আসছে জামায়াতের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি

নিউজটি পড়েছেন: 670
112
আসছে জামায়াতের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি
ফলো করুনFacebookWhatsAppMessengerYoutube
Google News Follow
Dainik Ishanঈশান প্রতিবেদক৩১ মে, ২০২৬, ৩:৪৩ AM

সারসংক্ষেপ

  • বাজেট অধিবেশনের আগেই ঘোষণার সম্ভাবনা
  • প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে থাকছেন ছায়ামন্ত্রী
  • সরকারের বিকল্প নীতি ও বাজেট প্রস্তাবের প্রস্তুতি
  • শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি থাকবেন তরুণ নেতৃত্ব
  • অমুসলিম প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা

জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ প্রায়ই চুড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। আগামী বাজেট অধিবেশনের আগেই ঘোষণা হতে পারে এই ছায়া মন্ত্রীসভা।

দলীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। দলটির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য, কেবল সরকারের সমালোচনা নয়, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিকল্প নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প বাজেট উপস্থাপনের মতো দায়িত্বও পালন করবে এই ছায়া মন্ত্রিসভা।

জামায়াতের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, দলটির আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত কমিটির এক বৈঠকে সম্ভাব্য কাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের মতে, কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে বলে আসছে জামায়াত ইসলামী। সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসার পর দলটি মনে করছে, সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর করতে সরকারের সমান্তরালে একটি নীতিনির্ভর পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রয়োজন। সেই চিন্তা থেকেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারি দল থেকেও এই উদ্যোগের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে এবং তারা সরকারকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশেও বিরোধী দল এমন উদ্যোগ নিলে তা রাজনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য ছায়া মন্ত্রিসভার একটি তালিকা ঘুরে বেড়ালেও দলটির নেতারা কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে জানা গেছে, সংসদে নির্বাচিত জামায়াতের প্রায় সব সদস্যই কোনো না কোনোভাবে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। একই সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি বড় অংশও ছায়া মন্ত্রিসভার দায়িত্বে থাকবেন বলে জানা গেছে।

সম্ভাব্য তালিকায় দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাছুম, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, আব্দুল হালিম এবং অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নাম আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও কর্মপরিষদের আরও বেশ কয়েকজন সদস্যকে গুরুত্বপূর্ণ খাতের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ইসলামী ছাত্রশিবিরের অন্তত দুজন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতিকে এই কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের সাবেক নেতাদেরও রাখা হতে পারে। ছায়া মন্ত্রিসভাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে একাধিক অমুসলিম প্রতিনিধিকেও যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

জানতে চাইলে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা নতুন। তাই আমরা বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করছি। তাড়াহুড়া না করে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো দাঁড় করাতে চাই।’

ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ কী হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে জুবায়ের বলেন, ‘প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন ছায়ামন্ত্রী বা ছায়া প্রতিমন্ত্রী থাকবেন। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করবেন এবং যেসব ক্ষেত্রে অসংগতি বা দুর্বলতা থাকবে, সেগুলো চিহ্নিত করে জনসম্মুখে তুলে ধরবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু সমালোচনা করব না। প্রয়োজন হলে বিকল্প প্রস্তাবও দেব। বিবৃতি দেব, সংসদে কথা বলব, নীতিগত সুপারিশ করব। এর মাধ্যমে সরকারকেই সহযোগিতা করা হবে। সরকার যদি ভালো পরামর্শ গ্রহণ করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত দেশই উপকৃত হবে।’

জামায়াত নেতাদের মতে, ছায়া মন্ত্রিসভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক প্রস্তুতি। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট নেতারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ, বাজেট, আইন ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাবেন। ফলে ভবিষ্যতে সরকার পরিচালনার সুযোগ এলে তাদের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হবে।

দলীয় সূত্র বলছে, আগামী জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা নিজ নিজ খাত নিয়ে কাজ শুরু করবেন। সরকার ঘোষিত বাজেট বিশ্লেষণ, খাতভিত্তিক মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প বাজেট বা বিকল্প অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরা হতে পারে। এ কারণেই আসন্ন বাজেট অধিবেশনের আগে ছায়া মন্ত্রিসভার কাঠামো চূড়ান্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা করব, এটা আগেই বলেছি। এখন সেটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে আমিরে জামায়াত অত্যন্ত সিরিয়াস এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা মূলত একটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক কাঠামো। সংসদে শুধু সরকারবিরোধী বক্তব্য দেওয়া নয়, বরং সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও নীতিকে খাতভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ এবং তার বিকল্প উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিরোধী দল নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল সমালোচনার প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি মূলত একটি বিকল্প শাসন-প্রস্তুতির কাঠামো। এখান থেকে বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি নীতির বিপরীতে নিজেদের বিকল্প অবস্থান তুলে ধরে। একই সঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে দ্রুত প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের সক্ষমতাও তৈরি হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। যুক্তরাজ্যে এর সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখা যায়। সেখানে বিরোধী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হিজ ম্যাজেস্টিস মোস্ট লয়্যাল অপজিশন’ বলা হয়। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডেও ছায়া মন্ত্রিসভা সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে।

কানাডায় এই কাঠামোকে অনেক সময় ‘অপজিশন ক্রিটিক’ বলা হয়, যেখানে প্রতিটি খাতের জন্য একজন দায়িত্বশীল সমালোচক নির্ধারিত থাকেন। দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, জ্যামাইকা এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতেও বিভিন্ন মাত্রায় ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা রয়েছে।

ঈশান/প্রবি/মখ

মন্তব্য করুন