওয়ে সংস্কার কাজের টেন্ডার জালিয়াতি করে একের পর এক দূর্নীতি করে চলেছেন তিনি। প্রতিবছর অর্থবছরে এপিপির ৩০-৩৫ কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে ১০% হারে কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছেন এই প্রকৌশলী। যাকে বলা হয় উলঙ্গ দূর্নীতি।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সন্তান তিনি। ঘরের কাছে সরকারি চাকরি করার সুযোগ পাওয়ায় ঠিকাদারদের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন তিনি। এ কাজে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত স্থানীয় কিছু ঠিকাদারকে কাজের সুবিধা দিয়ে নিজের পক্ষে রেখেছেন। যারা ঢাল হিসেবে কাজ করেন।
সর্বশেষ চট্টগ্রাম রেলওয়ের নতুন ষ্টেশনের টয়লেট ইজারায়ও মোটা অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেওয়ার ঘৃণ্যতম ঘটান ঘটিয়েছেন তিনি। তার এসব অপকর্মের সাথে জড়িত রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার তানভিরুল ইসলাম। গত বছর শুরুর দিকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদানের পর তিনি টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্যের হাট বানিয়ে ফেলেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলকে।
এরমধ্যে নোয়াখালী লাকসাম রেলগেইট সংস্কার কাজে ঠিকাদার নিয়োগে জালিয়াতি ও অনিয়ম, যা বাস্তবায়ন হচ্ছে এই ডিইএন-১ প্রকৌশলী আবু রাফির তত্ত্বাবধানে, রেলওয়ে পাহাড়তলী সরঞ্জাম ক্রয় দপ্তরের অফিস ভবন পূন:নির্মাণ কাজ, যা বাস্তবায়ন হচ্ছে-ডিইএন-২ প্রকৌশলী জিশান দত্ত এবং চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা থেকে সংগৃহীত আমীমাংসিত রেলবিটের স্ক্র্যাপ পাচার, যা ডিইএন-৩ ও সেতু প্রকৌশলী রিয়াসাদ ইসলামের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন হচ্ছে।
এমনকি ডিইএন-১ দপ্তরকে অঘোষিত যৌনশালা বানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন। যেখানে কয়েকমাস আগে সন্ধ্যার দিকে অসামাজিক কার্যকলাপে দুই কর্মচারীকে হাতে-নাতে ধরে ফেলেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অফিস সহকারী। কিন্তু এ নিয়ে দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু রাফি মো. ইমতিয়াজ হোছাইন।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম. আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. মাহবুবুর রহমান গত ১৩ জানুয়ারি বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু রাফি ও উচ্চমান সহকারী নজরুল ইসলামের যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে টয়লেট ইজারা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে টয়লেট ইজারায় নানা অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার অনুরোধ করেন তিনি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন গত ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নতুন স্টেশনের গণশৌচাগার ইজারা কার্যক্রম সম্পন্নের জন্য একটি ইজারা দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। বিজ্ঞপ্তিটি ১২ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) দপ্তরের ডেসপাস শাখায় গৃহীত হয়।
তবে অভিযোগে বলা হয়েছে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই দুটি জাতীয় দৈনিকে একই দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। বিষয়টি আরও সন্দেহজনক, কারণ ওই পত্রিকাগুলোর বাংলা ও ইংরেজি উভয় সংস্করণের অনলাইন ভার্সনে এই বিজ্ঞপ্তির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এতে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিও ভুয়া বলে দাবি করা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা যোগসাজশে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম নতুন স্টেশনের টয়লেট ইজারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অভিযোগকারী দাবি করেন, কোনো একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই প্রক্রিয়া স¤পন্ন করা হচ্ছে। যা দেশের প্রচলিত আইন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫-এর পরিপন্থী।
অভিযোগকারীর দাবি, দ্বিতীয়বার প্রকাশিত ভুয়া ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে বিভাগীয় প্রকৌশলীর স্বাক্ষরের তারিখ ছিল ১ জানুয়ারি, যা ৬ জানুয়ারি পত্রিকায় প্রকাশিত দেখানো হয়। অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) দপ্তরে জমা দেওয়া অনুলিপিতে স্বাক্ষরের তারিখ দেখা যায় ১১ জানুয়ারি। এতে প্রমাণিত হয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিও নকল।
অভিযোগে বলা হয়, এ ধরনের কর্মকান্ড ফৌজদারি অপরাধের শামিল। তাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইজারা বিজ্ঞপ্তির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
এর আগে গত বছর অক্টোবর মাসে এই টয়লেট ইজারা প্রক্রিয়ায় সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা স¤পন্ন হওয়ার পর হঠাৎ মধ্যরাতে দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত করে চিফ ইঞ্জিনিয়ার। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারেরা।
তাদের অভিযোগ, রেলওয়ের ভেতরে প্রভাবশালী শ্রমিক লীগ নেতা কামাল পারভেজ বাদলের ইঙ্গিতে দরপত্র স্থগিত করে সুবিধাভোগী পক্ষকে সুযোগ দিতেই চলছে এসব কারসাজি চক্রান্ত। বাদল এই টয়লেট ইজারার আড়ালে ইয়াবা, গাজা ও বাংলা মদসহ নানারকম মাদকদ্রব্য বিক্রী করে আসছে। বাদলের পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করছে দৈনিক কালবেলা পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরোর এক সাংবাদিক নেতা। তিনি চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর অনুগত ও ফ্যাসিসস্টের দোসর।
জানা গেছে, শ্রমিক লীগ নেতা বাদল জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ৫ই আগস্টের পর কোতোয়ালি থানায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে ফ্যাসিস্ট সাংবাদিকের জোরে ফের রেলওয়েতে প্রভাব কাটাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। এমন একজনের প্রভাবে রেলওয়ে দরপত্র স্থগিত করায় বিস্মিত ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্টের কারণে বঞ্চিত ঠিকাদার ব্যবসায়ীরা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশল (ডিইএন-১) অফিস সূত্র জানায়, গত ১৫ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নতুন রেলস্টেশনের টয়লেট ইজারা দেয়ার জন্য প্রথমবারের মতো বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। ইজারায় অন্তর্ভুক্ত ছিল ৬টি টয়লেট, ৩টি অজুখানা, ২টি প্রস্রাবখানা ও কয়েকটি বেসিন।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২৯শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দরপত্রের শিডিউল বিক্রি হয় এবং ৩০শে সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়ার সময়সীমা ছিল। সেদিন দুপুরে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিমের কার্যালয়ে দরপত্র বাক্স খোলা হয়। মোট সাতটি দরপত্র জমা পড়ে।
সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মেসার্স এম আর ইন্টারন্যাশনাল ৫ লাখ ৫ হাজার টাকার প্রস্তাব দেয়, যা অন্যদের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাবির মোটরস (২.৫ লাখ) এবং তৃতীয় ব্লু প্রিন্ট (২.২ লাখ)। কিন্তু দরপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই চিফ ইঞ্জিনিয়ারের নির্দেশে রাত ১০টার দিকে বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রহিমের স্বাক্ষরিত এক নোটিশে দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ওই চিঠিতে স্থগিতের কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দরপত্র খোলার পর বৈধ কারণ ছাড়া স্থগিত করা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮-এর ¯পষ্ট লঙ্ঘন। এর পেছনে প্রভাবশালী শ্রমিক লীগ নেতার তদবির ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেলওয়ের ভেতরের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রেলওয়ের বিভিন্ন ইজারা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। এবারও একই কৌশলে দরপত্র স্থগিত করে সুবিধাভোগী পক্ষকে সুযোগ দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে দৈনিক ঈশানের কার্যালয় থেকে বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে নির্ভরযোগ্য এক গণমাধ্যমকর্মীকে তিনি বলেছেন, যেটা পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি সেটা পত্রিকায় গেছে। আর যেটা প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে গেছে সেটা আমাদের নোটিফিকেশন কপি। এটা যেকোনো সময় পাঠানো যায়। ওপেনিং হওয়ার আগ পর্যন্ত পাঠানো যায়।
তিনি আরও বলেন, বিজ্ঞপ্তি আর এটার মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা কপি বা অনুলিপি। ১১ তারিখ, ১ তারিখ আর ৬ তারিখের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যোগসাজশ ও অনিয়মের অভিযোগ স¤পর্কে তিনি বলেন, এখানে যোগসাজশ বা অনিয়মের কিছু নেই।
একই কথা বলেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার তানভিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, টয়লেট ইজারা নিয়ে কোন অনিয়ম হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। আর ওই দপ্তরে নারী ঘটিত বিষয়টি তদন্তে কমিটি হয়েছে। তবে ওই তদন্ত রিপোর্ট আমার কাছে আসেনি। এটি সম্ভব বিভাগীয় মহাব্যবস্থাপকের বরাবরে গেছে। তাই ঘটনাটি সম্পর্কে বিষদ কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না।
অমীমাংসিত রেল বিটের ঘটনা তদন্তেও কমিটি হয়েছে। কমিটি এখনো রিপোর্ট জমা দিতে পারেনি। যতদুর শুনলাম এ কাজে চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট কেউ সহযোগীতা করছে না। তারা সহযোগীতা না করলে তো আমাদের কিছুই করার নেই।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ডিইএন-১ এর ইজারা অনিয়মের বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর (পূর্ব) দপ্তরের কাজ। উনার সঙ্গে কথা বলেন। ডিইএন-১ দপ্তরে নারী ঘটিত ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।
(বি: দ্র : দ্বিতীয় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে শিগ্রই। এই দপ্তরের নানা অনিয়মের তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করার জন্য দৈনিক ঈশানের পাঠকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ রইল)









































