শুক্রবার- ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

দুষ্টুচক্রের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর

দুষ্টুচক্রের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর

# সাগরে ভাসছে প্রায় অর্ধশত মাদার ভ্যাসেল
# ১২ লাখ টন পণ্য আসছে না বাজারে
# সমস্যার মুলে আমদানিকারক ও লাইটারেজ সিন্ডিকেট
# আঘাত সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে

মজানের পণ্য নিয়ে সাগরে ভাসছে প্রায় অর্ধশত মাদার ভ্যাসেল। এর মুলে রয়েছে লাইটারেজ জাহাজ সংকট। ফলে মাদার ভেসেল থেকে ১২ লাখ টন পণ্য বাজারে আনা সম্ভব হচ্ছে না। যার আঘাত পড়ছে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে। এমন দুষ্টুচক্রের কবলে এখন চট্টগ্রাম বন্দর।

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) এমন মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, বিদেশি কোম্পানিকে বন্দরের এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি চক্রের আন্দোলনের সাথে লাইটারেজ জাহাজের সংকট সৃষ্টি করে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট। শ্রমিক-কর্মচারী চক্রের আন্দোলন নিরসন হলেও এখনো অব্যাহত রয়েছে লাইটারেজ জাহাজ সংকট।

ফলে রমজানের পণ্য নিয়ে আসা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে মাদার ভেসেলগুলোকে গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত মাশুল। অন্যদিকে রমজানের পণ্য বাজারে না যাওয়ায় বাড়ছে পণ্য মূল্য। যার আঘাত সরাসরি গিয়ে পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।

কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, সাগরে ভাসমান প্রায় অর্ধশত মাদার ভেসেলে রমজানের ১২ লাখ টন পণ্য রয়েছে। যা গতবছরের চেয়ে প্রায় তিন লাখ টনেরও বেশি। যার বাজার মূল্য দুই হাজার কোটি টাকা। এসব পণ্য খালাস না হওয়ায় কোন প্রভাব নেই বাজারে। পণ্য খালাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তিন শিফটে অপারেশনাল কার্যক্রম চালানোর জরুরি কর্মপরিকল্পনা নিলেও তা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ছে।

সূত্র জানায়, রমজানকে কেন্দ্র করে বিশ্বের নানা দেশ থেকে ডাল, ছোলা, চিনি, খেজুর, তেল, শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়। পণ্যবাহী মাদার ভেসেলগুলো বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করতে পারে না। এসব জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে খালাস করা হয়। লাইটারেজ জাহাজগুলো দেশের বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে পণ্যগুলো খালাস করে। বহির্নোঙরে পৌঁছার পর তা সময়মতো লাইটারেজ জাহাজে খালাস করতে না পারলে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়। আবার লাইটারেজ জাহাজ ঘাটে গিয়ে পণ্যগুলো খালাস করতে না পারলে নতুন করে সংকট তৈরি হয়।

আরও পড়ুন :  বিদ্যুৎ নেই তবুও শতকোটি টাকা বিল গুণছে পিডিবি!

সূত্র আরও জানায়, রমজানকে সামনে রেখে প্রচুর পণ্য আমদানি হলেও সেগুলো খালাস করার মতো লাইটারেজ জাহাজ নেই। আবার মাদার ভ্যাসেল থেকে খালাসকৃত পণ্যগুলো লাইটারেজ জাহাজ থেকে ঘাটে খালাস করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে দুইটি ইস্যু ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিছু কিছু আমদানিকারক লাইটারেজ জাহাজকে ভাসমান গুদাম বানিয়ে রেখেছেন। তারা পণ্য খালাস করছেন না। এতে করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, দাম বাড়ছে। আবার কোনো কোনো আমদানিকারক লাইটারেজ জাহাজ থেকে দ্রুত পণ্য খালাস করতে মরিয়া হলেও ঘাটের অভাবে খালাস করতে পারছেন না।

সূত্র মতে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীসহ সারাদেশে অন্তত ৪৪টি ঘাটে লাইটারেজ জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হয়। এসব ঘাটে দীর্ঘ সিরিয়াল। একটির পর একটি জাহাজ পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। এখানে শ্রমিক সংকটও থাকে। অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় এই সংকটের সুরাহা করা যাচ্ছে না।

লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনই বার্থিং মিটিং করে মাদার ভ্যাসেলের চাহিদার বিপরীতে লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। বিডব্লিউটিসিসি এখন গড়ে তিনদিন পরপর একটি বার্থিং মিটিং করতে পারছে। তাও একটি মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে গড়ে একটির বেশি লাইটারেজ জাহাজ দিতে পারছে না। এতে করে জাহাজে জাহাজে আমদানিকৃত পণ্য আটকা পড়ে আছে, যা বাজার নেটওয়ার্কে আসছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো পুরো বিষয়টিকে একটি দুষ্টুচক্রের সাথে তুলনা করে বলেছে, লাইটারেজ জাহাজের সংকটে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য নামানো যাচ্ছে না, আবার ঘাটে পণ্য নামানো যাচ্ছে না বলে লাইটারেজ জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য নিয়ে জাহাজ ভাসছে, অথচ বাজারে পণ্য সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এই দুষ্টুচক্রের আঘাত সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে লাগছে বলে মন্তব্য করেছে সূত্রগুলো।

আরও পড়ুন :  রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করলেন ওজিল ও এরদোয়ান পুত্র

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে সাত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রেকর্ড পরিমাণ চিনি, ছোলা, ভোজ্য তেল, ডাল, মটর, খেঁজুর ও বিভিন্ন মসলা, শিশু খাদ্যসহ ১৭ ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে। যার মূল্য ২৯ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর ওজন ছিল প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ টন। গতবছরের তুলনায় এ বছরের সাড়ে সাত মাসে ৩ লাখ ১৩ হাজার টন পণ্য বেশি আমদানি হয়েছে। টাকার অংকে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৮০০ কোটি টাকার। অথচ বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই। প্রতিটি পণ্যের দাম চড়া।

পণ্য খালাসে জরুরি কর্মপরিকল্পনা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সাপ্লাই চেইনে যে কোনো ধরনের বিলম্ব রোধে জরুরি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বন্দরে অনুষ্ঠিত হয় দুটি কৌশলগত (র্স্ট্যাটেজিক) উচ্চপর্যায়ের সভা।

প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেন চবক চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান। সভা শেষে বন্দরকে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণকালীন ২৪/৭ নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন মোডে পরিচালনার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সভায় চেয়ারম্যান আসন্ন রমজান উপলক্ষে বাজারে খেঁজুর, ফলমূল, মসলা, চিনি, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ২৪/৭ আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন ও রপ্তানি পণ্যের জাহাজীকরণ কার্যক্রম চালু রাখবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তিন শিফটে দিন-রাত অপারেশন পরিচালনা করবে এবং রমজানের নিত্যপণ্যগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাস ও ডেলিভারি নিশ্চিত করা হবে।

বন্দর চেয়ারম্যান দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে সাপ্লাই চেইন বিলম্বের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। অপরদিকে বন্দরে ঢাকা আইসিডিগামী প্রায় দুই হাজার কন্টেনার জমে থাকায় সৃষ্ট চাপ নিরসনে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মাধ্যমে দ্রুত কন্টেনার পরিবহনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমদানি-রপ্তানিকারকদের সঙ্গে রেলওয়ের জরুরি সভা আয়োজনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। এর ফলে বন্দরের ইয়ার্ডে জট কমে অপারেশনাল গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন :  রেলের কমিশনে বিলাসী জীবন আইডব্লিউ কামরুলের

বন্দর অভ্যন্তরে কাস্টমস স্থাপিত ৪-৫টি স্ক্যানার বিকল থাকায় স্ক্যানিংয়ের অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে, যা স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এ প্রেক্ষাপটে গেট এলাকায় জট কমাতে স্ক্যানারগুলোর দ্রুত মেরামত ও আধুনিকায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

অপারেশনাল কার্যক্রম ও কন্টেনার হ্যান্ডলিং রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের জন্য দুটি উচ্চ ক্ষমতাস¤পন্ন ফোর্স গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিটি ইক্যুইপমেন্ট সচল রাখতে একটি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

একই দিনে সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বন্দরের অপারেশনাল লজিস্টিকস ও টেকনিক্যাল সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বিশেষ মতবিনিময় সভা করেন। সভায় চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ কন্টেনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি, প্রাইম মুভার ও ফ্লাটবেড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো ২৪/৭ শিডিউলের সাথে তাল মিলিয়ে অতিরিক্ত জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দেশের আমদানি-রপ্তানির বৃহত্তর স্বার্থে সবপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে বলে জানান বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম। তিনি বলেন, সাময়িক স্থিতিশীলতা কাটিয়ে বর্তমানে পণ্য খালাসের যে গতি তৈরি হয়েছে, তা আরও বেগবান করা সম্ভব হবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। রমজানে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা সরবরাহ বিঘ্ন এড়াতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এ প্রসঙ্গে বলেন, চট্টগ্রামের বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি বন্দরের ঘাটগুলোর দিকেও নজরদারি করা হচ্ছে। উৎসব এলে পণ্যের দাম কমবে- এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে আমাদের। এ লক্ষ্যে সবপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ঈশান/মম/খম

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page