গ্যাস সংকটের মাঝে মিলেছে ‘স্বস্তির বার্তা’। বুধবার দিনগত মধ্যরাত থেকে চালু হতে পারে সপ্তাহ দুয়েক আগে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালটি। এতে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে দেশজুড়ে। এমন আভাস দিয়েছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল)।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, টার্মিনালটিতে রিগ্যাসিফিকেশন (তাপ প্রয়োগ করে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসকে (এলএনজি) পুনরায় আগের গ্যাসীয় অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া) শুরু হলে ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। উন্নতি হবে সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিরও।
আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ যুক্ত হতে পারে। এরপর চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারবে।
এর আগে গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনায় থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) শিপ-টু-শিপ পদ্ধতিতে গ্যাস স্থানান্তরের সময় বিস্ফোরণের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এই দুর্ঘটনার ফলে টার্মিনালটির কার্যক্রম দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ।
সে সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, বিকল হয়ে যাওয়ার আগে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ঘটনার সময় একটি এলএনজি কার্গো টার্মিনালটির কাছাকাছি অবস্থান করছিল, যা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। তবে দ্রুত সেটিকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রাথমিকভাবে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা। তবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা এক্সিলারেট, সামিট কিংবা বাংলাদেশ সরকারের কারও ছিল না। এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা।
ওই অগ্নিকাণ্ডের ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালিতে মারাত্মক গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় গত দুই সপ্তাহ ধরে বাসাবাড়ির গ্রাহকরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ খুবই সীমিত। ফলে অনেকেই রান্নাবান্না করতে পারছেন না। সে কারণে অনেকেই বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এরইমধ্যে ইলেকট্রিক চুলা, রাইস কুকার কিনেছেন কেউ কেউ। একইসঙ্গে গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে। গ্যাসের স্বল্পতায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন শিল্পমালিকরা।
অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কম থাকায় সারাদেশের সিএনজি স্টেশনগুলোতে প্রতিদিনই অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক স্টেশন তো পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি চালু হলে ধীরে ধীরে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও সিএনজির গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনালটি পুরো সক্ষমতায় চালু হতে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রাথমিকভাবে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদেশি প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের একটি বিশেষজ্ঞ দল দিনরাত পরিশ্রম করে টার্মিনালটির ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার ও অন্যান্য কারিগরি ত্রুটির সফল মেরামত সম্পন্ন করেছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই এটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা এবং সরকারের ভর্তুকি- উভয়ই বেড়েছে।