নয় বছর আগের কথা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লাশ মেলে স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের। পাথরের ব্লকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটির মৃত্যু নিয়ে আলোড়ন উঠেছিল দেশজুড়ে। তার বাবা ছয়জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলাও করেন।
কিন্তু পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের আটজন কর্মকর্তার পর্যায়ক্রমে গত নয় বছরের তদন্তেও তাসফিয়াকে হত্যার প্রমাণ মেলেনি। বরং পানিতে ডুবে মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে বলে প্রত্যেকের তদন্তে উঠে আসে।
সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার জামাল উদ্দিন চৌধুরী। তিনিও পূর্বসুরীদের মতোই গত ১১ জুন আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ৬ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন।
আর ২৫ জুন বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু বক্কর সিদ্দিক চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে নয় বছর পর মামলাটি খারিজ হয়ে গেল নিম্ন আদালতে।
চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের পুলিশ সেরেস্তার রিজার্ভ অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ পঞ্চম ফাইনাল রিপোর্টের বিরুদ্ধেও বাদী নারাজি আবেদন দেবেন বলে আদালতকে অবহিত করেছিলেন। এজন্য তিনি সময়ের আবেদনও করেন। আদালত ২৫ জুন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার শুনানির নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাদী আর নারাজি আবেদন দাখিল করেননি। তাই আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
আদালত সূত্র জানায়, ২০১৭ সাল থেকে মামলাটি পর্যায়ক্রমে তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন পতেঙ্গা থানার তৎকালীন এসআই আনোয়ার হোসেন, নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই স্বপন কুমার সরকার ও পিবিআই পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন।
কিন্তু তাসফিয়া আমিনের বাবা প্রত্যেকটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখান করে আদালতে নারাজি আবেদন করেন। আদালতও প্রত্যেকটি আবেদন গ্রহণ করে পর্যায়ক্রমে পুনঃতদন্তের আদেশ দেন। এরপর চতুর্থ দফায় সিআইডির কাছে যায় তদন্তভার।
সিআইডি পরিদর্শক আদিল মাহমুদ, মোহাম্মদ শরিফ, মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন ও সাখাওয়াত হোসেন পর্যায়ক্রমে তদন্ত করেন। সিআইডির পক্ষ থেকে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়। সেটাতেও নারাজি দিলে পঞ্চম দফায় সহকারী পুলিশ কমিশনার জামাল উদ্দিন চৌধুরী তদন্ত করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ কমিশনার জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণ হয়নি। পানিতে ডুবেই তাসফিয়ার মৃত্যু হয়েছে। মেডিকেল প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং সংগ্রহ করা আরও তথ্যপ্রমাণে এটি আত্মহত্যা ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এজন্য মামলার অভিযোগ তথ্যগত ভুল হিসেবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।’
তাসফিয়া আমিন চট্টগ্রাম নগরীর সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। তার বাবা মোহাম্মদ আমিন। সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী। ২০১৭ সালের ১ মে বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ ছিলেন তাসফিয়া। পরদিন সকালে পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় পাথরের উপর উপুড় হয়ে থাকা অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়।
ওইদিনই মোহাম্মদ আমিন পতেঙ্গা থানায় ছয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। আসামিরা হলেন, তার মেয়ের বন্ধু আদনান মির্জা, সোহেল বিন নাছির, মেরাজ বিন শওকত, ওয়াজ বিন আসলাম আসিফ মিজান, ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম ও মোহাম্মদ ফিরোজ। এদের মধ্যে আসিফ ও ফিরোজকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তবে সর্বশেষ সব আসামি জামিনে ছিলেন।