চট্টগ্রাম থেকে সরবে না বিপিসি, সমাধান হবে ওজন স্কেল বৈষম্য : অর্থমন্ত্রী

নিউজটি পড়েছেন: 644
102
চট্টগ্রাম থেকে সরবে না বিপিসি, সমাধান হবে ওজন স্কেল বৈষম্য : অর্থমন্ত্রী
ফলো করুনFacebookWhatsAppMessengerYoutube
Google News Follow
Dainik Ishanঈশান প্রতিবেদক২৯ মে, ২০২৬, ৩:৩৫ PM

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরানো হবে না। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের বড় দারোগারহাটে পণ্য পরিবহনের ওজন স্কেল নিয়ে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ীদের আর বৈষম্যের শিকার হতে হবে না বলে বলে নিশ্চিত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাণিজ্য সহজীকরণ নিয়ে নবনির্বাচিত চট্টগ্রাম চেম্বার নেতাদের সাথে দেড় ঘণ্টার বৈঠকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় এ নিশ্চয়তা দেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর মেহেদিবাগের বাসায় চেম্বারের সভাপতি ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাই আমিরুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে চেম্বার নেতারা এ অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন।

গত ২৩ মে চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনে আমিরুল হকের নেতৃত্বে ২৪ জন পরিচালকই জয়ী হন। ২৫ মে তাদের নেতৃত্বে চেম্বারের প্রেসিডিয়াম গঠিত হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরুর সঙ্গে নতুন চেম্বার নেতৃত্বের এটি ছিল প্রথম বৈঠক। বৈঠকে উঠে আসে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ।

বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের ৪৬তম সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেছেন, বৈঠকটি ছিল অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ। একপর্যায়ে আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রূপ নেয় এবং চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো উঠে আসে।

বিপিসির সদর দপ্তর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরানোর সরকারি উদ্যোগের বিষয়টি তিনি তুলে ধরলে মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে জানান, এটি চট্টগ্রামেই থাকবে, ঢাকায় যাবে না।

আমিরুল হক জানান, চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য সহজ করতে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ চালু করা, বিমানবন্দর ট্যারিফ কমিয়ে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ফ্ল্যাট রেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাট আদায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসে আধুনিক ল্যাব স্থাপন, চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানার মেশিন স্থাপন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো, ট্রেড লাইসেন্স পাঁচ বছর মেয়াদি করা এবং ডিজিটালাইজেশন এসব বিষয় আলোচনায় আসে। মন্ত্রী বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে শোনেন এবং সমাধানের উপায় খুঁজে দেখেন। কিছু বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিক সমাধানও দেন।

চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে পণ্য পরিবহনে ওজন স্কেল সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে হস্তক্ষেপ চান চেম্বারের সহ-সভাপতি মশিউল আলম স্বপন। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেন যে. দ্রুতই সমাধান করা হবে এবং চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এককভাবে এই ভোগান্তি পোহাতে হবে না।

প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর আহমদ দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মন্ত্রীর নজরে আনেন। একটি হলো বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্যের তথ্য যেভাবে উন্মুক্ত থাকে, ঠিক সেভাবেই আমদানি পণ্যের তথ্যও উন্মুক্ত করা হোক। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং বাজারে ভারসাম্য থাকবে, অপ্রয়োজনীয় আমদানিও কমবে।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে বিদেশি ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামার জন্য বিমানবন্দর ট্যারিফ কমানো, শুল্ক-কর ও অন্যান্য চার্জ মওকুফ এবং কার্গো ভিলেজ চালুর জন্য প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে মংলা বন্দর ব্যবহারে যেভাবে ট্যারিফ কমানো হয়েছিল, সেভাবেই উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে গাড়ি ব্যবসায়ী সংগঠন বারভিডার সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল হাবিবুর রহমান বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা এবং আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান।

বৈঠকে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের আহ্বায়ক আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের নতুন ২২ জন পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। তবে নতুন সিনিয়র সহ-সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন না।

উল্লেখ্য, গত ৬ মে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী একটি জরুরি ও জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশে তিনি জনস্বার্থে বিপিসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের প্রকাশ্য আবেদন জানান। একই সঙ্গে তিনি ঢাকায় বিপিসির একটি স্বতন্ত্র ও নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও বলেন।

সাধারণত যেকোনো জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ বা প্রস্তাবনার ওপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায় ও অংশীজনদের সাথে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার নিয়ম থাকলেও, বিপিসির ক্ষেত্রে তা ঘটেছে অলৌকিক গতিতে। সংসদ সদস্যের নোটিশ প্রদানের মাত্র ছয় দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১২ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি আমলে নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন। এরপর থেকেই মূলত আড়ালে-আবডালে থাকা স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ ডানা মেলতে শুরু করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গুরুত্ব দিতে এবং জ্বালানি খাতের মূল অবকাঠামো কাছাকাছি রাখতে বিপিসি চট্টগ্রামে আনা হয়। কিন্তু গত ৩৫ বছর ধরে সংস্থাটির বড় বড় কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে ঢাকাতেই লিয়াজোঁ অফিস বা অন্য কোনো নাম দিয়ে অবস্থান করে আসছিলেন। সপ্তাহে দু-একদিন অথবা মাঝেমধ্যে লোকদেখানো চট্টগ্রাম সফর করলেও তাদের মূল মনোযোগ ও যাতায়াত ছিল রাজধানী কেন্দ্রিক।

চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব আধুনিক বহুতল প্রধান কার্যালয় ভবন যখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়, ঠিক তখন কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে না চাওয়ার’ মানসিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই সংসদ সদস্যের এই নোটিশ এবং মন্ত্রণালয়ের এই অতি-তৎপরতা বলে উল্লেখ করেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক সৈয়দ সগির আহমেদ।

তিনি বলেন, সরকারের শীর্ষ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজধানীর বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে চান না। আর কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে অনীহা’র মানসিকতাকে পুঁজি করেই এবার শুরু হয়েছে স্থায়ীভাবে সদর দপ্তর ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার সূক্ষ্ম ও অতি গোপনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করবে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল ও নাগরিক সমাজ এই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে একে ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে: যেখানে সরকারের মূল নীতি বিকেন্দ্রীকরণ, সেখানে কর্মকর্তাদের আরাম-আয়েশ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের স্বার্থে একটি পুরো জাতীয় সংস্থাকে ঢাকায় ফেরত নিয়ে যাওয়া চরম বৈষম্যমূলক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য দেশের পুরো জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে অপারেশনাল এরিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এই ‘বিদ্যুৎ গতির’ আত্মঘাতী প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করে বিপিসির পূর্ণাঙ্গ সদর দপ্তর সদ্য নির্মিত চট্টগ্রামের স্থায়ী ভবনেই কার্যকর করার দাবি এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

ঈশান/প্রবি/সুম

মন্তব্য করুন