সোমবার- ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাবার মতোই সমৃদ্ধ রাঙ্গুনিয়ার স্বপ্ন হুমাম কাদেরের

ভূমিপুত্র' দাবি নিয়েও জস মিলছে না অন্যদের

বাবার মতোই সমৃদ্ধ রাঙ্গুনিয়ার স্বপ্ন হুমাম কাদেরের

কে চিনেন না শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্ববরণ্য নেতা ছিলেন তিনি। দেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন জ্যান্ত বাঘ। আর চট্টগ্রামের জন্য ছিলেন ছায়া শীতল বটগাছ। কিন্তু সেটা বুঝে উঠার সুযোগ পায়নি চট্টগ্রামের তরুণ সমাজ।

বেঁচে থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে বহিরাগতদের আন্দোলনের নামে লুটপাটের হুলিখেলায় তিনি চুপ তো থাকতেনও না, চট্টগ্রামের স্বার্থে গর্জে উঠতেন তিনি। দলের স্বার্থ ছাপিয়ে চট্টগ্রামের স্বার্থ নিয়ে তৈরী সেই পোষ্টারের কথা মনে করে চট্টগ্রামবাসী। যেখানে গরুর মুখ ছিল চট্টগ্রামে, আর দুধের ওলান (বাট) ছিল ঢাকায়।

সেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে এখন মর্মে মর্মে স্মরণ করছেন চট্টগ্রামের মানুষ। উপলব্দি করছেন চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া আসনের লাখো জনতা। তিলে তিলে বুঝতে পারছেন তার চোখ-মুখে স্বপ্ন ছিল সমৃদ্ধ রাঙ্গুনিয়া গড়ার। কিন্তু তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি কোন কিছুর বিনিময়ে মাথা নোয়াতেন না কারও কাছেই।

এ নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তরে তিনি রাঙ্গুনিয়ার মানুষকে বলতেন, আমি রাজার ছেলে কারও কাছে হাত পাততে পারি না-এটা আমার দোষ। কিন্তু আপনাদের গর্ব করার কথা। আর সেই বাঘের বাচ্চা হুমাম কাদের চৌধুরী। যিনি বাবার দেখানো পথে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে লড়াইয়ে নেমেছেন বাঘের মতোই।

বাবার অনুসারী নেতাকর্মীসহ রাঙ্গুনিয়ার আপামর জনসাধারণ অভুতপূর্ব সাড়াও পাচ্ছেন তিনি। মানুষের ঢল নামে তার প্রতিটি প্রচারণায়। সমাবেশ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। রাঙ্গুনিয়ার মানুষ যেন মুখিয়ে আছে ধানের শীষে ভোট দিয়ে শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী হত্যার প্রতিশোধ নিতে। যা জানে না হুমাম কাদের চৌধুরী নিজেও।

তিনি এমন এক পরিবারের সন্তান যিনি রাঙ্গুনিয়ায় গিয়ে নিজেকে শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সন্তান দাবি করলেও বাবা হত্যার প্রতিশোধের কথা মুখে বলেননি একবারও। যার কারণে অনেক নেতাকর্মীর মনভার। সেদিকে তাঁর কোন খেয়ালই নেই। হুমাম কাদের চৌধুরীর মুখে শুধু সমৃদ্ধ রাঙ্গুনিয়া কিভাবে গড়ে তোলা যায় তার গল্প।

নেতাকর্মীদের ভাষ্য, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী হত্যাকান্ড নিয়ে ব্যাকুল থাকতে চাই রাঙ্গুনিয়ার মানুষ। শিহরিত হতে চান বার বার। কিন্তু তিনি তা বলেন না, বলেন শুধু রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়নের কথা। তিনি চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ককে ফোর লেন কীভাবে করবেন, মরিয়মনগর চৌমুহনী ডিসি সড়ককে কীভাবে ওয়ান ওয়ে করবেন, রাঙ্গুনিয়ায় শিল্পকারখানা বসিয়ে কীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন, কৃষক-দিনমজুর শ্রমিকের ভাগ্য উন্নয়ন কীভাবে করবেন শুধু তারই স্বপ্ন তাঁর চোখে-মুখে।

আরও পড়ুন :  বিএনপির সাবেক মন্ত্রী বনাম জামায়াতের সাবেক কাউন্সিলর

নেতাকর্মীরা আরও জানান, ভোট এখনো হয়নি। তার আগেই তিনি পরিচ্ছন্ন রাঙ্গুনিয়া গড়ার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। রাঙ্গুনিয়ার প্রতিটি ওয়ার্ডে ডাস্টবিন বসিয়ে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে ক্রমেই দুষণমুক্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাচ্ছেন রাঙ্গুনিয়ার মানুষ। তাছাড়া দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও এতে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

এতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ অনেক খুশি। একদিকে বাবার প্রতিদান অন্যদিকে বাবার যোগ্য সন্তান হিসেবে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা দেখে হুমাম কাদের চৌধুরীতে মজেছেন রাঙ্গুনিয়ার ভোটাররা। ইতোমধ্যেই তিনি মন জয় করে ফেলেছেন রাঙ্গুনিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখ-লাখ ভোটারের। রাঙ্গুনিয়ার ঘরে ঘরে কান পাতলেই শুনা যায় এখন হুমাম কাদের চৌধুরী জয়ধ্বনি। আগামী ফেব্রুয়ারী ধানের শীষে ভোট দিয়ে হুমাম কাদের চৌধুরীকে জয়ের মালা গলায় পরাবে বলে মনে করছেন রাঙ্গুনিয়ার ভোটাররা।

এদিকে হুমাম কাদের চৌধুরীর গণজোয়ার দেখে ভেতরেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছেন প্রতিপক্ষ প্রার্থীরা। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন-বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ও চট্টগ্রাম মহানগরীর পার্কভিউ হাসপাতালের মালিক ডা. এ টি এম রেজাউল করিম, সুন্নি মহাজোট প্রার্থী এম, ইকবাল হাসান (মোমবাতি), ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী আবদুল্লাহ আল হারুন (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদ প্রার্থী মো. বেলাল উদ্দিন (ট্রাক), এবি পার্টির প্রার্থী আবদুর রহমান মনির (ঈগল), কমিউনিস্ট পার্টি প্রার্থী প্রমোদ বরণ বড়ুয়া (কাস্তে) ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী মেহেদী রাশেদ (লাঙল)।

তারা ভুমিপূত্র দাবি নিয়ে লড়াই করছে মাঠে। আর বাহাস ছড়াচ্ছে ‘বহিরাগত’ স্লোগান তুলে। তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কর্দমনস্ক নেতা ড. হাসান মাহমুদের ২০০৮ সালের স্লোগান রাউজান না রাঙ্গুনিয়া এই প্রশ্ন তুলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কারণ প্রচারণায় তাদের থলেতে এই অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই নেই।

এ নিয়ে বিএনপির এক নেতা বলেন, হুমাম কাদের চৌধুরী তো দূরের কথা, স্বয়ং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও ছিলেন রাঙ্গুনিয়ার ভোটার। হুমাম কাদের চৌধুরীসহ পরিবারের সবাই রাঙ্গুনিয়ার ভোটার। তাছাড়া তিনি উপজেলা সদর এলাকায় রাজকীয় বাড়ি করেছেন। তিনি পার্শ্ববর্তি উপজেলা রাউজানের বংশোদ্ভুত হলেও রাঙ্গুনিয়ার নাগরিক হুমাম কাদের চৌধুরী। তাহলে তিনি বহিরাগত হন কীভাবে?

বহিরাগত স্লোগান আগে খেলেও রাঙ্গুনিয়ার মানুষ এখন সব বুঝে। সেই স্লোগান আর খাই না। আর ২০০৮ সালে রাঙ্গুনিয়ার সন্তান হিসেবে ড. হাসান মাহমুদকে ভোট দিয়ে এমপি নির্বাচিত করার প্রতিদানও পেয়েছে রাঙ্গুনিয়ার মানুষ। হাসান মাহমুদ ও তার ভাইসহ নেতাকর্মীদের অত্যাচার নির্যাতনে রাঙ্গুনিয়ার দেড় লাখ মানুষ প্রাণ বাচাতে গত ১৭ বছর ঘরবাড়ি ছেড়ে নির্বাসিত জীবন যাপন করেছে। এসব মানুষ একেকজন ২০-২৫টি মামলার আসামি হয়েছে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে ঘরবাড়ি। এসব নির্যাতিত মানুষ এখন বলছে-সৎ ভাইয়ের চেয়ে, দুলাভাই অনেক ভাল ছিল।

আরও পড়ুন :  পোড় খাওয়া শাহজাহানের বিপক্ষে লড়ছেন নবাগত নাজমুল

নেতাকর্মীরা জানান, রাঙ্গুনিয়ার সন্তান দাবি করে হাসান মাহমুদ এমপি হলেও পড়ে দেখা যায় তিনিও রাঙ্গুনিয়ার সন্তান নন। তার দাদার বাড়ি ছিল পটিয়ায়। দাদার দাদা ছিলেন রোহিঙ্গ্যা বংশোদ্ভুত। ফলে রাঙ্গুনিয়া আসনে এমপি হয়েও তিনি রাঙ্গুনিয়ার কোন উন্নয়ন করেনি। উন্নয়ন করেছেন নিজের ও পরিবারের ভাই-বোনসহ আত্নীয় স্বজনের। এ নিয়ে ২০১১ সালে প্রথম আলো পত্রিকায় ‘হাসান মাহমুদের উন্নয়ন শুধু বিলবোর্ডে’-শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এ কারণে ওই প্রতিবেদকের উপর নির্যাতনের থড়গ নেমে আসে। আর এই প্রতিবেদনটিই ছিল জ্বলন্ত প্রমাণ।

ঠিক একই পথে হাঁটছেন রাঙ্গুনিয়ায় জামায়াতের ইসলামের প্রার্থী ডা. রেজাউল করিম। যিনি নিজেকে ‘ভূমি-পুত্র’ দাবি করে হুমাম কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে বহিরাগত প্রশ্নে প্রপাগান্ডা চালিয়ে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। আর এর প্রতিবাদে প্রশ্ন তুলেছেন হুমাম কাদের চৌধুরী। তিনি শুধু বলেছেন, একজন শহীদের সন্তানকে নিয়ে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন জামায়েত ইসলামীর প্রার্থী। এটা কোন ধরণের জামায়েত ইসলামী। তিনি যে রাঙ্গুনিয়ার সন্তান তা তো রাঙ্গুনিয়ার মানুষই জানে না। তিনি এতদিন কোথায় ছিলেন।

প্রশ্ন তুলেছেন ভোটাররাও। তাদের অনেকের প্রশ্ন, জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী এ টি এম রেজাউল করিমকে তো এলাকার কেউ চিনেন না। প্রার্থী হওয়ার আগে তিনি যে রাঙ্গুনিয়ার সন্তান ছিল তা কেউ জানত না। চট্টগ্রাম মহানগরের পাঁচলাইশ এলাকায় পার্কভিউ হাসপাতাল গড়ে তোলার পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিশেষ সেবক ছিলেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পলাতক মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের সাথে তার গোপন যোগাযোগ রয়েছে। তার সাথে আঁতাত করে নির্বাচনে নেমেছেন জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী ডা. রেজাউল করিম। এতে ক্ষুব্দ রাঙ্গুনিয়ার আপামর জনসাধারণ। একইভাবে ভুমিপুত্র দাবি নিয়ে অন্যপ্রার্থীরাও নির্বাচনের মাঠে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, দেড়যুগ ধরে রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়ন থমকে ছিলো। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুথানের পর নতুন সূর্য উঠেছে রাঙ্গুনিয়ায়। এবার নির্বাচনে জয়ী হলে রাঙ্গুনিয়ার মূল সমস্যা- কৃষি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করবো। রাঙ্গুনিয়া হবে উন্নয়নের মডেল।’

আরও পড়ুন :  চাপ না কাটতেই ফের লাগাতার কর্মবিরতির ডাক

তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে কৃষিপণ্য গুদামজাত করার জন্য হিমাগার করব। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা দিয়ে স্বাবলম্বী করব। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করবো। বালি, মাদক ও সন্ত্রাস নিরাপত্তার জন্য হুমকি। প্রশাসনকে শক্তিশালী করে শহীদ জিয়ার গ্রাম সরকার গঠনের মাধ্যমে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে বেকারমুক্ত রাঙ্গুনিয়া গড়ে তুলবো।’

জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এ টি এম রেজাউল করিম বলেন, ‘সংসদে গেলে এলাকার উন্নয়নকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, জনস্বার্থের জায়গা থেকে বিবেচনা করা হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো-এই মৌলিক খাতগুলোতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই আমার লক্ষ্য। সংসদ সদস্য মানে শুধু আইন প্রণেতা নয়, তিনি এলাকার মানুষের কণ্ঠস্বর। জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য প্রাপ্য আদায়ে আমি সবসময় সোচ্চার থাকবো।’

তরুণ সমাজের কথা উল্লেখ করে ডা. এ টি এম রেজাউল করিম বলেন, ‘যুবকরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের দক্ষ মানবস¤পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে রাঙ্গুনিয়াকে এগিয়ে নিতে চাই। এই নির্বাচন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, এটি ন্যায়, সততা ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ। বিবেকের রায়ে ভোট দিয়ে একটি মানবিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাঙ্গুনিয়া গড়ে তুলুন।

রাঙ্গুনিয়া ‘উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জাকিয়া হোসনাইনের তথ্যমতে, রাঙ্গুনিয়ার ১৫ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে চট্টগ্রাম-৭ আসন গঠিত। এবার নির্বাচনে এই আসনের ভোটার তিন লাখ ১৯ হাজার ৮জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৬৭ হাজার ৫৩১ জন। নারী ভোটার এক লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ জন। হিজরা ভোটার একজন। মোট ভোট কেন্দ্র ৯২টি। ভোট কক্ষের মধ্যে স্থায়ী কক্ষ ৫৬৮টি। অস্থায়ী কক্ষ ৪২টি।

রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি মো, আরমান হোসেন বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় ৯২টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৫২টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আশা করি ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন।

ঈশান/খম/সুম

আরও পড়ুন

জনপ্রিয়