বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার পর্যটন এলাকা ইনানীতে ৬৫ বিঘা জমির ওপর পাঁচতারকা হোটেল ও লাক্সারি রিসোর্ট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আনলিমিটেড শেয়ার বিক্রি করছে আবাসন ব্যবসায়ী ছুটি গ্রুপ। গ্রাহকদের বলা হচ্ছে-‘ছুটি বিচ রিসোর্ট’ প্রকল্পে শেয়ার কিনলেই মিলবে আজীবন মালিকানা ও মাসিক নিশ্চিত মুনাফাসহ নানা সুবিধা।
অথচ বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির জমির পরিমাণ মিলেছে মাত্র ৩ দশমিক ৭২ বিঘা। এভাবে প্রলোভনে ফেলে বিনিয়োগকারী প্রতি ৬-১০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। যা মূল জমি ও রিসোর্টের মোট সম্পদের চেয়েও কয়েকশগুণ বেশি। গত দেড় বছরে এভাবে হাজার-হাজার বিনিয়োগকারীর কাছে এই রিসোর্টের শেয়ার বিক্রি করেছে। শেয়ার বিক্রি বেপরোয়া গতিতে এখনও চলছে।
এই রিসোর্টের শেয়ার বিক্রির জন্য চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় অভিজাত একটি ভবনের ১০ তলায় মনোরম অফিস খুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে ১০-১২ জন বিক্রয় প্রতিনিধি মার্কেটিংয়ের কাজ করছে জোরে-শোরে। এই অফিসের এডমিন হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মো. ফখরুল ইসলাম নামে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার এক নিরেট ভদ্রলোক।
গত সোমবার (২২ জুন) দুপুরে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে এই প্রতিবেদককে বিনিয়োগকারী ভেবে মহাব্যস্ত হয়ে পড়েন তওসিফ নামে একজন বিক্রয় প্রতিনিধি। তার বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। এ সময় প্রতিষ্ঠানের এডমিনের সাথে সাক্ষাতের কথা জানালে তিনি বলেন, আমাকে বলুন, আপনি কি শেয়ার কিনবেন? এক পর্যায়ে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তার মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে উঠে।
এরপর অফিসে আসেন এডমিন মো. ফখরুল ইসলাম। পরিচয় পর্ব শেষে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সোজা বলে দেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে। এ বিষয়ে তাঁর কথা বলার এখতিয়ার নেই বলে জানান তিনি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কার সাথে কথা বলতে হবে জানতে চাইলে-সে বিষয়েও তিনি জানেন না বলে জানান।
এক পর্যায়ে ছুটি গ্রুপের এমডি আলমগীর ফেরদৌস ও চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ আরিফির ফোন নাম্বার চাইলে গ্রুপের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কথা বলার ফাঁকে শেয়ার বিক্রয়ে সম্পৃক্ততার কথা বললে তিনি বলেন, আমি তো চাকরি করি, শেয়ার বিক্রিই আমার কাজ। কত শেয়ার বিক্রয় করেছেন এ পর্যন্ত জানতে চাইলে তাও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার জন্য বলেন তিনি।
বিনিয়োগ প্রত্যাশীদের ভাষ্য
ফেসবুকে ছুটি গ্রুপের বিজ্ঞাপন দেখে বিনিয়োগে আগ্রহী হন চট্টগ্রাম মহানগরীর নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ইনায়েত হোসেন। তিনি বলেন, টাকা ব্যাংকে না রেখে ভালো কোথাও বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলাম। এ ভাবনা থেকে ছুটি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করি।
পরে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারি কক্সবাজারে তাদের দুই গ্রুপ। উভয়ের বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে তাদের প্রজেক্টের বিষয়ে জানতে চাইলে দেখি এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে বলছে। যেখান থেকে সন্দেহ দানা বাঁধে। পরে জানতে পারি দুই গ্রুপই জমি কিনেছে কম, শেয়ার বিক্রি করছে বেশি।
আর এখানেই তাদের প্রতারণার বড় ফাঁদ। সরাসরি তারা ফ্ল্যাট বা প্লট বিক্রি করছে না, শেয়ার বিক্রি করছে। শেয়ার বিক্রি করলে কাউকে ফ্ল্যাট বা প্লট দখল দিতে হবে না। বিক্রি করলে দিতে হবে। শেয়ার বিক্রির এই ফাঁদ পুরোপুরি ডেসটিনির মতো। যা বুঝতে পেরে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
এ সময় সাথে থাকা চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও এলজিইডির প্রকৌশলী সুমন বড়ুয়া, কেজিডিসিএলের কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন, নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী এমরান হোসেন চৌধুরীও বলেন একই কথা। তারা বলেন, আজীবন মালিকানা ও মাসিক নিশ্চিত লাভের লোভে ছুটি বিচ রিসোর্ট থেকে শেয়ার কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ফাঁদ বুঝতে পেরে সরে আসি।
সূত্র মতে, সম্ভাব্য গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপনে শেয়ার কিনলেই আজীবন মালিকানা, মাসিক নিশ্চিত মুনাফা এবং বছরে নির্দিষ্ট দিনে বিনামূল্যে থাকার সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
এভাবেই হোটেল ও রিসোর্টের এক রুমের শেয়ার বিক্রি করছে শত শত বিনিয়োগকারীর কাছে। অথচ বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ কোনোরকম অনুমোদন বা আইপিও দেখাতে পারেনি।
ক্রেতা পরিচয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিনিয়োগ প্রত্যাশীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেতা পরিচয়ে ছুটি বিচ রিসোর্ট প্রকল্পের শেয়ার সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই প্রকল্পে ৬৫ বিঘা জমির ওপর একটি ছয়তলা পাঁচতারকা হোটেল ও ২৭টি লাক্সারি ভিলা নির্মিত হবে।
পাঁচতারকা হোটেলে মোট ১১ হাজার শেয়ারের মধ্যে পাঁচ হাজার ৫০০টি কোম্পানির জন্য রেখে বাকি পাঁচ হাজার ৫০০টি বিক্রি করা হচ্ছে। লাক্সারি ভিলায় বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৩৭৫টি শেয়ার। ভিলার প্রতি শেয়ার মূল্য ১০ লাখ এবং হোটেলের প্রতি শেয়ার মূল্য ছয় লাখ টাকা। বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা পাবেন আজীবন বছরে দুই রাত, তিন দিন ফ্রি অবকাশযাপন।
জমি ও রিসোর্টের মালিকানার শেয়ার হিসেবে থাকবে ভিলা থেকে ৮২ বর্গফুট এবং হোটেল থেকে ২৫ বর্গফুট সাফ-কবলা রেজিস্ট্রেশন। বিনিয়োগের ওপর আজীবন শেয়ারপ্রতি এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক মুনাফা পাবেন। থাকবে সব ছুটি রিসোর্টে আজীবন ৫০ শতাংশ ছাড়ে থাকার সুযোগ।
ছুটি গ্রুপ বলছে, ২০২৮ সালের মধ্যে ভিলা এবং ২০২৯ সালের মধ্যে পাঁচতারকা হোটেল হস্তান্তর করা হবে। অথচ এখন পর্যন্ত ভিলার নির্মাণকাজ দুই শতাংশও সম্পন্ন হয়নি। আর পাঁচতারকা হোটেলের নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি এখনও। অর্থাৎ, কাজ শুরুর আগেই হস্তান্তরের সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছে। পক্ষান্তরের ১৪ হাজারেরও বেশি শেয়ার বিক্রয় করা হয়েছ্। প্রতিটি শেয়ারে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৬ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার ইনানী মৌজার ১ নম্বর জালিয়া পালং ইউনিয়নে ছুটি বিচ রিসোর্ট লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের নামে কেনা জমির পরিমাণ মাত্র ১ দশমিক ২২৮৩ একর, অর্থাৎ প্রায় ৩.৭২ বিঘা। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি সম্পাদিত এই দলিলে জমির মালিক মো. সাইফুজ্জামানের পক্ষে পাওয়ার অব অ্যাটর্নিপ্রাপ্ত নূরে নাজনীন বেগম স্বাক্ষর করেন।
এই একটি দলিল ছাড়া ওই মৌজায় কেনা আর কোনো জমির দলিল দেখাতে পারেনি ছুটি গ্রুপ। আইনি কাগজপত্র দেখতে চাইলে ভবিষ্যতে শেয়ারের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধির প্রলোভন এবং এককালীন পরিশোধে ১৫ শতাংশ মূল্যছাড়ের কথা বলে দ্রুত বুকিংয়ের পরামর্শ দেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা।
অনুমতিপত্রে নেই পাঁচতারকা হোটেল
হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণের অনুমোদনের প্রমাণ চাইলে একটি অনুমতিপত্র দেখায় ছুটি গ্রুপ। সেখানে দেখা যায় ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বরের ওই চিঠিতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন সভাপতি ও তখনকার জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিনের স্বাক্ষর রয়েছে।
সেখানে এস এম জসিম উদ্দিন চৌধুরী, সুলতান মাহমুদ চৌধুরী ও আব্দুল জব্বার গংয়ের আবেদনের কথা বলা আছে। অনুমতিপত্রে ১৪ একর বা প্রায় ৪২ বিঘা জমিতে হোটেল, ভিলা, রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। এতে ছয়তলা হোটেল ভবনের কথা থাকলেও পাঁচতারকা হোটেলের কোনো উল্লেখ নেই। অথচ ছুটি গ্রুপ পাঁচতারকা হোটেলের নামে শেয়ার বিক্রি করছে।
এছাড়া প্রশাসনের অনুমতিপত্রে যাদের আবেদনের কথা বলা হয়েছে, ছুটি গ্রুপের কোম্পানি মেমোরেন্ডামে ওই তিনজনের নাম নেই। তারা এই প্রতিষ্ঠানের মালিক বা শেয়ারহোল্ডার নন। তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে ছুটি গ্রুপের চিফ মার্কেটিং অফিসার মো. নাজিম উদ্দিন ফরহাদ বলেন, তারা জমির মূল মালিক। তবে ছুটি গ্রুপের সঙ্গে তাদের আসল সম্পর্ক কী জানতে চাইলে, সেই প্রশ্ন তিনি এড়িয়ে যান।
পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে নাজিম উদ্দিন ফরহাদ আরও বলেন, এই রিসোর্টের জন্য আমাদের প্রস্তাবিত জমি ১০০ বিঘা। আমরা সেই পরিমাণ জমি কিনব, এ নিয়ে কথা চলছে। এখন আমাদের পরিকল্পনা হলো ৬৫ বিঘার ওপর পাঁচতারকা হোটেল ও ভিলার কাজ শেষ করা। আপাতত আমাদের ৪৫ বিঘা জমি কেনা আছে। বাকি ২০ বিঘার বায়না করা আছে।
জমিতে গরমিল রেখে ছুটি বিচ রিসোর্ট লিমিটেড নামে হোটেল ও ভিলার শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে। এমন প্রশ্নে ছুটি গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ আরিফি বলেন, আপনার এই তথ্য সঠিক নয়। ওখানে আমাদের ৬৫ বিঘার বেশি জমি কেনা আছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনুমোদনহীন এই ফ্র্যাকশনাল ওনারশিপ মডেল মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বা ডেসটিনির মতো প্রতারণামূলক স্কিমে পরিণত হতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহনেওয়াজ করিম বলেন, দেশে হোটেল-রিসোর্ট বা অনুরূপ প্রকল্পের নামে জনসাধারণের কাছ থেকে অননুমোদিতভাবে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিদ্যমান রিয়েল এস্টেট আইনের বাইরে থাকা এই খাতটি কার্যত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি না হয়েও প্রতিষ্ঠানগুলো আকর্ষণীয় প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিনিয়োগ নিচ্ছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রকল্পের জমির মালিকানা বা আইনগত ভিত্তি নেই।
তিনি আরও বলেন, এটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ধাঁচের আবাসন প্রতারণা। যেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে নতুন গ্রাহক তৈরিতে বেশি জোর দেওয়া হয়। অবিলম্বে এদের নিয়ন্ত্রণে না আনা হলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও দীর্ঘ আইনি জটিলতার মুখে পড়বেন।
(বি: দ্র:- ‘ছুটি গ্রুপের শেয়ার বিক্রির ফাঁদ’ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো। দ্বিতীয় পর্বও প্রকাশ করা হবে খুব শীঘ্রই। প্রিয় পাঠক চোখ রাখুন দৈনিক ঈশানের প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে। আর এ সংক্রান্ত কোন তথ্য-প্রমাণ থাকলে পাঠাতে পারেন আমাদের কাছে। তথ্য দাতার নাম গোপন রাখা হবে)