বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের (সিটিভি) কন্ট্রোলার বা প্রোগ্রাম ম্যানেজার পদ যেন সোনার হরিণ। যা পেতে ঘুষ লেনেদেনের চুক্তি হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। গ্যারান্টি হিসেবে দেওয়া হয়েছে স্বাক্ষর করা একাধিক ব্ল্যাঙ্ক চেক ও লিখিত চুক্তিপত্র । যার ফটোপ্রিন্ট সংরক্ষিত প্রতিবেদকের হাতে। এমন অভিযোগ ওই পদে আসা ২৫তম বিসিএস ক্যাডার মো. জাকির হোসন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে বদলি হয়ে রংপুর বেতার কেন্দ্রে কর্মরত আছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, ওই চেকের স্বাক্ষর আমার নয়, স্বাক্ষরগুলো জাল। তিনি বলেন, এমন কোন সম্মতিপত্রেও আমি স্বাক্ষর করিনি। কেউ আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে এমনটি করেছে। এ বিষয়ে আমি আইনগত সহায়তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরী করেছি। ব্যাংকে চেকগুলোর পেমেন্টও স্টপ করা হয়েছে। এ ধরণের জালিয়াতি কে বা কারা করেছে তা জানতে পেরেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো জানা যায়নি, ডায়রী করায় বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ। তথ্য দাতাদের দাবি-চেকগুলো জাল নয়, তার প্রমাণ মিলবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে চেকে লিপিবদ্ধ একাউন্ট নম্বর তলব করলে। চেকের মালিক যদি একাউন্টের হিসাবধারী হন, তাহলে চেকের স্বাক্ষর জালিয়াতি হয় কি করে? ওই চেক চুক্তিদাতার কাছেই বা গেল কি করে? সূত্র মতে, বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের (সিটিভি) কন্ট্রোলার বা প্রোগ্রাম ম্যানেজারের পদে যোগদান করার জন্য একাধিক ব্যক্তি তদবির শুরু করে। সেক্ষেত্রে টাকা দেওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থার উপবার্তা নিয়ন্ত্রক ২৫তম বিসিএস ক্যাডার মো. জাকির হোসেন। চুক্তি মোতাবেক ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ শরিফুল হক স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার পদে বদলি করা হয়। সেই আদেশ অনুযায়ী ৮ অক্টোবর বেতারের কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থা থেকে ছাড়পত্র নিয়ে ৯ অক্টোবর সিটিভিতে যোগদান করেন জাকির হোসেন। যোগদানের পরের মাসে অর্থাৎ ২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মো. জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত এক সম্মতি পত্রে লিখেছেন, আমার বিশেষ প্রয়োজনে ২৩ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করছি (আমি ২০ কোটি টাকা গ্রহণ করিব) এবং ১৮ (আঠার) মাস পর লভ্যাংশসহ ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কাজের মাধ্যমে/নগদ ফেরত দিব। হাউজের নিয়মানুযায়ী আমি নিজের চেক দিয়ে ডিড এগ্রিমেন্ট করিয়া আমার প্রয়োজনীয় স্থানে নিজে রিসিভ করিব। আমার ঋণ গ্রহণে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে মো. সাইফুল করীম এর মাধ্যমে আমার সমস্ত ঋণ গ্রহণ ও প্রদান এর কাজ সম্পন্ন করিব। সম্মতিক্রমে মো. জাকির হোসেন, বিসিএস (তথ্য), কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, চট্টগ্রাম কেন্দ্র। এই সম্মতিপত্রের সাথে মো. জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত কয়েকটি ব্ল্যাঙ্ক ( নাম ও টাকার পরমিান বিহীন) চেকও দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।এ বিষয়ে অবগত আছেন কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. ইমাম হোসেন কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট আছে যারা নানারকম অনৈতিক বদলি বাণিজ্যের সাথে জড়িত। তারা নানাভাবে প্রলোভনের মাধ্যমে বদলির জন্য তদবীর করেন। কখনো হয়, আবার কখনো হয় না। আর যদি হয়ে যায় তাহলে মোটা অংকের টাকা আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। চুক্তি মোতাবেক হয়তো সেই টাকা না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষেপেছেন ওই পক্ষ। এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই বিব্রত বোধ করছেন। প্রসঙ্গত, বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে বদলি বাণিজ্য নতুন কিছু নয়। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বদলি বাণিজ্য ব্যাপকভাবে চলে। এ সময় বদলির বিপরীতে শতকোটি টাকা ঘুষ লেনেদেনের বিষয়টি প্রকাশ পায়। এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় বদলি কেলেঙ্কোরীতে পরিণত হয়। ফলে ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর বদলিসহ নানা বিষয়ে কেলেঙ্কারির কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে চট্টগ্রাম কেন্দ্র ছেড়ে যেতে হয় অনেক কর্মকর্তাকে। এ সময় অনেকেই লস প্রজেক্ট হিসেবে আখ্যা দিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেছেন। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শত কোটি টাকার বিনিময়ে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে বদলি হয়ে আসার মূল কারণ নানা কারসাজি ও দুর্নীতির মাধ্যমে সহজে লুটপাট চালনো। ভাগ্যবান এমন কয়েকজন কর্মকর্তাও আছেন।