
# ৫ বছরে নিজস্ব অর্থায়নে ২২ জাহাজ কেনার পরিকল্পনা
# পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না বিএসসিকে
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। যার জন্ম হয়েছে সমুদ্রে পরিবহন বানিজ্যের লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু নানাবিধ কারণে সময়ের সাথে পিছিয়ে আছে সংস্থাটি। জন্ম থেকে বেশির ভাগই লোকসান গুণতে হয়েছে সংস্থাটিকে। লাভ হলেও অঙ্কটি ছিল ছোট।
তবে গত অর্থবছরে ৩০৭ কোটি টাকা লাভ করেছে সংস্থাটি। যা এ যাবত কালের লাভের খাতায় সর্বোচ্চ। এই লাভ এখন পথ দেখাচ্ছে সংস্থাটিকে। স্বপ্ন দেখাচ্ছে জাহাজের বহর বাড়ানো নিয়ে। সে লক্ষ্যে বিএসসি গ্রহণ করেছে ওয়ান শিপ পলিসি। যে পলিসিতে আগামি ৫ বছরে বিএসসি নিজস্ব অর্থায়নে কিনবে ২২টি জাহাজ। এই পলিসি কার্যকর হলে বিএসসিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না।
বৃহস্পতিবার (৯ এপৃল) সকালে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক। এর আগে গত বুধবার বিএসসির বর্তমান কর্মকান্ড এবং ভবিষৎ পরিকল্পনা নিয়ে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় ভবনের কনফারেন্স রুমে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালেও বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন তিনি।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, সময়ের সাথে অনেক পিছিয়ে বিএসসি। বিশ্বের অনেক দুর্বল দেশও সমুদ্র পরিবহন বানিজ্যে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি ভুমিকা রাখছে। অনেক বেশি আয় করছে। এর কারণ বিএসসির জাহাজের বহর খুব ছোট।
তবে ইতোমধ্যে আমরা একটা ফিলোসফি ডেভেলপ করেছি, ওয়ান শিপ ফিলোসফি। সেটা হচ্ছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত লাভের আর্থিক সক্ষমতা ঠিক থাকলে প্রতি বছর একটি করে জাহাজ নিজস্ব অর্থায়নে কিনবে বিএসসি। আর এই লক্ষ্যের নাম দিয়েছি “ওয়ান শিপ পলিসি”। এর মধ্যে কন্ডিশনও আছে। কন্ডিশন হচ্ছে বাকি জাহাজগুলো অপারেশন করার জন্য সেই পরিমাণ অর্থ আগে স্টকে বা ব্যালেন্স থাকতে হবে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সরকারি অর্থায়নে দুটি এমআর (মিডিয়াম রেঞ্জ) প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং নিজস্ব অর্থায়নে একটি বাল্ক ক্যারিয়ার কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকায় দুটি এমআর ট্যাংকার ক্রয় প্রস্তাব একনেক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। দুটি এমআর ট্যাংকার কেনার ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা অলরেডি স্যাংশন হয়ে গেছে।
এছাড়া নিজস্ব অর্থায়নে একটা বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ কেনার প্রকল্পটি মন্ত্রনালয় থেকে হয়তো দুই একদিনের মধ্যে একনেকে চলে যাবে। একনেকে দুইটা প্রজেক্ট অনুমোদন হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা আশা করছি সবকিছু ঠিক থাকলে পরবর্তী ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে এই তিনটা জাহাজ বিএসসির বহরে যুক্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে চারটি জাহাজ সংগ্রহের প্রকল্পে অগ্রগতি হয়েছে। এ প্রকল্পে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার ও দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ পাবে বিএসসি। এরই মধ্যে গত মাসে ফ্রেমওয়ার্ক ও ঋণচুক্তি স¤পন্ন হয়েছে এবং চীনা পক্ষের স্বাক্ষর প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। আগামি মাস থেকে জাহাজের স্টিল কাটিং ও নির্মাণকাজ শুরু হবে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বলেন, ৬টি কন্টেইনার ভেসেল কেনার জন্য আমরা দীর্ঘদিন যাবত কাজ করছি। ঋণদাতা হিসেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে। তারা ছয়টা কন্টেইনার ভেসেল তৈরি করার টাকা ফান্ডিং করবে। প্রসেস চলমান আছে। তাদের সাথে টার্মস এন্ড কন্ডিশন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। লোনের ইন্টারেস্ট রেট কত হবে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে দুই তিন বছরের মধ্যে জাহাজগুলো বিএসসির বহরে যুক্ত হবে। প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা ২৫০০ থেকে ২৮০০ টিইইউ এবং ড্রাফট প্রায় ৯ দশমিক ৮ মিটার হবে। এগুলো দিয়ে ফিডার জাহাজ হিসেবে সিঙ্গাপুর এবং শ্রীলঙ্কা থেকে আমরা কার্গো আনা নেওয়া করতে পারবো। যা জাতীয় ট্রান্সপোর্টেশনের ক্ষেত্রে জাহাজগুলো ব্যাপক অবদান রাখতে পারবে।
এ ছাড়া আরও ৩টি বাল্ক ক্যারিয়ার ও ৩টি এমআর ট্যাংকার সংগ্রহের জন্য কাজ চলছে। জাহাজ সংগ্রহে জাপানকে প্রথম পছন্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশন হয়ে অর্থনৈতিক স¤পর্ক বিভাগে (ইআরডি) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং জাপানের প্রাথমিক সম্মতিও পাওয়া গেছে। তাছাড়া আরও ২টি বাল্ক ক্যারিয়ার ও ২টি ট্যাংকার সংগ্রহের প্রস্তাবও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এগুলোর জন্য বর্তমানে অর্থায়নের উৎস খোঁজা হচ্ছে বলে জানান বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, ২২টি জাহাজ নিয়ে একটি সমন্বিত বহর গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএসসি। তার মধ্যে দুইটা অলরেডি বহরে যুক্ত হয়েছে। পাইপলাইনে আছে আরও সাতটা। আশা করছি দুই এক বছরের মধ্যে ১৪টা জাহাজ আমরা বহরে যুক্ত করতে পারবো। সমস্ত প্রসেস যদি ঠিক থাকে আগামি ৫ বছরের মধ্যে বিএসসির বহরে ২২টা জাহাজ থাকবে। এ জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে ওয়ান শিপ পলিসি গ্রহণ করেছি। এ নীতির আওতায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত আর্থিক সক্ষমতা সাপেক্ষে প্রতিবছর অন্তত একটি করে জাহাজ নিজস্ব অর্থায়নে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।
তবে এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে নতুন জাহাজ কেনার আগে বিদ্যমান বহরের অপারেশন সচল রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষিত থাকতে হবে। অর্থাৎ আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেই বিনিয়োগ বাড়াবে বিএসসি। আমাদের টার্গেট হচ্ছে “টু রিচ পয়েন্ট অফ কনসিলিশন” যাতে আর কখনো বিএসসিকে পিছনে তাকাতে না হয়, বিএসসি যেন কখনো “রিগ্রেসিভ” না হয়।
বিএসসির বহরে এখন যত জাহাজ
বিএসসির তথ্যমতে, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের বহরে এক সময় ছিল ৩৮টি জাহাজ। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে মিসাইলের আঘাতে বাংলার সমৃদ্ধি ধ্বংসের পর সেই সংখ্যা দাড়ায় পাঁচটিতে। তবে ২০২৫ সালে নতুন দুটি জাহাজ যুক্ত হয় বিএসসির বহরে।
সেগুলো হলো বাংলার প্রগতি ও বাংলার নবযাত্রা। চীনের কাছ থেকে জাহাজ দুটি সংগ্রহ করে বিএসসি। এরপর বিএসসির বহরের জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতটিতে। যা সময়ের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে মন্তব্য করেছেন বিএসসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিএসসির জাহাজগুলো বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তেল আমদানিসহ আন্তর্জাতিক সমূদ্র পরিবহন বানিজ্যে ব্যাপক ভুমিকা রাখছে। এসব জাহাজ সমুদ্রে পণ্য পরিবহনে অবিরাম কাজ করছে। যা থেকে প্রচুর ডলার আয় হচ্ছে। আরও জাহাজ পণ্য পরিবহন কাজে লাগাতে পারলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
সর্বোচ্চ লাভের অঙ্কে বিএসসি
জন্ম থেকেই জ্বলছে বিএসসি। জাহাজের বহর কমার সাথে কমেছে বিএসসির আয়ও। সেই সুত্রে প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছরে বেশির ভাগ লোকসানই গুণতে হয়েছে বিএসসিকে। তবে আশার কথা হচ্ছে-সেই লোকসান কাটিয়ে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে বিএসসি। যা এ যাবত কালের লাভের খাতায় সর্বোচ্চ।
সূত্র মতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির পরিচালনা আয় ছিল ৫৯১ কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে আয় করেছে ২০৭ কোটি টাকার বেশি। সেই হিসাবে গত অর্থবছরে সংস্থাটি মোট আয় করেছে প্রায় ৭৯৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে পরিচালনা ব্যয় ছিল প্রায় ২৯০ কোটি টাকা। আর প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১২৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএসসির মোট আয় হয়েছিল ৫৯৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং মোট ব্যয় হয়েছিল ৩১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। তাতে ওই অর্থবছরে সংস্থাটির কর পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংস্থাটির মোট স¤পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। আর ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৫ সালে চীন থেকে সংগ্রহ করা বাংলার প্রগতি প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার আয় করছে। একইভাবে বাংলার নবযাত্রাও সমহারে আয় করছে। বহরে যুক্ত হওয়ার পর থেকে জাহাজ দুটি থেকে বিএসসি মোট ৫০ কোটি টাকা আয় করেছে। যা রাষ্ট্রীয় আয়ের ক্ষেত্রে বড় একটি সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমভি বাংলার প্রগতি গত বছরের ২৩ অক্টোবর ও এমভি বাংলার নবযাত্রা চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি থেকে ভাড়ায় চলাচল করছে।
শিপিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএসসির যে কয়টি জাহাজ রয়েছে, তা দেশের আমদানি-রপ্তানি বানিজ্যের জন্যও অপ্রতুল। এসব জাহাজ দেশের জন্য আমদানি পণ্য পরিবহন কাজে যুক্ত হলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিবহন বানিজ্যে প্রতি ট্রিপে দিনের আয়ের হিসাব ৩০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি হতো। কিন্তু বিশাল এই সমুদ্র বানিজ্যে বাংলাদেশ অনেকটা পিছিয়ে। তবে বিএসসির ওয়ান শিপ পলিসি এখন আশার আলো দেখাচ্ছে।











































