বুধবার- ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

চট্টগ্রামে বৈশাখের জয়গান, মঙ্গল শোভাযাত্রা

চট্টগ্রামে বৈশাখের জয়গান, মঙ্গল শোভাযাত্রা
print news

জীর্ণ-শীর্ণ পুরনো জরাকে বিদায় দিয়ে আকাশে উদিত হয়েছে পহেলা বৈশাখের নতুন সূর্য। যার রংচ্ছটা ছিল খুবই মধুর-মিষ্টিময়। চারদিকে বৈশাখের গানের সূর। এসো হে বৈশাখ, এসো-এসো। নব আনন্দে প্রাণের উচ্ছ্বাসে যেন জেগেছে বাঙালি।

দিকে দিকে বৈশাখের জয়গান, প্রাণের টানে দলে দলে আপামর মানুষ সমবেত হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ডিসি হিল ও সিআরবির শিরীষতলার আনন্দ আয়োজনে। একই সাথে শিল্পকলার অনিরুদ্ধ মুক্তমঞ্চ, বিপ্লবী যাত্রামোহন সেন হল প্রাঙ্গণ, মহিলা কলেজ মাঠ হাজারও মানুষের সম্মিলনে মুখর।

রোদ উপেক্ষা করে শোভাযাত্রায় ঘটে বিপুল মানুষের সমাগম। বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে ১৪ এপৃল মঙ্গলবার সকালে নগরীর সার্কিট হাউসের সামনে থেকে বের হয় পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক মঙ্গল শোভাযাত্রা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আয়োজিত শোভাযাত্রাটিতে নেতৃত্ব দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

ছিলেন সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বৈশাখের বর্ণিল সাজে নারী, শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন অংশ নেন শোভাযাত্রায়।

প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন মুক্তমঞ্চে উপস্থিত হয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধরে রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেছিলেন, বৈশাখের আয়োজন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংধনু জাতি গঠনের প্রত্যয় এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। শোভাযাত্রা, আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। এই চেতনা ধারণ করেই উন্নত, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

আরও পড়ুন :  চট্টগ্রামে চোখ রাঙাচ্ছে হাম

এছাড়া নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সেজেছিল নানা থিমে। কৃষক, জেলে, চা বাগানের কর্মী, খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শ্রমিকদেরও নিয়ে আসা হয়। শোভাযাত্রা নগরীর শেষ হয় ডিসি হিলে গিয়ে। প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষবরণের বড় দুটি আসর বসেছে সিআরবির শিরীষতলা ও ডিসি হিলে। প্রতিমন্ত্রী সিআরবির শিরীষতলার আয়োজনে গিয়েও বক্তব্য রাখেন।

সকাল সাড়ে ৭টায় ভায়োলিনিস্ট চট্টগ্রামের বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সিআরবিতে। নববর্ষ উদযাপন পরিষদের এ আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আছে রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ আয়োজনে ৬১টি সংগঠন গান, নাচ, আবৃত্তি, নৃত্যালেখ্য, গীতিআলেখ্যসহ আরও নানা পরিবেশনা নিয়ে অংশ নিচ্ছে বলে জানান নববর্ষ উদযাপন পরিষদের সদস্যসচিব ফারুক তাহের।

তিনি বলেন, সিআরবিতে চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষের আয়োজন ১৮ বছর পূর্ণ করেছে এবার। অন্যান্য বছরের মতো একই নিয়মে আয়োজন ছিল আমাদের অনুষ্ঠান। সময় স্বল্পতার কারণে পরিবেশনার সুযোগ দিতে পারিনি আগ্রহী অনেক সংগঠনকে।

আরও পড়ুন :  পহেলা বৈশাখে যানজট এড়াতে সিএমপির বিশেষ নির্দেশনা

সিআরবিতে এবার সকাল থেকেই লোক সমাগম অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি বলে জানান পরিষদের সংগঠক উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সাধারণ স¤পাদক শীলা দাশগুপ্ত। ডিসি হিলেও সকাল ৮টা থেকে দলীয় পরিবেশনায় মঞ্চ মাতিয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। ফাঁকে ফাঁকে একক গান, আবৃত্তি।

শীলা দাশগুপ্ত বলেন, ডিসি হিলের মুক্তমঞ্চে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষের আয়োজন করে আসছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে পহেলা বৈশাখের আগের রাতে ছাত্র-জনতার ব্যানারে গিয়ে মঞ্চ ভাঙচুর করে তাদের আয়োজন ভন্ডুল করে দেওয়া হয়।

এবার জেলা প্রশাসন বর্ষবরণের আয়োজন করেছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাসাসের সহযোগিতায়। এতে আগের আয়োজকদের অনেককেই রাখা হয়েছে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত জেএম সেন হল প্রাঙ্গণে এবার প্রথমবারের মতো বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করেছে বোধন আবৃত্তি পরিষদ। সকাল ৭টায় বোধনের শত শিল্পীর বৃন্দ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ আয়োজন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ আয়োজনে আবৃত্তি, সংগীত, যন্ত্রসংগীত, নৃত্য ও জাদু পরিবেশন করার কথা জানান বোধনের সহসভাপতি প্রণব চৌধুরী।

আরও পড়ুন :  রাউজানে বাস-অটোরিক্সার সংঘর্ষে নিহত ১, বাসে আগুন

সকাল সাড়ে ৭টায় এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের বর্ষবরণের আয়োজন শুরু হয়। এতে একক ও দলীয় গানের পাশাপাশি পরিবেশন করা হয় গীতি–নৃত্য আলেখ্য।

এছাড়া উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের একাংশ নগরীর নন্দনকানন এলাকায় দিনব্যাপী বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করে। নরেন আবৃত্তি একাডেমি আউটার স্টেডিয়ামসংলগ্ন মুক্তমঞ্চে উদযাপন করে পহেলা বৈশাখ। নগরীর সেন্ট প্লাসিডস স্কুল প্রাঙ্গণে শোভাযাত্রা, প্রদীপ প্রজ্বলন, গান, নৃত্য, যন্ত্রসংগীতসহ আরও নানা আয়োজনে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশ কেন্দ্র ফুলকি মিলনায়তনেও ছিল বৈশাখের অনুষ্ঠান।

এসো প্রাণের উৎসবে, জাগো নব আনন্দে-এ প্রতিপাদ্যে নববর্ষ উদযাপন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে জারুলতলা পর্যন্ত বৈশাখী শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে এ আয়োজন শুরু হয়। পুতুল নাচ, বলী খেলা, কাবাডি খেলা, বাউচি খেলা, নাগরদোলা, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি ও বায়োস্কোপ প্রদর্শনী, গান, নাচ, আবৃত্তি ছিল দিনব্যাপী এ আয়োজনে।

ঈশান/খম/সুম

আরও পড়ুন