বুধবার- ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

রেলের কমিশনে বিলাসী জীবন আইডব্লিউ কামরুলের

রেলের কমিশনে বিলাসী জীবন আইডব্লিউ কামরুলের

# ফাইল ছাড়েন না ২% থেকে ৩% কমিশন ছাড়া
# রেলের বরাদ্দকৃত বাসা ভাড়ায়, থাকেন কেনা ফ্ল্যাট বাড়িতে
# প্রাইভেট কার হাঁকান দুইটা
# আরও অনেক সম্পদের মালিক তিনি

চাকরি করেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশল (ডিইএন)-১ কার্যালয়ের চট্টগ্রাম ষোলশহর স্টেশনের উর্ধ্বতন উপ-সহকারি (আইডব্লিউ) প্রকৌশলী পদে। বেতন পান দশম গ্রেডে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকার মতো। কিন্তু চলাফেরা ও ভাব-ভঙিমা রাজার হালের মতো। হাঁকান দুটো প্রাইভেট কার। একটি স্ত্রী-সন্তানের জন্য। অন্যটি নিজের জন্য।

রেলওয়ে থেকে পাওয়া বরাদ্দকৃত বাসা ভাড়ায় দিয়ে পরিবার নিয়ে নিজে থাকেন চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ এলাকায় মোটা অঙ্কের টাকায় কেনা ফ্ল্যাট বাড়িতে। নাস্তা করেন ভিআইপি হোটেল-রেষ্টুরেন্টে। সব মিলিয়ে রাজকীয় কায়দায় বিলাসী জীবন-যাপন করেন আইডব্লিউ কামরুল ইসলাম।

যা চাকরির পদবির সাথে যায় না। ঘনিষ্টজনদের মতে, প্রতিদিন তিনি যা খরচ করেন তা মাস শেষে বেতনের চারগুণ বেশি। আর তাতে অনেকের প্রশ্ন, খরচের এই টাকা আসে কোথা থেকে? এমন প্রশ্নের রহস্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলে এই প্রকৌশলীর বিলাসী জীবন যাপনের তথ্য এবং খরচের উৎস।

অভিযোগ তুলেছেন স্বয়ং ঠিকাদাররাই। তাদের অভিযোগ, ২% থেকে ৩% কমিশন ছাড়া তিনি ফাইল ছাড়েন না। এছাড়া সরকারি অর্থে অফিসের জন্য উপকরণ ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় তিনি করেন জোচ্চুরি। আর এতেই নগদ টাকা ছাড়াও অনেক সম্পদের মালিক তিনি। জুঁয়া খেলেও বিলাসীতায় গা ভাসান তিনি।

এ বিষয়ে দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবরে অভিযোগ করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে জানান ঠিকাদাররা। ঠিকাদাররা জানান, বরিশালের বংশোদ্ভুত আইডব্লিউ কামরুল ইসলাম ডিইএন-১ কার্যালয়ের অধীনে ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনের পিছনে আইডব্লিউ অফিসে যোগদানের পর থেকে সংস্কার কাজের ফাইলে কমিশন ছাড়া স্বাক্ষর করেন না।

দাবি মোতাবেক ২%-৩% কমিশন দিতে হয় তাঁেক। অন্যথায় ফাইল আটকে তাকে টেবিলে। ফাইল ছাড়াতে গেলে দাবিকৃত কমিশনের টাকা না দিলে ঠিকাদারদের সাথে করেন রূঢ় আচরণ। যা পুরোদমে বেয়াদবি। এতে কষ্ঠ পেয়ে অনেক ঠিকাদার চোখের পানি ছেড়েছেন।

আরও পড়ুন :  বিদ্যুৎ নেই তবুও শতকোটি টাকা বিল গুণছে পিডিবি!

এর আগে ডিইএন-৩ কার্যালয়েও কমিশনের জন্য একই কাজ করতেন তিনি। আইডব্লিউ হিসেবে এই কাজে তিনি ক্ষমতা দেখাতেন পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের ত্রাস ও জুলাই অন্দোলনে অস্ত্র সরবরাহকারী হেলাল আকবর বাবরের। তার নির্দেশ মোতাবেক সব কাজ করতেন কামরুল। আর অন্য ঠিকাদাররা কিছু বললে তার কাছে নালিশ করে হুমকি খাওয়াতেন।

ঠিকাদাররা জানান, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর এই কাজটি করছেন রূপ পাল্টানো বর্তমান ঠিকাদার সমিতির একজন প্রভাবশালী ঠিকাদার। যিনি সারাদেশে রেলের রাজা হিসেবে খ্যাত। কামরুলের অনিয়ম-দূর্নীতি নিয়ে কেউ কোন কথা বললে ওই ঠিকাদার হুমকি দেন এখন।

শুধু ঠিকাদার নন, ডিইএন-১ ও ৩ কার্যালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও আইডব্লিউ কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দূর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। তারা জানান, কামরুল ইসলাম অফিসের জন্য সরঞ্জাম বা স্টেশনারী ক্রয়েও করেন পুকুর চুরি। যেখান থেকে সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ হাতিয়ে নিতেন তিনি।

এছাড়া রেললাইনের বিভিন্ন স্ক্র্যাপ ও সরঞ্জাম তিনি রেলের রাজা খ্যাত ওই ঠিকাদারের মাধ্যমে পাচার করতেন। চোরের খনি খ্যাত সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন। পানির সংযোগ দিয়েও হাতিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। পানি সংযোগ থেকে মাসিক চাঁদা দাবি করায় খুলসি এলাকায় বেধড়ক পিটুনিও খেয়েছিলেন তিনি। তাতে তিনি ক্রমশ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠেন। সাথে পরিবর্তন হয়ে যায় লাইফস্টাইলও।

একের পর এক কিনেন দুটি প্রাইভেট কার। যেগুলোর মূল্য প্রায় কোটি টাকার উপরে। এর মধ্যে একটি কার স্ত্রী-সন্তান ব্যবহার করে। অন্যটি তিনি নিজে ব্যবহার করেন। তবে সাংবাদিক বা দূর্নীতি দমন সংস্থাগুলোর চোখ এড়াতে তিনি প্রাইভেট কারগুলো অত্যন্ত গোপনে ব্যবহার করেন। ষোলশহর স্টেশন অফিসে কার নিয়ে আসলেও তিনি অগোচরে নেমে যান নিত্যদিন।

আরও পড়ুন :  বিদ্যুৎ নেই তবুও শতকোটি টাকা বিল গুণছে পিডিবি!

এছাড়া তিনি থাকেন চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। যা দেড় কোটি টাকায় কিনেছেন তিনি। রেলওয়ে থেকে বরাদ্দ পাওয়া বাসা অন্য ফ্যামিলীর কাছে ভাড়া দিয়েছেন। দেশের বাড়ি বরিশালেও করেছেন বিলাস বহুল বাড়ি, কিনেছেন বিগায় বিগায় জমি। নগরীর ভিআইপি রেষ্টুরেন্ট ছাড়া নাস্তাও করেন না তিনি।

যতদূর জেনেছি নগরীর একাধিক বেসরকারি ব্যাংকের হিসাব নম্বরে নামে-বেনামে তাঁর নগদ কোটি টাকা জমা রয়েছে। তার চলাফেরা ও ভাব-ভঙি একদম রাজার হালের মতো। চেহারা ও চিবুকে চিকচিক করা ঘর্মাক্ত তেল দেখলেই বুঝা যায় তার বিলাসী জীবন যাপনের বিষয়টি।

এসব কিছু সাংবাদিকদের নজরে যাতে না আসে সে লক্ষ্যে ঠিকমতো অফিসও করেন না তিনি। মাঠে যাওয়ার কথা বলে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায়ই বাইরে সময় কাটান। এ সময় তিনি টাইগারপাসে জুঁয়ার আস্তানায় থাকেন। বিকেলের দিকে অফিসে এসে সংস্কার কাজের ফাইল রেডি করেন ও স্বাক্ষর দেন। এ সময় ষোলশহর স্টেশনের পেছনের কার্যালয়ে ঠিকাদারদের ভিড় জমে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইডব্লিউ কামরুল ইসলাম দশম গ্রেডে বেতন পান। বর্তমান তিনি সর্বোচ্চ ৪০-৪৫ হাজার টাকা বেতন পেতে পারেন। কিন্তু নিত্যদিন তিনি যে টাকা খরচ করেন তা তাঁর পদবির সাথে যায় না। এমনকি বেতনের চারগুনের চেয়েও বেশি।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, এই আইডব্লিউর বাড়ি বরিশালে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হেলাল আকবর বাবরের সান্নিধ্য পেয়ে খুবই বেপরোয়া হয়ে উঠেন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে চাকুরিরত বরিশালের একটি সমিতিও রয়েছে। এর মধ্যে গাড়ি-বাড়ি ও বিলাসীতা দেখে রেলওয়ের মহিউদ্দিন স্যারসহ অনেকে কর্মকর্তা তাকে সতর্ক করেছে। কিন্তু সে কারও কথা শুনেনি। তার মধ্যে একটা হেডম-হেডম ভাব রয়েছে, এই আর কি।

আরও পড়ুন :  বিদ্যুৎ নেই তবুও শতকোটি টাকা বিল গুণছে পিডিবি!

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার দুটি কার আছে, আমার ছেলে এখনো ছোট, কিন্ডার গার্টেনে পড়ে। তাকে আনা-নেওয়া করতে হয়। এ জন্য কিনতে হয়েছে। আর কার থাকলে সমস্যা কি। ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওটা আমি কিনিনি ভাড়ায় থাকি। রেলওয়ের বরাদ্দকৃত বাসা বসবাসের উপযোগী না তাই ভাড়ায় দিয়েছি। বরিশালে বিলাস বহুল বাড়ি ও জমি কেনার বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।

কমিশন ছাড়া ফাইল আটকে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে ফাইলে স্বাক্ষরের কোন বিষয় নেই আমার। ফাইলে তো স্বাক্ষর করেন ডিইএন-১ রাফি স্যার। কমিশন-টমিশনের বিষয় সেখানে হয়। আমি ডিইএন-১ স্যারের অর্ডার মোতাবেক কাজ করি। যেকাজে কমিশনের কোন কাম নাই।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা। বিএনপি করে সুন্দর করে একজন ঠিকাদার আপনাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছে। আমার ব্যাংক একাউন্টে কি আছে নাই তা আপনারা কীভাবে জানেন। এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। এসব নিয়ে তো আপনি নিউজ করতে পারেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ড্ইিএন)-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন বলেন, বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।

ঈশান/খম/বেবি

(বি: দ্র:- আইডব্লিউ কামরুলের নানা অনিয়ম নিয়ে শীঘ্রই প্রকাশ হবে দ্বিতীয় প্রতিবেদন। তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগীতার জন্য দৈনিক ঈশানের প্রিয় পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি)

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page