
# প্রথম সভার হিসাবে মেয়াদ ফুরিয়েছে গত রবিবার
# আদালতের রায়ে আরও চার বছর মেয়াদ থাকার দাবি
# তবে দ্রুত নির্বাচন চান চসিক মেয়র ডা. শাহাদাতও
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়াদ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। আইনবিদেরা বলছেন, গত রবিবার শেষ হয়েছে বর্তমান মেয়রের মেয়াদ। কিন্তু মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের দাবি আদালতের রায়ের ভিত্তিতে ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত তার দায়িত্ব পালনের আইনি বৈধতা রয়েছে।
তবে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটিতে নির্বাচন চান বলে জানিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের সবগুলো সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে একমাত্র তিনিই নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এর আগে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর পুরো মেয়াদকেই আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তাই যেদিন থেকে তিনি শপথ নিয়েছেন, সেদিন থেকেই তার পাঁচ বছর মেয়াদ শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন শাহাদাত হোসেন।
তিনি জানান, সরকার তাকে যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দিয়েছে, তার মেয়াদও দেড় বছর নয়, বরং পুরো পাঁচ বছর। তাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগামী ২০২৯ সালে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে প্রশাসকের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। এর আগে চট্টগ্রামে প্রশাসক ছিলেন এবং সেই প্রশাসককে বদলি করেই তাকে মেয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই নতুন করে আর প্রশাসক বসানোর সুযোগ নেই।
নিজেকে একমাত্র বৈধ মেয়র দাবি করে শাহাদাত হোসেন বলেন, আদালতের আদেশে তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন এবং চাইলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকতে পারবেন। তারপরও তিনি নির্বাচন চান এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে বলে তিনি জানান। সারা দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোতে দ্রুত নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মনে করেন শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই চট্টগ্রামসহ দেশের সব সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জোর দাবি জানান মেয়র শাহাদাত হোসেন।
পেছনে ফিরে দেখা:
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ডা. শাহাদাত পান ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট। ফলে এই মেয়াদে চসিকের প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রেজাউল করিম চৌধুরী।
এই ঘোষণার প্রতি চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ডা. শাহাদাত হোসেন। তম্মধ্যে রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চসিকের প্রথম সভা বসে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগষ্ট সরকার পতনের পর আত্নগোপনে চলে যান রেজাউল করিম চৌধুরী।
এরপর ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আগের একটি অপসারণ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের ক্রমিক নম্বর ৩, অর্থাৎ চসিকের মেয়র শব্দগুচ্ছ বিলুপ্ত করে সংশোধনী এনে ডা. শাহাদাত হোসেনের জন্য মেয়রের আসনটি নিশ্চিত করে। এরপর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আদালতের রায়ে ৩ নভেম্বর শপথ গ্রহণের মাধ্যমে ৫ নভেম্বর দ্বিতীয় মেয়র হিসেবে চেয়ারে বসেন ডা. শাহাদাত হোসেন।
স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, প্রথম সভা থেকে হিসাব করলে ওই পরিষদের পাঁচ বছর মেয়াদ গত ২২ ফেব্রুয়ারি রোববারই শেষ হয়। এর আগে ২০১৫ সালের এপৃলে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। এরপর ২০২০ সালের ৫ আগস্ট আ জ ম নাছির উদ্দীনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর খোরশেদ আলম সুজনকে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয় সরকার আইনে যা উল্লেখ আছে-
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন অনুযায়ী, কোনো সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করা হয়। সেই হিসেবে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় ২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার চট্টগ্রাম সিটির বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে।
তবে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলছেন, স্থানীয় সরকার আইনের একটি ধারা তাকে বহাল থাকার সুযোগ দেয়। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকতে পারবেন। এই বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন। মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী মন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার আইনের ৬ নম্বর ধারা বা সেকশন সিক্স প্রযোজ্য হবে। যেহেতু তিনি একজন নির্বাচিত মেয়র, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের কোনো আইনগত সুযোগ নেই এবং এই সংক্রান্ত একটি অফিসিয়াল অর্ডার শীঘ্রই জারি করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আইনবিদেরা যা বলছেন-
আইনবিদেরা বলছেন, ১৫ বছর আগেই সংশোধিত আইনে সেই পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ এর ৬ নম্বর ধারায় ২০১১ সালে সংশোধনী এনে বর্তমান মেয়রের স্বপদে থাকার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৭ বছর আগে মূল আইনে একটি শর্ত ছিল যে সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তা পুনর্গঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আগের পর্ষদ দায়িত্ব পালন করে যাবে।
কিন্তু আইনের পরিশিষ্ট অংশে ¯পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) আইন ২০১১-এর ৪ ধারাবলে আগের পর্ষদের দায়িত্ব পালনের সুযোগটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে ডা. শাহাদাত হোসেন যে আইনি ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তা বর্তমানে অস্তিত্বহীন। আইনবিদদের মতে, ২০১১ সালের সেই গেজেট প্রকাশের পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়রের দায়িত্বে থাকার কোনো আইনগত সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। ১৫ বছর আগে করা এই সংশোধনীর কারণেই এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়রের ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়ার কথা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯ এর ৬০ নম্বর ধারার ২৫.১ (১) উপধারা অনুযায়ী, যা ২০১১ সালে সংশোধিত হয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে এখন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে অন্য কোনো বিকল্প খোলা নেই। এই ধারায় বলা হয়েছে যে কোনো সিটি কর্পোরেশন মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সরকার নতুন পর্ষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত কার্যাবলী স¤পাদনের উদ্দেশ্যে একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করতে পারবে। ফলে ডা. শাহাদাত হোসেনের স্বপদে থাকার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও মন্ত্রীর মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে এই আইনি ধারাটি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে সামনে এসেছে।
বইছে ভোটের হাওয়া
এদিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার এই ডামাডোলের মধ্যেই চট্টগ্রামসহ তিন সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) এই বিষয়ে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের পাঠানো সেই চিঠি নিয়ে কমিশনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। চিঠিতে ¯পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চসিকের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২২ ফেব্রুয়ারি। আইন অনুযায়ী মেয়াদের শেষ ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা থাকায় কমিশন এখন ভোটের তোড়জোড় শুরু করেছে।










































