
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে জয়ের পথে রয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর মো. হেলাল উদ্দীন। এই আসনে ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেও ঝড়ে পড়েছেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
তিনিই ছিলেন ব্যারিস্টার মীর মো. হেলাল উদ্দিনের শক্ত প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী। যাচাই-বাছাই ও আপিলে তার মনোনয়ন টিকেনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম আসনটি ছেড়ে দিয়েছে জোট প্রার্থী খেলাফতে মজলিসের জন্য। তাই মীর মো. হেলাল উদ্দীনের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন আসনটির ভোটাররা।
ভোটারদের মতে, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসে ১৯৭৯ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরশাদের আমলে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে দুই দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এরশাদের মন্ত্রীসভার সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। এরশাদের পতনের পর দীর্ঘসময় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকেন। ২০০৭ সালে এক-এগারো পরবর্তী সময়ে তিনি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার দফা সংসদ নির্বাচনে চারবারই তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মহাজোটের সংসদ সদস্য হিসেবে একবার তিনি পানিস¤পদ মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির মূলধারা থেকে বের হয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ কয়েকজন নেতা সম্প্রতি আলাদা দল গড়েছেন।
গত ৮ ডিসেম্বর আনিসুল ইসলাম মাহমুদের জাতীয় পার্টি এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি-জেপির নেতৃত্বে ২০টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) নামের একটি জোটের আত্নপ্রকাশ হয়।
গত ২৩ ডিসেম্বর আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এনডিএফর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেন। একইদিন জুলাইযোদ্ধা পরিচয়ে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ স¤পাদক মো. ওমর ফারুক জাতীয় পার্টির নেতা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে গ্রেফতারের জন্য নগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছে আলাদা আবেদন করেন। এতে তিনি আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বিরুদ্ধে জেলার হাটহাজারী থানায় ২টি এবং নগরীর কোতোয়ালী ও ডবলমুরিং থানায় ২টিসহ মোট ৪টি মামলার কথা উল্লেখ করে তাকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানান।
কিন্তু ৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও নগরীর একাংশ) আসনের মনোনয়ন পত্র যাচাইবাছাই শেষে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়ন বাতিলের ঘোষণা দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়া উদ্দিন। এরপর ১৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানিতে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রার্থীতা ফিরে পাওয়ার আবেদনও নামঞ্জুর করা হয়।
এতে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, দলীয় মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন থেকে পাঠানো মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষর মিল না থাকায় চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বাতিল হওয়া প্রার্থিতা আপিল শুনানিতেও টিকেনি।
রিটার্নীং কর্মকর্তার তথ্যমতে, হাটাহাজারী আসন থেকে ১৬ জন প্রার্থীতা চেয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও জমা দেন ১০ জন। এরমধ্যে যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক স¤পাদক মীর মো. হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. আলা উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতি উল্লাহ নূরী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. নাসির উদ্দীন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মোক্তার আহমেদ।
এছাড়া বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পাওয়ায় প্রার্থীতা অবৈধ হওয়ার পর চ্যালেঞ্জ করেছেন শাকিলা ফারজানা। সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে নির্বাচন কমিশনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলগুলোর শুনানি শুরু হয়। শুনানির এক পর্যায়ে তিনি আপিল আবেদন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থিতা চাওয়া মোহাম্মদ আবদুল মালেক বলেন, আমি এ আসন থেকে নির্বাচন করার কথা থাকলেও শেষমেষ আমাদের জোটসঙ্গী খেলাফতে মজলিসের জন্য আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাই আমি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি না।
এ আসনের বালুচড়া এলাকার বাসিন্দা সুমন বলেন, এখানে অন্য কোনো প্রার্থীদের তো কেউ ঠিকভাবে চিনে না। মীর হেলাল সাহেবের পরিচিতি ভালো। তিনি বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর নাসির উদ্দিনের ছেলে। হাটহাজারী উপজেলা ছাড়াও চট্টগ্রামে বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তিনি। সেই হিসেবে চট্টগ্রাম-৫ আসন থেকে মীর হেলাল জিতে যাবেন বলে মনে করছেন ভোটাররা।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বিকেলে মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক স¤পাদক ব্যারিস্টার মীর মো. হেলাল উদ্দিন যাযাদিকে বলেন, এলাকায় আমার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ফ্যাসিস্টের দোসর ছিলেন। তাকে হাটহাজারীর মানুষ মন থেকে ভালবাসত আমি সেটা মনে করি না। বিগত সময়ে সারাদেশের মতো রাতের ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মনোনয়ন টিকলেও স্বচ্ছ প্রতিদ্বন্ধিতায় তিনি নির্বাচিত হতেন না। বরং তার উপর ক্ষিপ্ত মানুষ ধানের শীষে ভোট দিয়ে তাকে ভরাডুবি উপহার দিয়ে প্রতিশোধ নিত।
প্রশ্নের জবাবে মীর হেলাল বলেন, আনিস নেই, তাই আমার জয় নিশ্চিত এটা মনে করি না। প্রতিদ্বন্ধিতায় যারা আছেন তারা কম শক্ত না। তবে মানুষ আমাকে ভালবাসে, ধানের শীষকে ভালবাসে। সে হিসেবে এবারের ভোটে জয় বিএনপিরই হবে। জয়ের জন্য আমি চোখ-কান খোলা রেখে খুব সতর্কভাবে কাজ করছি। আশা করি হাটহাজারীর মানুষ আমার সাথেই থাকবেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে তিনিও আত্নগোপনে চলে যান বলে যান স্থানীয় ভোটাররা।










































