
# টেবিলে টেবিলে দিতে হয় হাজার থেকে লাখ টাকা ঘুষ
# দিনে সম্পাদন হয় ১০-১২ হাজার ভুমি রেজিস্ট্রেশনের কাজ
# কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে অসহায় ভুমি মালিকরা
# নিউজ করলে বদলি হয় কিন্তু ঘুষ চলে সমানে-ভুক্তভোগীদের ভাষ্য
জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে দলিল রেজিস্ট্রেশন, বায়নানামা রেজিস্ট্রেশন, জাল দলিলের মাধ্যমে একজনের জমি অন্যজনের নামে রেজিস্ট্রেশন, দানপত্র, চুক্তিপত্র ও বন্টননামার কাজ সপ্তাহের পাঁচদিনই নিয়মিত চলে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রার কমপ্লেক্সে। চলে সরকারি বন্ধের দিনেও।
বাসা বা গোপন কোন স্থানে বসে খোলার তারিখে স্বাক্ষর দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন কাজ চালান সদর রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিদর রহমান। আর জমির পরিমাণ ও স্থান ভেদে রেজিস্ট্রেশন কাজে প্রতিটি স্বাক্ষরে ঘুষ দিতে হয় লাখ থেকে কোটি টাকা।
এতে শুধু তিনি নন, যারা টাকা দেন লাভবান হন তারাও। কারণ জমির শ্রেণী পরিবর্তন বা প্রকৃতমূল্য গোপন করে জমির দলিল বা বায়নানামা রেজিস্ট্রেশন করলে একদিকে সরকারি রাজস্ব কম আসে। কোন কোন ক্ষেত্রে জমির মূল্য বাড়ে। এতে লাভবান হন ক্রেতা-বিক্রেতা।
আবার জাল দলিল বা বায়নানামা তৈরী করে একজনের জমির অংশ অন্যজনের নামে রেজিস্ট্রেশন করার ক্ষেত্রেও লাখ থেকে কোটি টাকা পকেটে ঢুকে সাব-রেজিস্ট্রার শাহিদর রহমানের। একইভাবে দানপত্র, চুক্তিপত্র বন্টননামায়ও লেনদেন হয় লাখ লাখ টাকা।
এখানেই শেষ নয়, রেজিস্ট্রেশন অফিসের তৈরী করা সমস্যা সমাধানে কাগজপত্র বা ফাইল তল্লাশি, নকল উত্তোলন কাজেও টেবিলে টেবিলে দিতে হয় হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাদের ভাষ্য, চট্টগ্রামে জমির মূল্য সরকারি মৌজা রেটের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নানা কৌশলে লাখ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চট্টগ্রাম সদর রেজিস্ট্রার অফিস, ভুমি অফিস ও দলিল লেখকরা। আর এমন অভিযোগের তথ্যানুসন্ধানে নেমে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে ঘুরে দেখা হয় চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রার কমপ্লেক্সের কার্যক্রম।

কমপ্লেক্সের সদর ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা যায় জমি রেজিস্ট্রেশন কাজে আসা হাজারো মানুষের ভিড়। এরপর দ্বিতীয় তলার প্রথম কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, নকল নবিশসহ সকল কর্মচারীর টেবিল ঘিরে যেন মানুষের হাট। একইভাবে মানুষ ঘিরে আছে সাব রেজিস্ট্রার শাহিদরের টেবিলও। একই অবস্থা এই কক্ষের অন্যান্য কর্মচারীদের টেবিলেও।
এ সময় সাব রেজিস্ট্রার টেবিল থেকে একটি দলিল রেজিস্ট্রেশনের ছবি নেওয়া হয়, যা ছিল জাল। বিষয়টি নজরে আনেন সাব রেজিস্ট্রার শাহিদর রহমান। সেখান থেকে কক্ষের শেষ লাইনে গেলে দেখা যায় টেবিলে বসা নকল নবিশ মো. আজগর গুণছেন ঘুষের টাকা। এই ছবি তোলার পর হঠাৎ মুখে দাড়ি ও পাঞ্জাবি পড়া এক ব্যক্তি এসে বলেন, আপনি ছবি-ভিডিও করলেন কেন, আপনার মোবাইল দেন। এ কথা বলেই তিনি জোরপূর্বক মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
মোবাইল কেড়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে এই প্রতিবেদকের হাত ধরে সাব রেজিস্ট্রারের কাছে নিয়ে যান। সাব রেজিস্ট্রার শাহিদর রহমান তাৎক্ষণিক রেজিস্ট্রেশন কাজ বন্ধ করে দিয়ে বলেন, ছবি-ভিডিও করার অনুমতি আপনাকে কে দিয়েছে? উত্তরে প্রতিবেদক বলেন, আমি সাংবাদিক, ছবি-ভিডিও করাই আমার কাজ।
এ কথায় উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে শাহিদর রহমান বলেন, এটা এজালাস, এখানে ছবি তোলা নিষেধ। ছবি-ভিডিও করতে হলে আমার অনুমতি নিতে হবে। এর উত্তরে প্রতিবেদক বলেন, ছবি-ভিডিও করার অনুমতি সংবাদপত্র নিবন্ধনের সাথে যুক্ত। সরকারকে বলেন গণমাধ্যম বন্ধ করে দিতে।
এরপরও এই প্রতিবেদক বলেন, আমার কাজ আমাকে করতে দিন, কাজ শেষে অসঙ্গতি নিয়ে আমি আপনার মতামত নিব। তখন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, জনগণের হয়রানি হয় এমন কাজ আপনি করতে পারবেন না। উত্তরে প্রতিবেদক বলেন, জনগণকে হয়রানি থেকে বাচানোই সাংবাদিকের কাজ।
এক পর্যায়ে তিনি নিজের খাসকামরায় বসার কথা বলেন। তবে আরও কিছক্ষণ ঘুরে-ফিরে খাসকামরায় অনেকক্ষণ বসার পরও আর কোন কথা বলেননি সাব রেজিস্ট্রার শাহিদর রহমান। বরং এ সময়ে তিনি দলিল রেজিস্ট্রেশন সম্পাদন কাজ করেন দু‘হাতে। প্রায় ঘন্টা খানেক পর বেরিয়ে আসলে একটি পক্ষ এসে বলেন, এই দেখেন ছবি তোলায় এই জাল দলিল রেজিস্ট্রেশন করেনি সাব রেজিস্ট্রার।

বিষয়টি জানতে চাইলে আরফাত নামে রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের এক কর্মচারী বলেন, হ্যাঁ-এটা জাল দলিল। স্বাক্ষরসহ সব জাল। তাই স্যারে রেজিস্ট্রেশন করেনি। আর এমন জাল দলিল রেজিস্ট্রেশন অহরহ হচ্ছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা। এরপর কথা হয় জমি রেজিস্ট্রেশন কাজে আসা আরও কয়েকজনের সাথে।
এ সময় খোরশেদ নামে একজন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ঘুষ ছাড়া এখানে কোন কাজ হয় না। এই রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অন্তত চার‘শর মতো টেবিল আছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই দালাল। আপনার মোবাইল যে কেড়ে নিতে চেয়েছিল সেও দালাল। তার নাম মাহিম। পুরো নাম জানি না। তিনি খোদ সাব রেজিস্ট্রারের দালাল। রেজিস্ট্রি কাজের সময় তিনি সাব রেজিস্ট্রারের পাশে দাড়িয়ে থাকেন। তিনি যেটা ইয়েস বলেন, সেটায় স্বাক্ষর করেন সাব রেজিস্ট্রার শাহিদর রহমান।
প্রশ্নের জবাবে মাহিমও বলেছেন তিনি অফিসের কেউ নন, তবে তার মতো সাব রেজিস্ট্রার অফিসে অনেকেই আছে বলে দাবি করেন মাহিম। এ বিষয়ে আরফাত এক গাল হেসে বলেন, এত জানতে চাচ্ছেন কেন? মাঝেমধ্যে আসবেন খরচ-বিরচ নিয়ে যাবেন। মোবাইল কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে আরফাত বলেন, এ তো টোকাই, তার নাম মাহিম।
জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ভুক্তভোগী জানান, রেজিস্ট্রার কমপ্লেক্সে কর্মচারীরা যতগুলো টেবিলে কাজ করছে তাদের অর্ধেক দালাল। জমির মালিক বা ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকে তাদের ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে হয়। না হয় হয়রানির শিকার হতে হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ঘুষের রানী হিসেবে খ্যাত সদর রেকর্ড রুমের রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেন। দাবিকৃত ঘুষের টাকা না পেয়ে বালামে ঘষামাজা ও পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেলার মত অবৈধ অনেক অপকর্ম রয়েছে তার।
দুর্নীতিবাজ অঞ্জনা সেনের কবলে পড়ে প্রতিদিন নকল প্রতি সাধারণ জনগনকে দিতে হচ্ছে ৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কোন কোন নকল প্রতি দিতে হয় ২-৩ লাখ টাকা। টাকা না দিলে বালাম বই খুজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে হয়রানি করা হয়। গত বিশ বছর ধরে তিনি সদর রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের রেকর্ড কিপার হিসেবে এক টেবিলেই আছেন। সরকারি নিয়মানুয়ায়ী ৩ বছর পর বদলি হওয়ার নিয়ম থাকলেও বদলি হন না অঞ্জনা সেন।
অভিযোগ রয়েছে, অঞ্জনা সেন বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। সেই দাপটে চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সকে এককভাবে জিম্মি করে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা ঘুষ। তার এই ঘুষ-দুর্নীতির কালো টাকা দিয়ে ইসকনের মত সন্ত্রাসী সংগঠন ও ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে ছাএ হত্যায় অর্থের যোগান দিয়েছে অঞ্জনা সেন। সেই সাথে গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
ভারতে সল্ট লেকে রাজপ্রাসাধের মত বাড়ি ও কলকাতায় নিউমার্কেটে রয়েছে তার কয়েকটি দোকান। সেই সাথে বাংলাদেশে চট্টগ্রামের প্রাণ কেন্দ্র চকবাজারে রয়েছে বিলাস বহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট এবং অর্ধ কোটি টাকা দামের বিলাস বহুল গাড়ি, যা সম্পূর্ণ তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন।
এ বিষয়ে কথা হয় অঞ্জনা সেনের সাথে। তিনি বলেন, ভাই কারও কথা শুনে কিছু করিয়েন না। এখানে রেকর্ড তুলতে ২০০-৪০০ বা ৫০০ টাকা দেয়। এর বাইরে কিছুই হয় না। আর সব টেবিলে এভাবে নেয়। আমি একা নিই না।
বিগত বিশ বছর একই অফিসে থাকার কথা জানতে চাইলে অঞ্জনা সেন বলেন, আমার এলপিআরে যাওয়ার সময় হয়েছে, আর দুই-তিন মাস আছি। সে কারণে প্রশাসন আমাকে বদলি করছে না। না হয় আমি বদলি হতে চাচ্ছি। অঢেল সম্পদের বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে দলিল রেজিস্ট্রেশন, বায়নানামা রেজিস্ট্রেশন, একজনের জমি জালিয়াতি করে অন্যজনের নামে রেজিস্ট্রেশন, দানপত্র, চুক্তিপত্র ও বন্টন নামার কাজ নিয়মিত চলে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রার কমপ্লেক্সে।
সরকারি বন্ধের দিনেও বাসা বা গোপন স্থানে বসে খোলার তারিখের স্বাক্ষর দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন কাজ চালান সদর রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিদর রহমান। আর তার প্রতিটি স্বাক্ষরের জন্য দিতে হয় লাখ থেকে কোটি টাকা।
কারচুপি করে জাল দলিল বা বায়নানামা তৈরী করে একজনের জমির অংশ অন্যজনের নামে রেজিস্ট্রেশন করার ক্ষেত্রেও লাখ থেকে কোটি টাকা পকেটে ঢুকে সাব-রেজিস্ট্রার শাহিদর রহমানের। দানপত্র, চুক্তিপত্র বন্টননামায়ও লেনদেন হয় লাখ লাখ টাকা।

যার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে, গত বছর সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকায় একটি ছয়তলা ভবন বিক্রির তথ্য গোপন করে রেজিস্ট্রি করা। এ ঘটনায় সরকারের প্রায় ৫৪ লাখ ৮১ হাজার ৮৯৬ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। যার অর্ধেক টাকা তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার মামুনুল ইসলামের পকেটে ঢুকেছে। মিন্টু নামে একজন এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চন্দ্রিমা আবাসিকের ওই জায়গাটির প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম দেখানো হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারি ভ্যাট, স্ট্যা¤প ফি, উৎস করসহ নানা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা মামুনুলকে ঘুষ প্রদানের বিনিময়ে রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
ভবনের রেজিস্ট্রি কবলায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারি ৬২৮ নং বায়নানামা মূলে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকার প্লট নং-১৫ ও একটি ছয়তলা ভবন বিক্রয়ের চুক্তি হয়। সম্পত্তিটির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্রেতা মোহাম্মদ সরোয়ার অগ্রিম ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন এবং অবশিষ্ট ৬ কোটি টাকা বাকি রাখেন।
কিন্তু পরে ২০২৩ সালের ২১ জুন দলিল নং ৩৪৩৬ এর মাধ্যমে সম্পত্তিটি রেজিস্ট্রি করা হয় প্রকৃত মূল্যের পরিবর্তে মাত্র ৬ কোটি টাকা প্রদর্শন করে। ওই টাকা অলিখিতভাবে দাতা-গ্রহীতার মধ্যে লেনদেন হয়েছে। এর ফলে সরকার প্রায় ৫৪ লাখ ৮১ হাজার ৮৯৬ টাকা কর, ভ্যাট, উৎস আয়কর ও ফি থেকে বঞ্চিত হয়।
জানা যায়, ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শালধর বাজার এলাকার বাসিন্দা মরহুম আবদুল হামিদের ছেলে জামাল উদ্দীন মজুমদার ভবনটি বিক্রি করেছেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা নজির আহমদের ছেলে মোহাম্মদ সরোয়ারের কাছে।
অভিযোগে বলা হয়, এই তিনজনের যৌথ ভূমিকার মাধ্যমেই কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত মূল্যের ভিত্তিতে ১০ হাজার ৩৫০ বর্গফুট আয়তনের ভবনসহ সম্পত্তি বিক্রিতে সরকারের ভ্যাট, উৎস আয়কর, স্ট্যাম্প ফি ও স্থানীয় রেজিস্ট্রি ফি বাবদ লাখো টাকা পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু দলিলে মূল্য কম দেখানোর ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫ লাখ টাকার মতো কর ফাঁকি দিয়েছে এই চক্র।
এ ঘটনায় সাব রেজিস্ট্রার মামুনুল ইসলামকে বদলি করা হয়। তিনি বর্তমানে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত আছেন। সেই পদে বদলি হয়ে আসেন মো. শাহিদর রহমান। যিনি এই অল্প সময়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে দুর্নীতি, ঘুষ ও কারসাজির জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছে।
সিন্ডিকেটের অন্যতম হিসেবে কাজ করছে, মাহিম নামে বহিরাগত এক দালাল। অফিসের নকল নবিশ মো. আজগর, আরফাত হোসেন, অঞ্জনা সেন ও এরাদুল হক ভুট্টু। তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতিও। পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পরও চট্টগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ন্য থামছেনা এই ভুট্টোর কারণে।
৫ আগস্টের পর ভুট্টু আত্নগোপনে থাকলেও চাকরি, পদবি ও বেতন-ভাতা বহাল রয়েছে। অভিযোগ আছে, দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরও তাকে আধুনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি দেখানো হয়। আর তার নির্দেশেই জেলা রেজিস্ট্রার থেকে শুরু করে সাব-রেজিস্ট্রার পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভুট্টুর অনুপস্থিতিতেও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাহিম কার্যত পুরো চট্টগ্রামের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের মধ্যে আরও রয়েছেন সাবেক স্বৈরশাসক হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়ার ঘনিষ্ঠ মো. হোসাইন ওরফে ব্যান্ডিজ হোসাইন, জামাল উদ্দিন, প্রশান্ত কুমার সরকার, আফতাব উদ্দিন চৌধুরী, সদর অফিসের নকল নবিশ দিদার, কামরুল ইসলাম ও গিয়াস উদ্দিন। বদলি বাণিজ্য ও ফি আদায়ে অনিয়মের মাধ্যমে তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
চট্টগ্রাম সদরসহ অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক ও উকিলরা জানান, চট্টগ্রাম সদর রেজিস্ট্রেশন কার্যালয়ে দিনে ১০-১২ হাজার রেজিস্ট্রেশন কাজ সম্পাদন হয়। এতে প্রতিদিন কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব জমা হয়। কিন্তু তার চেয়েও বেশি হাতিয়ে নেন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শরীর থেকে ঘামের বদলে তেল বেয়ে পড়ছে। হাতিয়ে নেওয়া বন্ধ হলে সরকারি রাজস্ব ৪-৫ গুণ বৃদ্ধি পাবে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমান বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে চান্দগাঁও সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মামুনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখেছি। তদন্ত শেষে তাকে বদলি করা হয়েছে। বর্তমান সাব রেজিস্ট্রারের অভিযোগও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগকারী মিন্টু বলেন, অনিয়মের বিষয়ে পত্রিকায় নিউজ করলে বা অনিয়ম প্রমাণ হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে শুধু বদলি করা হয়। আবার ওই পদে যিনি আসেন তিনিও একই অনিয়ম শুরু করেন। তাতে ভুক্তভোগীদের কোন লাভ হয় না।
আইনজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সত্যতা মিললে শুধু বদলি নয় বা সরকারি অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সম্ভব। অনিয়ম দূর্নীতির ঘটনায় চাকরি হারানোর ঘটনা থাকলে দূর্নীতি অনেকটা কমে যেত।
(শীঘ্রই আসছে চট্টগ্রাম জেলা সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের অনিয়ম ও দূর্নীতি নিয়ে দ্বিতীয় প্রতিবেদন। প্রিয় পাঠক চোখ রাখুন দৈনিক ঈশান এর অনলাইন ও প্রিন্ট ভার্সনে)











































